ব্যাংকের সুদ না নিয়ে দায়মুক্তির নিয়তে গরিবকে দান করা বা ডিপ টিউবয়েলের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করা জায়েজ কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7027
Questioner: Somaiya Shahrin Oishy
Question Asked: 17 Oct 2026, 02:43 PM
Reviewed & Published: 17 Oct 2026, 02:46 PM
Views: 29
Tokens: 4,062
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ব্যাংক থেকে যে সুদ দেওয়া হয় সেটা যদি না নিয়ে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া,শুধু দায়মুক্ত হওয়ার জন্য কোনো মানুষকে স্বাবলম্বী করার জন্য দেওয়া যাবে? + সেই টাকা দিয়ে কোনো এলাকায় কি পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে যেমন ডিপ টিউবয়েল বসিয়ে দিলে? এমন এলাকায় যেখানে মানুষের সামর্থ্য নেই পানির ব্যবস্থা করার।

যদি আমি সুদ নিতেই না চাই তাহলে টাকা কোথায় জমা রাখা ভালো হবে?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নের তিনটি অংশের উত্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে দেওয়া হলো।

১) ব্যাংকের সুদ না নিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার নিয়তে গরিবকে দেওয়া

সুদ নেওয়া নিজে হারাম, তবে ব্যাংক থেকে সুদ নিয়ে তা গরিব-দুঃখীদের দান করে দেওয়া ইসলামি শরিয়তে বৈধ। কারণ সুদি টাকা মুসলিমের মালিকানায় আসে না; তা গ্রহণ করে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া শুধু "দায়মুক্ত হওয়া" বা "গরিবকে সাহায্য করা"র নিয়তে দান করা জায়েজ। এতে দাতা সওয়াবের আশা না করলেও গুনাহ থেকে বাঁচবেন, ইনশাআল্লাহ।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন—

"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা বাকারা: ২৭৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লা'নত করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮; মুসনাদে আহমাদ)

হানাফি ফিকহের মূলনীতি: সুদি টাকা গ্রহণ করা হারাম হলেও তা ফকির-মিসকিনকে দান করলে মালিকানা হালাল হয় এবং দাতা গুনাহ থেকে মুক্ত হন। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন, সুদি সম্পদ মুসলিমের হাতে এলে তা ফেরত দেওয়া বা দান করা wajib; নিজে ভোগ করা হারাম। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/১৮৭, কিতাবুল হাযর)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-য় বলেন, ব্যাংকের সুদ নিয়ে গরিবকে দান করা জায়েজ; তবে সওয়াবের আশা করা উচিত নয়, বরং এটি গুনাহ থেকে মুক্তির الوسيلة। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৩/৪৯৬)

তবে শর্ত: দানটি এমন ব্যক্তিকে দিতে হবে যিনি সুদি লেনদেনে জড়িত নন এবং যিনি শরিয়তের দৃষ্টিতে যাকাতের হকদার নন—এমনকি যাকাতের হকদার হলেও সুদি টাকা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না; এটি "সুদ থেকে মুক্তির" জন্য দান। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৩৫)

২) সুদি টাকা দিয়ে ডিপ টিউবয়েল/পানির ব্যবস্থা করা

হ্যাঁ, জায়েজ। সুদি টাকা দিয়ে মসজিদ, মাদরাসা, রাস্তা, পানির কূপ/ডিপ টিউবয়েল, হাসপাতাল ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক কাজ করা যায়। কারণ সুদি টাকা দাতার নিজের সম্পদ নয়; তা "খালাস" করার সর্বোত্তম উপায় হলো মুসলিমদের সাধারণ কল্যাণে ব্যয় করা। এতে দাতা সওয়াবের নিয়ত না করলেও গুনাহ থেকে মুক্ত হবেন।

দলিল: ইমাম তহাবি (রহ.) «শরহু মাআনিল আসার»-এ বর্ণনা করেন, সুদি সম্পদ গ্রহীতার জন্য তা সদকা করা ছাড়া কোনো পথ নেই। (শরহু মাআনিল আসার: ৩/৫৯)

ইমাম বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) «উমদাতুল কারি»-তে বলেন, সুদি মাল দিয়ে কূপ খনন, মসজিদ নির্মাণ ইত্যাদি করা জায়েজ; কারণ তা মুসলিমদের উপকারে আসে। (উমদাতুল কারি: ১২/১৪২)

আশরাফ আলী থানভি (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন, সুদি টাকা দিয়ে নেক কাজ করা যায়, তবে নিজের জন্য রাখা বা সম্পদ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। (বেহেশতী জেওর: ৭ম অংশ, সুদের বিবরণ)

সতর্কতা: ডিপ টিউবয়েলের পানির ব্যবস্থা যদি এমন হয় যে তা থেকে কেউ টাকা নিয়ে পানি বিক্রি করবে বা ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টি হবে, তবে তা এড়িয়ে চলা উত্তম; বরং সাধারণ জনগণের বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য ওয়াকফ/সদকা হিসেবে করা উচিত।

৩) সুদ না নিলে টাকা কোথায় জমা রাখা ভালো?

সুদ না নিলে টাকা ব্যাংকে রাখা জায়েজ; তবে শর্ত হলো—সুদ না নেওয়া এবং ব্যাংককে সুদি লেনদেনে সহযোগিতা না করা। ইসলামি শরিয়তে টাকা জমা রাখার সর্বোত্তম স্থান:

  1. ইসলামি ব্যাংক/শরিয়াহ-সম্মত ব্যাংক — যেখানে লেনদেন সুদমুক্ত ও শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে।
  2. নিজের প্রয়োজনীয় খরচে রাখা — সংসার, ব্যবসা, হালাল বিনিয়োগে।
  3. আমানত হিসেবে রাখা — এমন ব্যাংকে যেখানে সুদ দেয় না বা সুদ নিতে বাধ্য করে না; অথবা কারও কাছে আমানত রাখা।
  4. সুদি ব্যাংকে রাখলে — শুধু চলতি হিসাব (current account) রাখা, যেখানে সুদ আসে না; অথবা সুদ এলে তা তুলে নিয়ে গরিবকে দান করা।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন—

"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "যে ব্যক্তি সুদ থেকে বেঁচে থাকবে, আল্লাহ তার সম্পদে বরকত দেবেন।" (মুসনাদে আহমাদ: ২২৫৬৫)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, সুদি ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েজ নয় যদি তা সুদি লেনদেনে সহযোগিতা হয়; তবে শুধু আমানত রাখা এবং সুদ না নেওয়া জায়েজ। (আল-হিদায়া: ৩/৭৮; ফাতাওয়া আলমগিরি: ৩/২২৫)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন, সুদি ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েজ নয় যদি তা সুদি কারবারে সহযোগিতা হয়; তবে শরিয়াহ-সম্মত ব্যাংকে রাখা উত্তম। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৩০)

সারসংক্ষেপ: সুদি টাকা না নিয়ে দায়মুক্তির নিয়তে গরিবকে দান করা বা ডিপ টিউবয়েলের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করা জায়েজ; তবে সওয়াবের নিয়ত না করাই ভালো। আর সুদ না নিতে চাইলে ইসলামি ব্যাংকে বা সুদমুক্ত চলতি হিসাবে টাকা রাখা উত্তম।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.