অবিবাহিত অবস্থায় শর্তযুক্ত তালাকের বাক্য উচ্চারণ করলে কি তালাক পতিত হয়? কিনায়া শব্দ, শুধু নিয়ত, এবং মুয়াল্লাক তালাকের বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7066
Questioner: NG
Question Asked: 18 Oct 2026, 04:59 PM
Reviewed & Published: 18 Oct 2026, 09:51 PM
Views: 6
Tokens: 11,029
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আমি অবিবাহিত। আমি একবার নিজেকে আটকানোর জন্য বলছিলাম, "আমি যদি উমুককে সিম পরিবর্তন করতে বলি তাহলে আমি যাকে বিয়ে করবো সে ৩ তালাক।" এরপর আমি জানতে পারলাম এই কসম ভেঙে ফেললে সত্যি সত্যি ৩ তালাক হবে। এরপর প্রচুর ভয় পেয়ে যায়। এরপর আমি তাকে সিম পরিবর্তন করতে বলিনি।

উল্লেখ্য যে, আমি যাকেই বিবাহ করি বলেছিলাম নাকি যাকে বিবাহ করি বলেছিলাম স্পষ্ট মনে করতে পারছিনা। আমার বেশি মনে হয় যে, যাকেই বলেছিলাম। ঘটনাটি, ২০২১ সালের। তখন আমি কসমের অনুমানিক ‍‍‍১ মাস পর প্রশ্ন করার সময় প্রশ্নে উল্লেখ করেছিলাম, আমি যাকে বিবাহ বিবাহ করি লিখে প্রশ্ন করেছিলাম। এখন এখানেও একটা কনফিউশান রয়েছে। আমার মনে হচ্ছে যাকেই উচ্চারণ করেছিলাম। কিন্তু আবার এটা মনে হচ্ছে যে তাহলে যাকে লিখে প্রশ্ন করলাম কেন? আবার এমনও হতে পারে আমি যাকে আর যাকেই এর মধ্যে পার্থক্য আছে - এটা আগে জানতাম না। আমি কিছুদিন আগে জেনেছি।


এর কয়েকমাস পর সেই মেয়ে আমাকে ফোন দিলঃ
মেয়েটি বললঃ আমি আমার সিম পরিবর্তন করে ফেলতে চাচ্ছি। কারণ, মানুষ আমায় ডিস্টার্ব করে।
তখন, আমি বললাম পরিবর্তন করে ফেল। বাজার থেকে সিম কিনে নে।
তবে, আমি যেই কারণে সিম পরিবর্তন করতে বলতে চেয়েছিলাম সেই মেয়ে সেই কারণ জানে না।

পরবর্তীতে একজন মুফতি বললো এতে তালাক হবে না। কারন আমি তো নিজের পক্ষ থেকে বলিনি। কিন্তু, আরও ২ জন মুফতি বলেছেন তালাক হয়ে যাবে।

পরবর্তীতে আমি বিভিন্নভাবে কসম করেছি। কসমগুলোর ভাষ্য নিম্নরুপ:-
১. উমুক কাজ করলে তালাকের সর্বোচ্চ শর্ত যুক্ত হবে
২. উমুক কাজ করলে তালাকের এমন শর্ত যুক্ত হবে যে জীবনেও বিয়ে করতে পারবো না
৩. উমুক কাজ করলে তালাকের সর্বোচ্চ শর্ত হবে এবং বিয়ের কোন আর পদ্ধতি থাকবে না।( অর্থাত মেয়ের পক্ষ থেকে বিবাহ, কোন কথা না বলে বিবাহ করা)

উপরোক্ত বাক্যগুলো বলার সময় যদি মনে মনে ৩ তালাকের নিয়ত এবং এমনকি মুয়াল্লাক তালাক থেকে বাচার যে পদ্ধতি সেটাও থাকবে না- এমন নিয়ত ছিল। তবে আমি মুখে ৩ তালাক হয়ে যাবে এসব উচ্চারণ করিনি। পরবর্তীতে আমি উপরে বর্ণিত কিছু সংখ্যক কসম ভেঙে ফেলেছি। এখন আমার বিয়ের পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু আমি আদৌ বিয়ে করতে পারবো কি না আমি স্পষ্ট জানি না। আমার বাড়িতে বিয়ের কথা বললে এসব ভেবে মন খারাপ হয়ে যায়।

১। এখন আমি যদি কাউকে বিয়ে করি তাহলে কি সে ৩ তালাক হয়ে যাবে?
২। উপরের কসমগুলোর ভেঙে ফেললে বিয়ের আগে বা পরে কি কোন সমস্যা হবে?
৩। আমি কি যাকে ধরে নিবো নাকি যাকেই?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আপনার মনে জেগে ওঠা ভয়, শঙ্কা ও সংশয় সম্পূর্ণ অহেতুক ও ওয়াসওয়াসামাত্র। শরীআতের ফিকহী মূলনীতি অনুযায়ী আপনার চিন্তিত হওয়ার বা বিয়ের বিষয়ে ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আপনি যেসব ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, তার কোনোটির দ্বারাই আপনার বিবাহ আটকে থাকবে না এবং ভবিষ্যতে আপনি যাকে বিবাহ করবেন, তার ওপর কোনো তালাক বা ৩ তালাক পতিত হবে না।

ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ আপনার প্রশ্নগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ উত্তর নিচে পেশ করা হলো:


১. আপনি যদি কাউকে বিয়ে করেন, তাহলে কি সে ৩ তালাক হয়ে যাবে?

