রাগের অবস্থায় "তোকে মুক্তি দিলাম" বললে কি তালাক পতিত হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার ভুলের কারণে আমার স্ত্রী আমার সহিত রাগ করে বলে যে আমার ভবিষ্যতের জন্য কি করছো,কোনো দায়িত্ব পালন করো নাই ঠিকমত ইত্যাদি।আমার ভবিষ্যৎ আমাকেই সিকিউর করতে হবে।এমতবস্থায় রাগান্বিত ও কষ্টে আমি বলি তোকে মুক্তি দিলাম, তোর কোনো দায়িত্ব আমার নেই।তবে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের মত কোনো নিয়ত তখন ছিল না বলে পরবর্তীতে মনে হচ্ছে। কিনায়া তালাক সম্পর্কেও অবগত ছিলাম না।আমি হানাফী মাযহাবের।এখন আমার করণীয় কী আমি বিচ্ছেদ চাই না।আমার বিষয়ে ফতোয়া কি হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
১. মূল শরয়ী ফায়সালা:
আপনার উক্ত বক্তব্যের দ্বারা শরীআতের বিচারে কোনো তালাক পতিত হয়নি।
আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক পূর্বের মতোই সম্পূর্ণ বহাল, বৈধ ও নিরাপদ রয়েছে। আপনাদের মাঝে কোনো প্রকার বিচ্ছেদ ঘটেনি। তাই কোনো নতুন আকদ (পুনর্বিবাহ) বা অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই; আপনারা স্বাভাবিকভাবে সংসার চালিয়ে যেতে পারবেন।
২. ফিকহী কারণ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
-
ক) ব্যবহৃত শব্দদ্বয়ের শরয়ী মর্যাদা (কিনায়াহ শব্দ):
আপনি রাগের মাথায় স্ত্রীকে যে দুটি বাক্য বলেছেন— "তোকে মুক্তি দিলাম" এবং "তোর কোনো দায়িত্ব আমার নেই" — এ দুটি বাক্য ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় 'কিনায়াহ' (অস্পষ্ট/পরোক্ষ) শব্দ। এগুলো সরাসরি বা স্পষ্ট (সরীহ) তালাকের শব্দ নয়। -
খ) কিনায়াহ শব্দে তালাক হওয়ার শর্ত (নিয়ত থাকা):
হানাফী ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি অনুযায়ী, কিনায়াহ বা অস্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করার মাধ্যমে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য প্রধান ও অপরিহার্য শর্ত হলো—কথাটি বলার সময় স্বামীর মনে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট নিয়ত (ইচ্ছা) থাকা। -
গ) আপনার বর্তমান অবস্থার শরয়ী হুকুম:
যেহেতু উক্ত কথা দুটি বলার সময় আপনার অন্তরে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের কোনো নিয়ত ছিল না (বরং স্ত্রীর অভিযোগের জবাবে ক্ষোভ বা রাগ প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে বলেছেন), তাই ফিকহে হানাফী অনুযায়ী আপনার উক্ত বক্তব্যের দ্বারা একটি তালাকও পতিত হয়নি। কিনায়াহ শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকলে কোনো অবস্থাতেই তালাক পতিত হয় না।
৩. আপনার জন্য ভবিষ্যৎ নসীহত ও সতর্কতা:
১. মন থেকে সব ভয় ও সংশয় দূর করুন: আপনার বিবাহ সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। অহেতুক শয়তানের ওয়াসওয়াসায় কান দিয়ে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ডেকে আনবেন না।
২. ভবিষ্যতে কথা ব্যবহারে সতর্ক হোন: বিবাহ ও তালাক অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। রাগের মাথায় বা ঝগড়ার সময় 'মুক্তি', 'ছেড়ে দেওয়া', 'তালাক' ইত্যাদি শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকুন। রাগের মুহূর্তে চুপ থাকা অথবা ওযু করে স্থান ত্যাগ করা সুন্নাত।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৭৪–৩৭৫ (কিতাবুত তালাক, ৫ম পরিচ্ছেদ: কিনায়াত): (মাসআলা: "তোকে মুক্ত করে দিলাম", "তোর কোনো দায়িত্ব আমার নেই" এ জাতীয় কিনায়াহ শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকলে কোনো তালাক পতিত না হওয়া সংক্রান্ত ফিকহী ফায়সালা)।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৩শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৮৫ & ৮৭: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, বাব কিনায়াতুত তালাক — স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভ বা ঝগড়ার বশে নিয়ত ছাড়া "মুক্তি দিলাম" বা "তোর দায়িত্ব নেই" বললে তালাক না হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।
৩. ফাতাওয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার - ৪র্থ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫২৬–৫২৭: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, বাবুল কিনায়াত — অস্পষ্ট বা কিনায়াহ শব্দে নিয়ত ছাড়া তালাক না হওয়ার সর্বসম্মত মাসআলা)।
৪. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৬৭–২৬৮: (অধ্যায়: তালাক ও ডিভোর্সের শর'য়ী বিধান — তালাকের শব্দাবলী, প্রকারভেদ এবং কিনায়াহ শব্দে নিয়তের বাধ্যবাধকতা)।
"وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ"