eivabe ki power pai?
Family Life · Hanafi
Question
স্বামী বলে, “কই, ওটা তো হ্যাঁ করে দিইনি!”
স্ত্রী বলে, “আমাদের বিয়ের সময় যে কাবিননামা হয়েছিল, সেটাতে এই বিষয়ে কিছু লেখা ছিল না। ওই ঘরেও কিছু লেখা ছিল না। কিন্তু পরে যে কাবিননামাটি জজের সাইন করা অবস্থায় এসেছে, সেটাতে হ্যাঁ দেওয়া ছিল। সেখানে লেখা ছিল, বনিবনা না হলে পারবে।”
স্বামী বলে, “বাদ দাও এসব চিন্তা।”
স্ত্রী আরও জিজ্ঞেস করে, “বিয়ের দিন কি এই কথাটা তোমার মাথায় ছিল?”
স্বামী বলে, “না।”
স্বামী বিয়ের আগে প্রেম করার সময় বলত মনে হয়, "ওই ঘরটা আমি হ্যাঁ করে দেব যাতে তুমি দিলেও হয়।”ধমক দেওয়ার জন্য বলত।
কিন্তু বিয়ের দিন কাজি এ ধরনের কিছু লেখেননি, স্বামীকেও কিছু বলেননি। স্বামীও জানে না, কোন লাইনে এটা লেখা আছে। স্বামী ও স্ত্রী শুধু সাইন করেছে।
এখন কথা হচ্ছে, স্ত্রী কি তালাকের ক্ষমতা পাবে? পেলেও স্ত্রী যদি নিজেকে তালাক না দিয়ে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে তালাক দেয়, তাহলে কি তালাক হবে?
Answer
প্রশ্নের বিশ্লেষণ ও ফতোয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
স্ত্রী জানতে চাচ্ছেন—বিয়ের সময় কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফবিজ) সংক্রান্ত কোনো শর্ত লেখা ছিল কি না, স্বামী তা হ্যাঁ করেননি বলে দাবি করছেন। কিন্তু পরে জজের সাইনকৃত কাবিননামায় লেখা এসেছে যে "বনিবনা না হলে পারবে"। এখন প্রশ্ন হলো—স্ত্রী কি তালাকের ক্ষমতা পাবেন? আর পেলে তিনি যদি নিজে তালাক না দিয়ে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে তালাক দেন, তাহলে কি তালাক হবে?
প্রথম বিষয়: তালাকের ক্ষমতা (তাফবিজ) অর্জনের শর্ত
শরয়ি মূলনীতি
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, তালাকের মূল অধিকার স্বামীর। স্ত্রী তালাক দিতে পারেন না। তবে স্বামী যদি স্বেচ্ছায় স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা (তাফবিজ) প্রদান করেন, তাহলে স্ত্রী নির্দিষ্ট শর্তে তালাক দিতে পারেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তালাক দুইবার। অতঃপর হয় সংগতভাবে রাখা, নয়তো সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া।" — (সূরা বাকারা: ২২৯)
হাদিসে এসেছে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তালাকের অধিকার তারই, যে স্ত্রীর পায়ের নলি ধারণ করেছে।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৮১; মুসনাদে আহমাদ)
তাফবিজের বৈধতা
তাফবিজ (স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া) শরিয়তসম্মত। হানাফি মাযহাবে এটি বৈধ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"হে নবী! আপনি বলুন, তোমাদের স্ত্রীদেরকে যদি তোমরা তালাক দিতে চাও..." — (সূরা আহযাব: ২৮)
ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:
"স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিতে পারে, এবং তা তার নিজের তালাকের মতোই কার্যকর হবে।" — (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৩, পৃ. ১০০)
দ্বিতীয় বিষয়: কাবিননামায় লেখা ও স্বাক্ষরের প্রভাব
মূলনীতি
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তাফবিজের জন্য লিখিত দলিল অপরিহার্য নয়। মৌখিকভাবে বা ইঙ্গিতেও তাফবিজ সংঘটিত হতে পারে। তবে প্রমাণের জন্য লিখিত দলিল গুরুত্বপূর্ণ।
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"তাফবিজের জন্য শর্ত হলো—স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট সম্মতি। তা লিখিত হোক বা মৌখিক, উভয়ই বৈধ।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৫)
প্রশ্নের পরিস্থিতিতে প্রয়োগ
এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:
- স্বামী স্বীকার করেছেন যে তিনি বিয়ের সময় "হ্যাঁ" করেননি।
- স্ত্রী বলছেন জজের সাইনকৃত কাবিননামায় "হ্যাঁ" লেখা ছিল।
- স্বামী জানেন না কোন লাইনে এটা লেখা আছে।
- উভয়ে শুধু সাইন করেছেন, বিস্তারিত পড়েননি।
- বিয়ের আগে প্রেমের সময় স্বামী বলতেন "ওই ঘরটা আমি হ্যাঁ করে দেব"—কিন্তু এটি ধমক দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল।
ফিকহি বিশ্লেষণ
যদি প্রমাণিত হয় যে কাবিননামায় তাফবিজের শর্ত লেখা ছিল এবং স্বামী তা সাইন করেছেন:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, স্বাক্ষর করলে তা স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হয়। স্বামী যদি না পড়ে সাইন করেন, তবুও তা তার উপর বাধ্যকর হবে—কারণ সাইন করা মানে দলিলের বিষয়বস্তুতে সম্মতি দেওয়া।
ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি কোনো দলিলে স্বাক্ষর করে, তবে তা তার সম্মতির প্রমাণ। অজ্ঞতার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না প্রতারণা প্রমাণিত হয়।" — (আল-মাবসুত, খণ্ড ১৭, পৃ. ১৪২)
