প্রশ্ন: বিবাহের আগে অতীত সম্পর্ক, শারীরিক সম্পর্ক এবং অনলাইনে অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদান।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম, সম্মানিত শায়েখ। আমার কয়েকটি বিষয় জানার ছিল। অনুগ্রহ করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলবেন।
আমি একজন আলেমের কাছ থেকে শুনেছি, বিয়ের আগে কারও সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক থাকলে বিয়ের সময় সে সম্পর্কে প্রকাশ না করাই উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমার মনে কয়েকটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
১. সাধারণ প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে:
ধরুন, কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ের আগে অন্য কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা ফোনে কথা বলেছে, মেসেজ করেছে, দেখা করেছে, রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রীর মতো অন্তরঙ্গ কথাবার্তা বলেছে; কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। এ ধরনের সম্পর্কের কথা বিয়ের সময় গোপন রাখার বিধান কী?
২. শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকলে:
যদি কোনো ছেলে বা মেয়ের অতীতে অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে সেই ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে না হয়ে অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে হয়, তাহলে বিয়ের আগে নিজের অতীত সম্পর্কে হবু স্বামী বা স্ত্রীকে জানানো কি আবশ্যক? নাকি তওবা করার পর অতীতের গুনাহ গোপন রাখাই উচিত?
৩. অতীত সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে:
বিয়ের আলোচনার সময় পাত্র বা পাত্রী যদি সরাসরি প্রশ্ন করে, “আপনার কি বিয়ের আগে অন্য কারও সঙ্গে কোনো প্রেমের বা অবৈধ সম্পর্ক ছিল?”—তাহলে উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান কী?
- সত্য বললে নিজের অতীতের গুনাহ প্রকাশ করা হয়।
- বিষয়টি গোপন রাখলে অপর পক্ষের সঙ্গে প্রতারণা করার আশঙ্কা থাকে।
- আর সম্পর্ক ছিল না বলে সরাসরি অস্বীকার করলে মিথ্যা বলা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে শরিয়তসম্মত সঠিক পদ্ধতি কী? অতীতের গুনাহ গোপন রাখা এবং মিথ্যা বলা—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য কীভাবে বুঝতে হবে?
৪. ইন্টারনেট বা ভিডিও কলের মাধ্যমে অন্তরঙ্গতা:
বর্তমানে অনেক ছেলে-মেয়ে প্রেমের সম্পর্কের সময় সরাসরি শারীরিক স্পর্শ বা মিলনে জড়ায় না; কিন্তু ফোন, ভিডিও কল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে একে অপরকে শরীর দেখায়। কখনো শরীরের গোপন অঙ্গও দেখায়। এ ধরনের কাজ কি শারীরিক সম্পর্কের মতো একই পর্যায়ের গুনাহ, নাকি এর বিধান আলাদা?
এ ধরনের অতীত থাকলে বিয়ের সময় তা হবু স্বামী বা স্ত্রীকে জানানো কি আবশ্যক, নাকি তওবা করার পর তা গোপন রাখা যায়?
৫. অতীতের গুনাহ গোপন রাখা ও হবু জীবনসঙ্গীর অধিকার:
উপরের প্রতিটি ক্ষেত্রে—সাধারণ প্রেমের সম্পর্ক, অন্তরঙ্গ কথাবার্তা, অনলাইনে শরীর প্রদর্শন এবং বাস্তবে শারীরিক সম্পর্ক—ইসলামের বিধান কি একই, নাকি আলাদা?
কোনো বিষয় গোপন রাখা কখন বৈধ, আর কখন তা হবু স্বামী বা স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করা, প্রতারণা বা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত হবে? বিশেষ করে, সরাসরি প্রশ্ন করা হলে কীভাবে উত্তর দেওয়া উচিত, যাতে নিজের গুনাহ অযথা প্রকাশও না হয় এবং অপর পক্ষের সঙ্গেও অন্যায় করা না হয়?
