বিবাহের প্রস্তাবের সময় হাইপোথাইরয়েডিজম ও PCOS-এর মতো রোগ গোপন করা কি গুনাহ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ফতোয়া: বিবাহের প্রস্তাবের সময় রোগের কথা গোপন করা প্রসঙ্গে
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বাদ:
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: হ্যাঁ, এ অবস্থায় রোগের ইতিহাস গোপন করা ও নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে উপস্থাপন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রতারণা (গিশ/তাদলীস) এবং গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে — যদি না আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে আপনি চিকিৎসাগতভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন এবং ভবিষ্যতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। শুধু "কয়েকদিন কোনো সমস্যা হয়নি" — এটাই সম্পূর্ণ সুস্থতার প্রমাণ নয়। হাইপোথাইরয়েডিজম ও PCOS এমন রোগ যা ওষুধ বন্ধ করলে পুনরায় ফিরে আসতে পারে, এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সন্তান ধারণ ক্ষমতা, গর্ভধারণ ও দাম্পত্য জীবনে — যা বিবাহের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য। তাই এ বিষয় গোপন করা প্রতারনার শামিল।
বিস্তারিত আলোচনা
১. বিবাহে রোগ গোপন করা প্রতারণা — শরীয়তের মূলনীতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا» "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১ (কিতাবুল ঈমান)
আরেক হাদীসে:
«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ» — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০
বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি (আকদ)। এতে পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষের জন্য পরস্পরের অবস্থা জানা অপরিহার্য। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, বিবাহের সময় এমন ত্রুটি (আইব) গোপন করা যা দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলে — তা প্রতারণা। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ, 'আইব' অধ্যায়)
২. হাইপোথাইরয়েডিজম ও PCOS — এগুলো 'আইব' (ত্রুটি) হিসেবে গণ্য
ফকীহগণ বিবাহে যে সকল ত্রুটি গোপন করা নাজায়েয বলেছেন, তার মধ্যে রয়েছে এমন রোগ যা সহবাস, সন্তান জন্মদান বা দাম্পত্য জীবনে বাধা সৃষ্টি করে। ইমাম আল-হাসকাফী (রহ.) আদ-দুররুল মুখতার-এ এবং ইবনে আবিদীন (রহ.) তার ব্যাখ্যায় বলেছেন:
বিবাহের সময় এমন রোগ গোপন করা যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের কারণ হয় — তা প্রতারণা ও গুনাহ।
PCOS চিকিৎসাবিজ্ঞানে সরাসরি বন্ধ্যাত্ব ও গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। হাইপোথাইরয়েডিজম-ও গর্ভধারণ, গর্ভকালীন স্বাস্থ্য ও সন্তানের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। তাই এগুলো সাধারণ 'সৌন্দর্য' সংক্রান্ত বিষয় নয় — বরং বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্য (বংশবৃদ্ধি) সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
৩. "আমি সুস্থ" — এ দাবির সঠিকতা
আপনি লিখেছেন: "শুধু আল্লাহর কাছে সুস্থতা চাইছি... কয়েকদিন হলো কোনো সমস্যা হচ্ছে না... নিজেকে সুস্থ মনে হচ্ছে।"
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
- ওষুধ বন্ধ করার পর কয়েকদিন সমস্যা না হওয়া = সম্পূর্ণ নিরাময় নয়। হাইপোথাইরয়েডিজম ও PCOS দীর্ঘমেয়াদি রোগ; অনেক সময় উপসর্গ না থাকলেও রক্ত পরীক্ষায় (TSH, হরমোন) অস্বাভাবিকতা থাকে।
- পূর্বে একবার ওষুধ বন্ধ করলে সমস্যা হয়েছিল — এটি প্রমাণ করে রোগটি সুপ্ত (latent) অবস্থায় রয়েছে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ।
শরীয়তের দৃষ্টিতে "সুস্থ" বলার মানে হলো — চিকিৎসাগতভাবে প্রমাণিত নিরাময়, যা কেবল অনুভূতির ভিত্তিতে নয়, ডাক্তারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সুতরাং বায়োডাটায় "সম্পূর্ণ সুস্থ" লিখে রোগের ইতিহাস বাদ দেওয়া — তথ্য গোপন (কিতমান) ও অসত্য বিবৃতি-এর অন্তর্ভুক্ত, যা প্রতারণা।
৪. কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও রাসূলের সাথে খিয়ানত করো না, এবং নিজেদের আমানতের中也 খিয়ানত করো না জেনে-বুঝে।" — সূরা আল-আনফাল, আয়াত ২৭
আরও ইরশাদ:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا "আর ওয়াদা পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই ওয়াদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" — সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩৪
বিবাহের প্রস্তাব একটি পারস্পরিক বিশ্বাস ও ওয়াদার ভিত্তি। এতে অসত্য বলা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা — আমানতের খিয়ানত।