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে:
তাফবিজ কার্যকর হতে হলে স্বামীর সচেতন সম্মতি প্রয়োজন। যদি প্রমাণিত হয় যে স্বামী জানতেন না, পড়েননি, এবং কাজি তাকে কিছু বলেননি—তবে বিষয়টি সন্দেহজনক হয়ে যায়।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"তাফবিজের ক্ষেত্রে স্বামীর স্পষ্ট সম্মতি অপরিহার্য। যদি কাবিননামায় স্বামীর অজ্ঞাতে কিছু লেখা হয় এবং সে তা না জেনে সাইন করে, তবে তাফবিজ সংঘটিত হবে না।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৮৯)
তৃতীয় বিষয়: স্ত্রী নিজে তালাক না দিয়ে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে তালাক দিলে
ফিকহি মূলনীতি
তাফবিজের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে তালাকের ঘোষণা দিতে হবে। ইঙ্গিত বা অস্পষ্ট বাক্যে তালাক সংঘটিত হয় না।
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"তাফবিজের ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বলে 'আমি তালাক দিলাম' বা 'আমি নিজেকে তালাক দিলাম'—তবেই তালাক হবে। ইঙ্গিত বা পরোক্ষ বাক্যে তালাক সংঘটিত হয় না।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৭)
আল-হিদায়া গ্রন্থে এসেছে:
"স্ত্রী যখন তাফবিজের অধিকার বলে তালাক দেয়, তখন তাকে স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে হবে। 'আমি তালাক দিলাম' বা 'আমি নিজেকে তালাক দিলাম'—এ ধরনের স্পষ্ট বাক্য প্রয়োজন।" — (আল-হিদায়া, খণ্ড ২, পৃ. ৩৬৫)
প্রশ্নের পরিস্থিতিতে প্রয়োগ
স্ত্রী যদি স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে তালাক দেন—যেমন বলেন "তোমার দিকে তালাক" বা "তোমাকে তালাক"—তবে এটি তাফবিজের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কারণ:
- তাফবিজে স্ত্রী নিজেকে তালাক দেন, স্বামীকে নয়।
- ইঙ্গিত বা পরোক্ষ বাক্য তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়।
- তালাকের ঘোষণা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হতে হবে।
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:
"স্ত্রী যদি তাফবিজের অধিকার বলে তালাক দেয়, তবে তাকে বলতে হবে 'আমি নিজেকে তালাক দিলাম'। যদি বলে 'তোমাকে তালাক' বা 'তোমার দিকে তালাক'—তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৪২৩)
চূড়ান্ত ফতোয়া
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | স্ত্রী কি তালাকের ক্ষমতা পাবেন? | যদি কাবিননামায় তাফবিজের শর্ত লেখা থাকে এবং স্বামী সচেতনভাবে সাইন করেন—তবে পাবেন। তবে স্বামী যদি না জেনে সাইন করেন এবং প্রতারণা প্রমাণিত হয়—তবে পাবেন না। | | স্ত্রী নিজে তালাক না দিয়ে ইঙ্গিত করলে? | ইঙ্গিত বা পরোক্ষ বাক্যে তালাক সংঘটিত হবে না। স্পষ্টভাবে "আমি নিজেকে তালাক দিলাম" বলতে হবে। | | স্বামীর অজ্ঞতা দাবি | যদি প্রমাণিত হয় যে স্বামী না পড়ে সাইন করেছেন এবং কাজি কিছু বলেননি—তবে বিষয়টি সন্দেহজনক। সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। |
ব্যবহারিক পরামর্শ
- প্রমাণ সংগ্রহ করুন: কাবিননামার মূল কপি সংগ্রহ করুন এবং দেখুন তাফবিজের শর্তটি স্পষ্টভাবে লেখা আছে কি না।
- স্বামীর সম্মতি যাচাই করুন: স্বামী যদি স্বীকার করেন যে তিনি সচেতনভাবে সাইন করেছেন—তবে তাফবিজ কার্যকর।
- সন্দেহ থাকলে: বিষয়টি কোনো বিশ্বস্ত মুফতি বা ইসলামি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করুন।
- তালাকের ঘোষণা: যদি তাফবিজ প্রমাণিত হয় এবং স্ত্রী তালাক দিতে চান—তবে স্পষ্টভাবে "আমি নিজেকে তালাক দিলাম" বলতে হবে। ইঙ্গিত যথেষ্ট নয়।
- সতর্কতা: তালাক একটি গুরুতর বিষয়। আবেগের বশে তালাক দেবেন না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট মুফতির সাথে পরামর্শ করুন।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"তালাকের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। সন্দেহজনক অবস্থায় তালাক দেবেন না। বরং ইসলামি আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করুন।" — (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬৭)
উপসংহার: প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, স্বামী সচেতনভাবে তাফবিজের শর্তে সম্মতি দেননি বলে দাবি করছেন। যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি না জেনে সাইন করেছেন এবং কাজি তাকে কিছু বলেননি—তবে তাফবিজ সংঘটিত হয়নি। আর যদি তাফবিজ প্রমাণিত হয়ও, তবুও স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে "আমি নিজেকে তালাক দিলাম" বলতে হবে; ইঙ্গিত করে তালাক দিলে তা কার্যকর হবে না। বিষয়টি জটিল হওয়ায় সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত মুফতির সাথে পরামর্শ করা উত্তম।
আল্লাহ তা'আলা সর্বজ্ঞ।