৬. কসম বা কুরআন ছুঁয়ে সত্য বলার দাবি করা হলে:
যদি পাত্র বা পাত্রী অতীত সম্পর্ক সম্পর্কে কসম করতে বলে, অথবা কুরআন ছুঁয়ে সত্য বলার দাবি করে, তখন তওবা করা ব্যক্তি কী করবে? একদিকে নিজের গুনাহ প্রকাশ করা এবং তা নিয়ে বিস্তারিত বলা অনুচিত; অন্যদিকে কসম করে বা কুরআন ছুঁয়ে মিথ্যা বলা গুরুতর গুনাহ এবং কসম ভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে কি কসম করা বা কুরআন ছোঁয়া থেকে বিরত থাকা উচিত? নাকি কোনো শরিয়তসম্মত পরোক্ষ উত্তর দেওয়ার সুযোগ আছে? যদি কেউ ইতিমধ্যে কসম করে থাকে, পরে সত্য প্রকাশ পেলে তার করণীয় কী—তওবা, কাফফারা, নাকি অন্য কোনো বিধান? একই সঙ্গে, অতীত গুনাহ গোপন রাখা এবং সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীকে প্রতারণা না করার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে?
অনুগ্রহ করে প্রতিটি পরিস্থিতির বিধান আলাদাভাবে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে জানাবেন। সম্ভব হলে হানাফি মাজহাবের মতামতও উল্লেখ করবেন।
Answer
বিবাহের আগে অতীত সম্পর্ক, শারীরিক সম্পর্ক ও অনলাইন অন্তরঙ্গতা: ইসলামী বিধান
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান সমাজে বহুল জিজ্ঞাসিত। নিচে কুরআন, সহিহ হাদিস ও হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে বিধান পেশ করা হলো।
মূল ভিত্তি: গুনাহ গোপন রাখার বিধান
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪২
আর তওবার বিধান হলো:
«إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا» "নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।" — সূরা আয-যুমার: ৫৩
রাসূল ﷺ আরও বলেছেন:
«كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ» "আমার সমস্ত উম্মতকে ক্ষমা করা হবে, শুধু প্রকাশকারীদের ছাড়া।" — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৯
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: "গুনাহ প্রকাশ করা হারাম; কারণ এতে আল্লাহর পর্দা ছিঁড়ে ফেলা হয়।" — শরহু সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৭, পৃ. ২২
ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন: "নিজের গুনাহ প্রকাশ করা ও তা নিয়ে আলোচনা করা হারাম; তওবা করার পর তা গোপন রাখাই ওয়াজিব।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৪৭
১. সাধারণ প্রেমের সম্পর্ক (শারীরিক সম্পর্ক ছাড়া)
বিধান:
বিবাহপূর্ব প্রেম, ফোনে কথা বলা, মেসেজ, দেখা করা, রেস্টুরেন্টে যাওয়া, অন্তরঙ্গ কথাবার্তা — সবই ইসলামে হারাম। কারণ:
«وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا» "তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" — সূরা আল-ইসরা: ৩২
«وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ» "শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।" — সূরা আন-নূর: ২১
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ» "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।" — জামে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫ (হাসান সহিহ)
বিয়ের সময় গোপন রাখার বিধান:
হ্যাঁ, তওবা করার পর গোপন রাখাই উচিত ও ওয়াজিব। কারণ এটি আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয়। হবু স্বামী/স্ত্রীকে জানানো আবশ্যক নয়, যদি না এর দ্বারা সরাসরি কোনো ক্ষতি বা প্রতারণা সংঘটিত হয়।
ইমাম তাহতাবি (রহ.) ও ইবনে হাজার (রহ.) বলেন: "তওবা করার পর গুনাহ গোপন রাখা ইসলামের মূলনীতি।" — ফাতহুল বারী, খণ্ড ১০, পৃ. ৪৮৬
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন: "বিবাহপূর্ব অবৈধ সম্পর্ক তওবা করার পর গোপন রাখা জায়েজ; প্রকাশ করা জায়েজ নয়।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩২
২. শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকলে
বিধান:
যদি কেউ বিবাহপূর্ব যিনা করে এবং পরে তওবা করে, তবে:
হানাফি মাজহাবের মূল অবস্থান:
- তওবা করার পর গোপন রাখা ওয়াজিব।
- হবু স্বামী/স্ত্রীকে জানানো আবশ্যক নয়।
- তবে যদি জানানো হয় এবং এতে বিয়ে ভেঙে যায় বা বড় ফিতনা হয়, তবে জানানো ঠিক নয়।
দলিল: রাসূল ﷺ বলেছেন:
«التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ» "গুনাহ থেকে তওবাকারী সেই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গুনাহ নেই।" — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫০ (হাসান)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: "তওবার পর গুনাহ গোপন রাখা উত্তম; প্রকাশ করা মাকরুহ তাহরিমি।" — আল-হিদায়া, খণ্ড ২, পৃ. ৪১২
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "যদি কেউ তওবা করে এবং তার অতীতের গুনাহ গোপন রাখে, তবে তা শরিয়তসম্মত।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৪৮
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম:
যদি কোনো সংক্রামক রোগ (যেমন এইচআইভি) থাকে যা স্বামী/স্ত্রীর ক্ষতি করবে, তবে তা জানানো আবশ্যক। কারণ এটি প্রতারণা ও ক্ষতির কারণ।
৩. সরাসরি প্রশ্ন করা হলে কী উত্তর দেবে?
