পাত্রী দেখার সময় পাত্র ছাড়া অন্য পুরুষের সামনে মুখ খোলা রাখা যাবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6995
Questioner: Mahima Islam
Question Asked: 16 Oct 2026, 08:11 PM
Reviewed & Published: 17 Oct 2026, 01:35 AM
Views: 11
Tokens: 7,393
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমি একজন জেনারেল পড়ুয়া। দ্বীনের বুঝ হওয়ার পর থেকে পর্দা সম্পূর্ণভাবে মেইনটেইন করার চেষ্টা করি। বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে আসলে সকল পাত্র পক্ষই পরিবারের অন্যান্য পুরুষ নিয়ে পাত্রী দেখতে আসে। এবং আমার বাবা-মাও আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের সামনে যেতে জোর করে। আমি যেতে না চাইলে অনেক কথা শোনায়। তাছাড়া প্রায় সকল পরিবারই চায় পর্দাশীল কিন্তু পাত্রের ভাই পাত্রের বোনের হাসবেন্ড ইত্যাদির সাথে পারিবারিক স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তাদের মতে এরা পরিবারেরই সদস্য। আমারও বয়স বাড়তেছে এবং বিয়ের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

আমার প্রশ্ন সমূহ:
১) উক্ত পরিস্থিতিতে আমার করণীয় কি? আমি কি দেখতে আসার সময় পাত্র ব্যতীত অন্যান্য পুরুষদের সামনে মুখ খোলা রাখতে পারবো?

২)বিয়ের পর তাদের সামনে সালোয়ার-কামিজ, মাথায় হিজাব , শুধু মুখমণ্ডল খোলা অবস্থায় যেতে পারবো স্বাভাবিক পারিবারিক সদস্যদের মতো? আর এক্ষেত্রে কি গুনাহ হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

৩) এমন পরিস্থিতিতে বাবা-মায়ের বা মুরুব্বীদের কথা না শুনলে গুনাহ হবে?( অনেকে বলেন আমি পর্দা মানতে চাই অথচ বাবা মায়ের কথা শুনি না।)

Answer

পাত্রী দেখা ও বিয়ের পর পর্দার বিধান

উত্তর (সংক্ষেপে):
ইসলামে পাত্রী দেখার অনুমতি শুধু সম্ভাব্য পাত্রের জন্য, এবং তা শরীয়তের নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে। পাত্রের পরিবারের অন্যান্য পুরুষ (যেমন পাত্রের ভাই, বোনের হাসবেন্ড, চাচা, মামা ইত্যাদি) আপনার জন্য নন-মাহরাম। তাদের সামনে মুখ খোলা রাখা জায়েজ নয়। বিয়ের পরও তারা নন-মাহরামই থাকবেন; তাদের সামনে হিজাবসহ পূর্ণ পর্দা করতে হবে, শুধু মুখমণ্ডল খোলা রাখা যাবে না। তবে বাবা-মায়ের অবাধ্যতা করা যাবে না; তাদের সাথে সদাচরণ ও কৌশলীভাবে বিষয়টি বোঝাতে হবে।


বিস্তারিত উত্তর

১) পাত্রী দেখার সময় পাত্র ছাড়া অন্য পুরুষদের সামনে মুখ খোলা রাখা যাবে কি?

যাবে না। শরীয়তে পাত্রী দেখার অনুমতি শুধুমাত্র সম্ভাব্য পাত্রের জন্য, এবং তা নির্দিষ্ট শর্তে:

  • পাত্র যদি পাত্রীকে বিয়ে করার ইচ্ছা রাখে,
  • পাত্রী ও তার পরিবার পাত্রকে দেখতে রাজি হয়,
  • দেখা হয় পাত্রীর মাহরাম পুরুষের উপস্থিতিতে,
  • এবং দেখা হয় শুধু প্রয়োজনীয় অংশ (মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি পর্যন্ত)।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — “পাত্রীকে দেখা শুধু সেই ব্যক্তির জন্য বৈধ যে বিয়ে করতে চায়; অন্য কারো জন্য নয়।” (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
  • ফাতাওয়া উসমানী — “পাত্রী দেখার সময় পাত্র ছাড়া অন্য কোনো নন-মাহরাম পুরুষের সামনে পাত্রীর মুখ খোলা রাখা জায়েজ নয়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৯৮)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া — “পাত্রী দেখার সময় শুধু পাত্রই দেখবে; তার পরিবারের অন্য পুরুষরা নন-মাহরাম, তাদের সামনে পর্দা করতে হবে।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫৬)

আপনার করণীয়:

  • পাত্রী দেখার সময় পাত্র ছাড়া অন্য কোনো নন-মাহরাম পুরুষের সামনে যাবেন না।
  • যদি পরিবার জোর করে, তাহলে বিনয়ের সাথে বলুন: “ইসলামে এটা জায়েজ নেই; আমি গুনাহ করতে পারব না।”
  • প্রয়োজনে পাত্রের সাথে পৃথক কক্ষে বা পর্দার আড়ালে দেখা করার ব্যবস্থা করুন, যেখানে শুধু মাহরাম উপস্থিত থাকবেন।
  • যদি পরিবার না মানে, তাহলে অন্য কোনো মাহরাম (যেমন ভাই, চাচা, মামা) এর সাথে যাওয়ার চেষ্টা করুন, যিনি আপনার পক্ষে কথা বলবেন।

২) বিয়ের পর পাত্রের ভাই, বোনের হাসবেন্ড ইত্যাদির সামনে সালোয়ার-কামিজ, হিজাব ও শুধু মুখ খোলা অবস্থায় যাওয়া যাবে কি?

যাবে না। বিয়ের পরও নিম্নলিখিত ব্যক্তিরা আপনার জন্য নন-মাহরাম:

  • পাত্রের ভাই (দেবর)
  • পাত্রের বোনের হাসবেন্ড (ভগ্নিপতি)
  • পাত্রের চাচা, মামা, খালু, ফুফা
  • পাত্রের চাচাতো-মামাতো ভাই
  • পাত্রের বন্ধু বা অন্য কোনো পুরুষ

কুরআন:
“তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রকাশ করো না।” (সূরা আহযাব: ৩৩)
“মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে; আর যা প্রকাশ্য তা ছাড়া নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে।” (সূরা নূর: ৩১)

হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “দেবর (স্বামীর ভাই) এর সাথে নির্জনে মিলিত হওয়া থেকে বেঁচে থাকো।” সাহাবীরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! দেবর সম্পর্কে কী বলেন?” তিনি বললেন: “দেবর তো মৃত্যুর সমান।” (সহিহ বুখারি: ৫২৩২, সহিহ মুসলিম: ২১৭২)

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার — “স্বামীর ভাই, ভগ্নিপতি, চাচা, মামা — এরা সবাই নন-মাহরাম; তাদের সামনে পর্দা করা ফরজ।” (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাজার)
  • বাহিশতী জেওর — “স্বামীর ভাই, বোনের হাসবেন্ড, চাচা, মামা — এদের সামনে মুখ খোলা রাখা জায়েজ নয়।” (বাহিশতী জেওর, পর্দার অধ্যায়)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি — “নন-মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর মুখমণ্ডল খোলা রাখা নিষিদ্ধ।” (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়াত)

গুনাহের সম্ভাবনা:
হ্যাঁ, অবশ্যই গুনাহ হবে। কারণ এটি কুরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশ লঙ্ঘন। তবে যদি কেউ অসুস্থতা, চিকিৎসা বা চরম বাধ্যবাধকতা ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে করে, তাহলে তা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

ব্যতিক্রম:
শুধুমাত্র মাহরাম পুরুষদের সামনে (যেমন: বাবা, ভাই, চাচা, মামা, খালু, ফুফা, শ্বশুর, দত্তক পুত্র, দুধ-ভাই) মুখ খোলা রাখা যাবে। কিন্তু দেবর, ভগ্নিপতি, চাচাতো-মামাতো ভাই এদের মধ্যে পড়ে না।


৩) বাবা-মায়ের বা মুরুব্বীদের কথা না শুনলে গুনাহ হবে?

