রক্তস্রাব শুরু হওয়ার পর পিল সেবন করে রক্তস্রাব বন্ধ করে স্বামীর সাথে কি সহবাস করা যাবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: স্বামী-স্ত্রীর মিলন ও নামাজের বিধান
প্রশ্ন: স্বামী চাকরির জন্য দূরে থাকেন। তার ছুটির দিনে স্ত্রীর মাসিক শুরু হয়। স্ত্রী রাতে পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ করে দেন। এমতাবস্থায় স্বামী সহবাস করতে পারবেন কি? আর স্ত্রী কখন থেকে নামাজ শুরু করবেন?
সারসংক্ষেপ:
হানাফি মতে, ঋতুস্রাবের (হায়জ) সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন (৭২ ঘণ্টা) ও সর্বোচ্চ ১০ দিন। যদি রক্তপাত ৩ দিনের কম হয় এবং তারপর সম্পূর্ণ বন্ধ হয়, তবে তা হায়জ নয়, বরং ইস্তিহাজা (অস্বাভাবিক রক্তস্রাব) বলে গণ্য হবে। এমতাবস্থায় রক্তপাত বন্ধ হওয়ার পর স্ত্রী পবিত্র হবেন এবং স্বামীর জন্য সহবাস বৈধ হবে। তবে যে নামাজগুলো তিনি ঋতুস্রাব ভেবে ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো অবশ্যই ক্বাযা করতে হবে। রক্তপাত বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নামাজ শুরু করতে হবে (ওযু করে)।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা (হানাফি ফিকহের আলোকে)
১. ঋতুস্রাবের ন্যূনতম সময় ও ইস্তিহাজার নিয়ম
- হানাফি ফিকহ: হায়জের (ঋতুস্রাব) ন্যূনতম সময় ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা)। এর কম রক্তপাত হলে তা হায়জ নয়, বরং ইস্তিহাজা (অস্বাভাবিক রক্তস্রাব) বলে গণ্য হবে। [১]
- প্রয়োগ: স্ত্রীর মাসিক শুরু হওয়ার পর তিনি পিল খেয়ে রাতেই রক্তপাত বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে রক্তের স্থায়িত্বকাল ২৪ ঘণ্টারও কম। যা ৩ দিন পূর্ণ করে না। তাই এটি হায়জ নয়, ইস্তিহাজা। [২]
সূত্র:
"أقل الحيض ثلاثة أيام ولياليها"(الهداية)
অর্থ: "হায়জের ন্যূনতম সময় তিন দিন ও তিন রাত।" (আল-হেদায়া)
"إذا رأت الدم يوما أو بعض يوم ثم انقطع قبل تمام ثلاثة أيام فهو استحاضة"(فتاوى عالمگيري)
অর্থ: "যদি কোনো নারী একদিন বা কিছু অংশ রক্ত দেখে, তারপর তা তিন দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা ইস্তিহাজা।" (ফাতাওয়া আলমগীরী)
২. পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ করার বিধান
- বৈধতা: বৈধ প্রয়োজনে (যেমন স্বামী দূরে থাকার কারণে মিলনের ইচ্ছা) পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ করা জায়েয। তবে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে এটা সর্বদা করা উচিত নয়। [৩]
- শর্ত: রক্তপাত বন্ধ হলে স্ত্রী পবিত্র হবেন। সহবাসের আগে স্ত্রীকে গোসল করতে হবে না, কারণ এটি ইস্তিহাজার রক্ত (হায়জ নয়)। তবে নাপাকি দূর করতে ভালোভাবে ধৌত করা (ইস্তিঞ্জা) যথেষ্ট। [৪]
সূত্র:
"يجوز للمرأة أن تستعمل دواء لقطع الحيض إذا كان لحاجة، كالحج أو لزوجها"(فتاوى محمودية)
অর্থ: "যদি কোনো প্রয়োজন যেমন হজ বা স্বামীর জন্য হয়, তাহলে মহিলার জন্য ঋতুস্রাব বন্ধ করার ওষুধ ব্যবহার করা জায়েয।" (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া)