৫. হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি — পরামর্শদাতার দায়িত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْمُسْتَشَارُ مُؤْتَمَنٌ» "যার সাথে পরামর্শ করা হয়, সে আমানতদার।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৫১২৮; সুনানে তিরমিজি, হাদীস নং ২৮২২
আরেক হাদীসে:
«لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَخْطُبَ عَلَى خِطْبَةِ أَخِيهِ...» — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫১৪৪
বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী উভয়ের জন্য সততা অপরিহার্য। রাসূল ﷺ নিজে বিবাহের সময় পাত্রীকে দেখার অনুমতি দিয়েছেন যাতে পাত্র জানতে পারে — অর্থাৎ তথ্য প্রকাশ ও স্বচ্ছতা ইসলামের শিক্ষা। (দেখুন: সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৮২)
৬. ফকীহদের বক্তব্য
-
ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর ঐকমত্য হলো — বিবাহের সময় এমন ত্রুটি গোপন করা যা দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলে, তা প্রতারণা; এবং এতে পাত্র/পাত্রীর খিয়ার (বিচ্ছেদের অধিকার) সৃষ্টি হতে পারে। (দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ, 'আইব' অধ্যায়; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, কিতাবুন নিকাহ)
-
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা আন-নিসার ১৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন — স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সততা ও বিশ্বাস অপরিহার্য; প্রতারণার মাধ্যমে বিবাহ টিকিয়ে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়।
-
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানী-তে বিবাহের সময় রোগ গোপন করার বিষয়ে বলেন — যদি রোগটি এমন হয় যা দাম্পত্য জীবনে বা সন্তান জন্মদানে প্রভাব ফেলে, তবে তা গোপন করা নাজায়েয ও প্রতারণা।
-
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ বিবাহের অধ্যায়ে সততার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন এবং মিথ্যা ও প্রতারণাকে নিষিদ্ধ বলেছেন।
৭. আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
| বিষয় | মূল্যায়ন | |------|----------| | ওষুধ বন্ধ করে কয়েকদিন সমস্যা না হওয়া | সম্পূর্ণ নিরাময়ের প্রমাণ নয় | | পূর্বে ওষুধ বন্ধে সমস্যা হওয়া | রোগ সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে | | বায়োডাটায় "সুস্থ" লেখা | তথ্য গোপন ও অসত্য বিবৃতি | | প্রস্তাব আসলে না বলা | প্রতারণার শামিল | | পারিবারিক চাপে বাধ্য হওয়া | গুনাহের দায় থেকে মুক্তি দেয় না |
পারিবারিক চাপে বাধ্য হয়ে মিথ্যা বলা শরীয়তে বৈধ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ "তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা বর্ণনা করে 'এটা হালাল, এটা হারাম' বলো না।" — সূরা আন-নাহল, আয়াত ১১৬
করণীয় (পরামর্শ)
-
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন — রক্ত পরীক্ষা (TSH, হরমোন প্রোফাইল) করিয়ে নিশ্চিত হোন আপনি সত্যিই স্বাভাবিক কিনা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না।
-
বায়োডাটা সংশোধন করুন — "সম্পূর্ণ সুস্থ" না লিখে সত্য অবস্থা উল্লেখ করুন, অথবা অন্তত রোগের ইতিহাস সংক্ষেপে উল্লেখ করুন। এতে আল্লাহর কাছে দায়মুক্ত থাকবেন এবং ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হলে প্রতারণার অভিযোগ থেকে রক্ষা পাবেন।
-
প্রস্তাব আসলে সততার সাথে জানান — "আমার হাইপোথাইরয়েডিজম ও PCOS-এর ইতিহাস ছিল, আলহামদুলিল্লাহ এখন নিয়ন্ত্রণে আছে" — এভাবে বলা শরীয়তসম্মত ও কল্যাণকর। যে পক্ষ সত্য জেনে রাজি হবে, সেই বিবাহে বরকত হবে ইনশাআল্লাহ।
-
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন — সততা অবলম্বনে রিযিক ও ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়া সহজ হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" — সূরা আত-তালাক, আয়াত ২
- পারিবারকে বোঝান — ইসলামে সততার গুরুত্ব ও প্রতারণার পরিণতি সম্পর্কে পরিবারকে বলুন। প্রয়োজনে কোনো বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন।
উপসংহার
আপনার প্রশ্নের সারকথা: বর্তমানে রোগের ইতিহাস গোপন করে "সম্পূর্ণ সুস্থ" বলে বায়োডাটা দেওয়া ও প্রস্তাব আসলে না বলা — শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রতারণা ও গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদি না চিকিৎসাগতভাবে প্রমাণিত হয় আপনি সম্পূর্ণ নিরাময় হয়েছেন। কেবল কয়েকদিন উপসর্গ না থাকা এর প্রমাণ নয়। সততা অবলম্বন করুন — আল্লাহ তা'আলা সত্যবাদীদের সাথে আছেন।
«إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ» "নিশ্চয়ই সততা সৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়, আর সৎকর্ম জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৭
والله أعلم بالصواب