বিষয়টি দুটি দিক দিয়ে দেখতে হবে:

(ক) শরীয়তের হুকুমের ক্ষেত্রে:

যদি বাবা-মা হারাম কাজের আদেশ দেন (যেমন: নন-মাহরামের সামনে বেপর্দা হওয়া), তাহলে তাদের কথা শোনা যাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (সহিহ বুখারি: ৭২৫৭, সহিহ মুসলিম: ১৮৪০)

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার — “পিতা-মাতার আনুগত্য ওয়াজিব, তবে তা শুধু বৈধ কাজে; হারাম কাজে তাদের আনুগত্য করা যাবে না।” (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাজার)
  • ফাতাওয়া উসমানী — “পর্দা ফরজ; বাবা-মা যদি পর্দা ছাড়ার আদেশ দেন, তবে তা মানা যাবে না।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩০১)

(খ) সদাচরণ ও কৌশলের ক্ষেত্রে:

তবে অবাধ্যতা করা যাবে না। বাবা-মায়ের সাথে সদাচরণ, সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রাখতে হবে। তাদের বুঝাতে হবে যে আপনি ইসলাম মানতে চান, এবং এটি তাদের অবাধ্যতা নয়; বরং আল্লাহর হুকুম পালন।

কুরআন:
“তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করো।” (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
“আর যদি তারা তোমাকে শিরক করতে বাধ্য করে, তবে তাদের কথা শোনো না; কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখো।” (সূরা লুকমান: ১৫)

অনেকের কথা “আমি পর্দা মানতে চাই অথচ বাবা-মায়ের কথা শুনি না” — এর জবাব:

  • পর্দা মানা আল্লাহর হুকুম; বাবা-মায়ের কথা শোনা আল্লাহর হুকুম।
  • কিন্তু যখন বাবা-মা হারাম কাজের আদেশ দেন, তখন তাদের কথা শোনা যাবে না; এতে গুনাহ হবে না।
  • বরং পর্দা ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে।
  • তাই তাদের ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রেখে, কৌশলীভাবে বিষয়টি বোঝাতে হবে।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | পাত্র ছাড়া অন্য পুরুষের সামনে মুখ খোলা? | জায়েজ নয় | | বিয়ের পর দেবর/ভগ্নিপতির সামনে মুখ খোলা? | জায়েজ নয়; গুনাহ হবে | | বাবা-মায়ের কথা না শোনা? | হারাম কাজে না শোনা গুনাহ নয়; তবে সদাচরণ করতে হবে |


করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)

১. পাত্রী দেখার সময়: শুধু পাত্রের সাথে দেখা করুন; অন্য পুরুষদের সামনে যাবেন না।
২. বিয়ের পর: দেবর, ভগ্নিপতি, চাচা, মামা — এদের সামনে পূর্ণ পর্দা করুন।
৩. বাবা-মায়ের সাথে: ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখুন; কৌশলীভাবে ইসলামের হুকুম বোঝান।
৪. প্রয়োজনে: কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির সাহায্য নিন, যিনি পরিবারকে বোঝাতে পারবেন।
৫. দুআ করুন: আল্লাহর কাছে হেদায়েত ও সবর চাইতে থাকুন।


উপসংহার:
আপনি সঠিক পথে আছেন। পর্দা আল্লাহর হুকুম; এটি পালন করুন। বাবা-মায়ের সাথে সদাচরণ করুন, কিন্তু হারাম কাজে তাদের আনুগত্য করবেন না। আল্লাহ আপনার সহায় হোন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.