**উত্তর: না, সে ৩ তালাক হবে না। আপনার বিবাহ সম্পূর্ণরূপে সহীহ, নিরাপদ ও হালাল থাকবে **

শরয়ী ফিকহী ব্যাখ্যা:

  • কসমের শর্ত অপূর্ণ থাকা: ২০২১ সালের কসমটির ক্ষেত্রে আপনার নির্দিষ্ট শর্ত ছিল—"আমি যদি উমুককে সিম পরিবর্তন করতে বলি..."। অর্থাৎ আপনার নিচ থেকে তাকে সিম পরিবর্তন করার জন্য আদেশ, নির্দেশ বা প্রস্তাব দিতে হতো।
  • কিন্তু বাস্তবে মেয়েটি নিজ উদ্যোগে আপনাকে ফোন দিয়ে সিম পরিবর্তনের ইচ্ছা ব্যক্ত করে ("আমি আমার সিম পরিবর্তন করে ফেলতে চাচ্ছি") এবং আপনি কেবল তার সিদ্ধান্তে সম্মতি জানিয়ে বলেছেন, "পরিবর্তন করে ফেল"।
  • ফিকহে হানাফীর মূলনীতি অনুযায়ী: শর্তযুক্ত তালাকের (তা'লীকে তালাক) ক্ষেত্রে কসমের শর্তটি হুবহু পাওয়া যাওয়া আবশ্যক । মেয়েটি নিজে সিম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানানোর পর আপনার নিছক সম্মতি দেওয়াকে "আপনার পক্ষ থেকে তাকে সিম পরিবর্তন করতে বলা" বলা হয় না। অতএব, কসমের মূল শর্তই অর্জিত হয়নি, ফলে তালাক পতিত হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

২. উপরের কসমগুলো ভেঙে ফেললে বিয়ের আগে বা পরে কি কোন সমস্যা হবে?

উত্তর: না, বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা হবে না এবং এর দ্বারা কোনো তালাক বা কসম কার্যকর হবে না।

শরয়ী ফিকহী ব্যাখ্যা:

  • মুখে তালাকের শব্দ না থাকা: ইসলামি ফিকহে তালাক বা তালাকের কসম কার্যকর হওয়ার জন্য মুখ দিয়ে স্পষ্টভাবে 'তালাক' শব্দ উচ্চারণ করা আবশ্যক।
  • আপনার বর্ণিত বাক্যগুলো ("সর্বোচ্চ শর্ত যুক্ত হবে", "এমন শর্ত যুক্ত হবে যে জীবনেও বিয়ে করতে পারব না") তালাকের কোনো শরয়ী বা প্রচলিত শব্দ নয় ।
  • মুখে 'তালাক' শব্দ উচ্চারণ না করে কেবল এসকল অস্পষ্ট কথা মুখে বলে মনে মনে ৩ তালাকের বা মুয়াল্লাক তালাক ভাঙার নিয়ত করলেও শরীআতের বিচারে কোনো কসম বা তালাক সংঘটিত হয় না।
  • রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: "আমার উম্মতের অন্তরের চিন্তা বা নিয়তকে ক্ষমা করা হয়েছে, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করে বা আমালে রূপ দেয়"।
  • যেহেতু মূল কসমই গঠিত হয়নি, তাই পরবর্তীতে সেই কাজগুলো করে ফেললেও আপনার বিবাহ বা দাম্পত্য জীবনে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না।

৩. আপনি কি 'যাকে' ধরে নিবেন নাকি 'যাকেই'?

উত্তর: আপনার এ বিষয়ে "যাকে" নাকি "যাকেই"—তা নিয়ে ভাবার বা মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই।

শরয়ী ফিকহী ব্যাখ্যা:

  • নিশ্চয়তা ও শকের মূলনীতি: ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত কায়েদা হলো: «اليَقِينُ لاَ يَزُولُ بِالشَّكِّ» (অর্থাৎ "অকাট্য নিশ্চয়তা নিছক সন্দেহের দ্বারা বাতিল হয় না")।
  • ১ নম্বর উত্তরের আলোকে স্পষ্ট যে, যেহেতু আপনার কসমের মূল শর্তই অর্জিত হয়নি, তাই মূল বাক্যটি "যাকে" কিংবা "যাকেই"—যেটাই হোক না কেন, উভয় অবস্থাতেই কোনো কসম ভাঙেনি এবং কোনো তালাকও কার্যকর হয়নি।
  • তাছাড়া দীর্ঘ বছর পর মনে আসা এ জাতীয় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কেবল শয়তানের ওয়াসওয়াসামাত্র, যার কোনো শরয়ী আইনগত মর্যাদা নেই।

সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:

  • ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১ & ৮৩: (অধ্যায়: বাব তা'লীকুত তালাক — কসমের শর্ত হুবহু অর্জিত না হলে তালাক পতিত না হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।

২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ৩২০: (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৪র্থ পরিচ্ছেদ: শর্তের সাথে তালাক দেওয়া — শর্ত অর্জিত না হলে কসম ভঙ্গ না হওয়া)।
  • পৃষ্ঠা: ৩৫৪ (ও ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২০২): (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক/দাওওয়া — মনে মনে করা নিয়তের কারণে তালাক কার্যকর না হওয়া এবং মুখে উচ্চারণ বাধ্যতামূলক হওয়া)।

৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৩য় খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ২৫২: (অধ্যায়: কসম, মূলনীতি অনুচ্ছেদ — "اليقين لا يزول بالشك" কায়েদার ভিত্তিতে সন্দেহের ওপর সিদ্ধান্ত না দেওয়া)।

আল্লাহ তাআলা আপনার সংশয় দূর করুন এবং আপনার বিয়েকে বরকতময় করুন। আমিন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.