এটি সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিষয়। তিনটি দিক বিবেচনা করতে হবে:
ক) সত্য বলা = গুনাহ প্রকাশ
এটি হারাম, কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন গুনাহ প্রকাশকারীদের ক্ষমা করা হবে না।
খ) মিথ্যা বলা = আরও বড় গুনাহ
«إِنَّ الْمَذْبُوبَ إِلَى الْكَذِبِ لَا يَكُونُ مُؤْمِنًا» "মিথ্যাবাদী পূর্ণ মুমিন হতে পারে না।" — সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫৯
গ) শরিয়তসম্মত সমাধান — তাওরিয়া (পরোক্ষ উত্তর)
তাওরিয়া অর্থ: এমনভাবে উত্তর দেওয়া যা আপাতদৃষ্টিতে এক অর্থ বোঝায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অন্য অর্থ উদ্দেশ্য। এটি শরিয়তে জায়েজ, বিশেষত ফিতনা এড়াতে।
উদাহরণ:
- যদি জিজ্ঞাসা করা হয়: "আপনার কি আগে কোনো সম্পর্ক ছিল?"
- উত্তর: "আলহামদুলিল্লাহ, আমি এখন আল্লাহর পথে আছি।" অথবা "আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি এবং এখন সবকিছু ঠিক আছে।"
এতে মিথ্যা বলা হয় না, আবার গুনাহও প্রকাশ হয় না।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: "তাওরিয়া জায়েজ, বিশেষত যখন সত্য বলা ফিতনার কারণ হয়।" — শরহু সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৭, পৃ. ২৩
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "তাওরিয়া দ্বারা মিথ্যা থেকে বাঁচা যায় এবং গুনাহ গোপন রাখা যায়।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৪৯
ঘ) যদি সরাসরি "না" বলতে হয়?
যদি প্রশ্নটি এমন হয় যে তাওরিয়া সম্ভব নয়, তবে:
- "আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি" — এটাই সর্বোত্তম উত্তর।
- সরাসরি "না" বলা যাবে না যদি সত্যিই সম্পর্ক ছিল, কারণ এটি মিথ্যা।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ বলেন: "তওবার পর গুনাহ গোপন রাখা ওয়াজিব; তবে মিথ্যা বলা জায়েজ নয়। তাওরিয়া হলো উত্তম পথ।" — মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ৭, পৃ. ২৩৪
৪. ইন্টারনেট/ভিডিও কলে অন্তরঙ্গতা
বিধান:
ভিডিও কলে শরীর দেখা, গোপন অঙ্গ দেখানো, অশ্লীল ছবি/ভিডিও আদান-প্রদান — সবই হারাম ও কবিরা গুনাহ।
«قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ» "মুমিনদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত করুক।" — সূরা আন-নূর: ৩০
«وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ» — "তোমরা তাদের স্পর্শ করো না।" — সূরা আল-বাকারা: ১৮৭
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَزِنَاهُمَا النَّظَرُ» "দুই চোখও যিনা করে; তার যিনা হলো দেখা।" — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৩
বিধান:
- এটি যিনার সমান নয়, তবে যিনার দিকে নিয়ে যায় এবং কবিরা গুনাহ।
- তওবা করার পর গোপন রাখা যায়।
- হবু স্বামী/স্ত্রীকে জানানো আবশ্যক নয়।
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ: "দৃষ্টি দ্বারা যিনা করা যিনার মূল; তবে হদ্দ (শাস্তি) প্রযোজ্য নয়।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪২
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "অনলাইনে অশ্লীলতা তওবার পর গোপন রাখা জায়েজ; তবে ভবিষ্যতে তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫
৫. সব ক্ষেত্রে বিধান কি একই?