৩. সহবাসের বিধান
- রক্তপাত চলাকালীন: যেহেতু স্ত্রী পিল খেয়ে রক্ত বন্ধ করেছেন, তাই রক্তপাত থাকা অবস্থায় সহবাস নাজায়েয (হারাম)। কারণ এটি ঋতুস্রাবের সময় হলেও ইস্তিহাজা অবস্থায়ও সহবাস করলে অপবিত্রতা থেকে বাঁচতে সতর্কতা জরুরি। তবে হানাফি মতে, ইস্তিহাজা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করা জায়েয, কিন্তু উত্তম হলো রক্তপাত বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। [৫]
- রক্তপাত বন্ধ হওয়ার পর: রক্তপাত সম্পূর্ণ বন্ধ হলে স্ত্রী পবিত্র বিবেচিত হবেন। স্বামী সহবাস করতে পারবেন। কোনো গোসলের প্রয়োজন নেই (শুধু ইস্তিঞ্জা ও ওযু)। [৬]
সূত্র:
"إذا انقطع دم الاستحاضة حل وطؤها"(الدر المختار)
অর্থ: "ইস্তিহাজার রক্ত বন্ধ হলে তার সাথে সহবাস হালাল হয়।" (রাদ্দুল মুহতার)
৪. নামাজের বিধান
- নামাজ কখন শুরু করবেন: স্ত্রী যখন নিশ্চিত হবেন যে রক্তপাত্র সম্পূর্ণ পরিষ্কার (শুকনো বা সাদা স্রাব), তখনই তিনি পবিত্র হবেন। পিল খেয়ে বন্ধ করায় তা ক্রমাগত ৩ দিন স্থায়ী না হওয়ায় এটি হায়জ নয়। তাই রক্ত বন্ধ হবার পরই তিনি নামাজ পড়া শুরু করবেন (ওযু করে)। [৭]
- ছুটে যাওয়া নামাজের ক্বাযা: যেহেতু রক্তপাত হায়জের সর্বনিম্ন সময় (৩ দিন) পূর্ণ করেনি, তাই তিনি ঋতুস্রাবের অবস্থায় ছিলেন না। সুতরাং রক্তপাতের সময় যে নামাজগুলো তিনি ছেড়ে দিয়েছেন, সেগুলো ক্বাযা করতে হবে। যেমন: ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশা—প্রতি ওয়াক্তের ফরজ নামাজ আদায় করবেন। (মনে রাখবেন: ক্বাযা নামাজের নিয়ম হলো যতগুলো ছুটেছে ততগুলো আদায় করা।) [৮]
সূত্র:
"إذا رأت الدم أقل من ثلاثة أيام ثم انقطع فعليها قضاء الصلاة التي تركتها"(فتاوى عالمگيري)
অর্থ: "যদি কোনো নারী তিন দিনের কম রক্ত দেখে, তারপর তা বন্ধ হয়, তবে সে যে নামাজ ছেড়ে দিয়েছে সেগুলোর ক্বাযা তার উপর ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া আলমগীরী)
সংক্ষিপ্ত উত্তর (সুপারিশ)
উত্তর:
- সহবাস: স্ত্রী রক্তপাত বন্ধ করার পর (যখন পূর্ণ শুষ্কতা নিশ্চিত হবে) স্বামী সহবাস করতে পারবেন। কারণ রক্ত ৩ দিনের কম স্থায়ী হয়েছে, যা হায়জ নয় বরং ইস্তিহাজা। ইস্তিহাজার রক্ত বন্ধ হলে স্ত্রী পবিত্র।
- নামাজ: রক্ত বন্ধ হওয়ার সঙ্গেই স্ত্রী ওযু করে নামাজ শুরু করবেন। তবে তিনি যে নামাজগুলো ছেড়ে দিয়েছেন (যেমন ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা) সেগুলোর ক্বাযা আদায় করবেন। রাতের বেলায় রক্ত বন্ধ হলে পরদিন ফজরের আগেই ক্বাযা পড়তে পারেন।
সতর্কতা:
পিল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একান্ত প্রয়োজন না হলে এ পদ্ধতি গ্রহণ না করাই ভালো। আর সহবাসের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই পবিত্রতা ও আদব বজায় রাখা জরুরি।
আল্লাহু আলাম (আল্লাহই অধিক জ্ঞানী)।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত গ্রন্থসমূহ: আল-হেদায়া, রাদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগীরী, ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, বেহেশতী জেওর।