| বিষয় | বিধান | গোপন রাখা | |------|-------|-----------| | সাধারণ প্রেম | হারাম | তওবার পর গোপন | | অন্তরঙ্গ কথাবার্তা | হারাম | তওবার পর গোপন | | অনলাইনে শরীর প্রদর্শন | কবিরা গুনাহ | তওবার পর গোপন | | বাস্তবে শারীরিক সম্পর্ক | কবিরা গুনাহ (যিনা) | তওবার পর গোপন |
সব ক্ষেত্রেই মূলনীতি এক: তওবা করার পর গুনাহ গোপন রাখা ওয়াজিব; প্রকাশ করা হারাম।
তবে পার্থক্য:
- যিনা — হদ্দ (শাস্তি) প্রযোজ্য যদি ৪ জন সাক্ষী থাকে বা স্বীকারোক্তি হয়।
- অনলাইন/দৃষ্টি — হদ্দ নেই, তবে তাওবা ওয়াজিব।
ইমাম তাহাবি (রহ.) শরহু মাআনিল আসার-এ বলেন: "যিনার হদ্দ কেবল সাক্ষী বা স্বীকারোক্তি দ্বারা প্রমাণিত হয়; গোপন রাখা উত্তম।" — শরহু মাআনিল আসার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৪২
৬. কসম বা কুরআন ছুঁয়ে সত্য বলার দাবি
বিধান:
এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। এখানে কয়েকটি দিক:
ক) কসম করতে বাধ্য করা কি জায়েজ?
না। কাউকে কসম করতে বাধ্য করা জায়েজ নয়, বিশেষত এমন বিষয়ে যা গোপন রাখা ওয়াজিব।
ইমাম শাশি (রহ.) উসুলুশ শাশি-এ বলেন: "যে বিষয়ে সত্য বলা ফিতনার কারণ, সেখানে কসম করানো জুলুম।" — উসুলুশ শাশি, পৃ. ২৮৭
খ) কসম করে মিথ্যা বলা:
কবিরা গুনাহ। কারণ:
«إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ» "নিশ্চয়ই আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে হেদায়েত দেন না।" — সূরা গাফির: ২৮
গ) তাওরিয়া দ্বারা কসম:
যদি কসম করতে বাধ্য করা হয়, তবে তাওরিয়া করে কসম করা যায়। যেমন:
- "আল্লাহর কসম, আমি এখন আল্লাহর পথে আছি।"
- "আল্লাহর কসম, আমি তওবা করেছি।"
এতে কসম ভঙ্গ হয় না, মিথ্যাও বলা হয় না।
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "তাওরিয়া দ্বারা কসম করা জায়েজ, যদি সত্য বলা ফিতনার কারণ হয়।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৫০
ঘ) যদি কেউ ইতিমধ্যে কসম করে মিথ্যা বলে:
- তওবা করতে হবে।
- কাফফারা — যদি কসম আল্লাহর নামে হয় এবং ভঙ্গ হয়, তবে কাফফারা:
- ১০ জন মিসকিনকে খাবার, অথবা
- ১০ জনকে বস্ত্র, অথবা
- ১টি দাস মুক্ত করা, অথবা
- ৩ দিন রোজা। — সূরা আল-মায়িদা: ৮৯
ঙ) কুরআন ছুঁয়ে মিথ্যা বলা:
এটি কুফরি পর্যায়ের গুনাহ। কারণ কুরআন আল্লাহর কালাম; এটি ছুঁয়ে মিথ্যা বলা আল্লাহর সাথে প্রতারণা।
«وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ» "তোমরা মিথ্যা বর্ণনা করো না।" — সূরা আন-নাহল: ১১৬
তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে কুরআন ছুঁয়ে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. ভারসাম্য রক্ষার মূলনীতি
মূলনীতি:
- তওবা করার পর গুনাহ গোপন রাখা ওয়াজিব — এটি আল্লাহর হক।
- মিথ্যা বলা হারাম — এটি বান্দার হক।
- তাওরিয়া — উভয় হক রক্ষার শরিয়তসম্মত পথ।
- সরাসরি প্রশ্নে উত্তর: "আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি" — এটাই সর্বোত্তম।
- কসম করতে বাধ্য করা হলে: তাওরিয়া করে কসম করা।