হানাফি মতে ফরয গোসলের পূর্ণ বিধান: চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর নিয়ম।

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 693
Questioner: saifurrahman 1974
Question Asked: 24 May 2026, 05:10 PM
Reviewed & Published: 24 May 2026, 05:18 PM
Views: 75
Tokens: 3,902
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় কিভাবে পানি দিবো? নিয়ম টা কি?ফুল নিয়ম?
২.আমার দেহের লোম অনেক বড়। তাই ফরয গোসলে কিভাবে গোড়া তে পানি পৌছাবো?

বর্তমান সময় কতটা পানি ব্যবহার করলে অপচয় হবে না? যেমন ১০লিটার। সাবান দিয়ে শ্যাম্পু সব ব্যবহার করে

Answer

উত্তর:

প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্মরণ রাখা জরুরি:

  • ফরয গোসলের তিনটি ফরয (ওয়াজিব) কাজ: (১) কুলি করা (মাদমাদা), (২) নাকে পানি দেওয়া (ইস্তিনশাক), (৩) সারা শরীর ভিজানো যাতে কোনো স্থান শুষ্ক না থাকে। চুলের গোড়া ও দেহের লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরযের অন্তর্ভুক্ত।
  • হানাফি মতে, যদি চুল বা লোম এত ঘন হয় যে ত্বক দেখা যায় না, তবে পানি অবশ্যই ত্বক পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় গোসল সহীহ হবে না।

১. ফরয গোসলের পূর্ণ নিয়ম ও চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর পদ্ধতি

গোসলের সম্পূর্ণ নিয়ম (হানাফি মতে):

  1. নিয়ত: মনে মনে গোসলের (নাপাকি দূর করার) নিয়ত করুন।
  2. প্রথমে উভয় হাত ও গোপনাঙ্গ ধৌত করুন (নাপাকি থাকলে তা পরিষ্কার করুন)।
  3. ওযু করুন (সাধারণ ওযুর মতো, তবে পা শেষে ধোওয়া যাবে)। অনেক আলেম পা গোসলের শেষে ধোয়ার সুবিধা দিয়েছেন (যাতে পা ভিজে না যায়)।
  4. মাথায় তিনবার পানি ঢালুন – পুরো চুলের গোড়া (মাথার চামড়া) পর্যন্ত পানি পৌঁছানো আবশ্যক। চুল আঁচড়িয়ে বা আঙুল দিয়ে ঘষে নিন যাতে পানি ত্বকে পৌঁছায়।
  5. ডান কাঁধ ও শরীরের ডান পাশে পানি ঢেলে ঘষুন।
  6. বাম কাঁধ ও শরীরের বাম পাশে পানি ঢেলে ঘষুন।
  7. পুরো শরীর ভালোভাবে ভিজিয়ে নিন – কোনো স্থান শুষ্ক না রাখুন। পা শেষে ধুয়ে নিন (যদি আগে না ধুয়ে থাকেন)।

চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর বিশেষ পদ্ধতি:

  • ঘন চুলের জন্য: মাথায় পানি ঢালার পর আঙুল দিয়ে চুলের ভেতর প্রবেশ করিয়ে চামড়া ঘষুন। নিশ্চিত করুন যে পানি প্রতিটি চুলের গোড়ায় পৌঁছেছে।
  • পুরু চুল বা বিনুনি করা চুল (মহিলাদের ক্ষেত্রে): মহিলাদের বিনুনি খুলতে হবে না যদি পানি বিনুনির ভেতর দিয়ে চামড়ায় পৌঁছায়; অন্যথায় অবশ্যই খুলতে হবে অথবা পানি এমনভাবে ঢালতে হবে যাতে গোড়া ভিজে যায়।
  • মাথার ত্বকের প্রতিটি অংশ (ডান-বাম-মধ্য) ভিজানো আবশ্যক

সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ১/৪৯৫ – “চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয; তা না হলে গোসল সহীহ নয়।”
  • বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): গোসলের অধ্যায় – “মাথার চুলের নীচের চামড়া পুরো ভিজাতে হবে।”
  • ফতোয়া আলমগীরী: ১/১৫ – “গোসলের ফরজ তিনটি; তৃতীয়টি: সারা শরীর ভিজানো, যার মধ্যে চুলের গোড়াও অন্তর্ভুক্ত।”

২. দেহের বড় লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর নিয়ম

দেহের লোম (হাত-পা-বুক-পিঠ) বড় হলেও অসুবিধা নেই। ফরয হচ্ছে ত্বক পর্যন্ত পানি পৌঁছানো।

পদ্ধতি:

  1. পানি ঢালার সময় হাত দিয়ে লোমের উপর ঘষা দিন, যাতে পানি লোমের গোড়ায় পৌঁছায়।
  2. লোম খুব ঘন ও বড় হলে লোমের স্তর ভেদ করে ত্বক পর্যন্ত পানি পৌঁছানো নিশ্চিত করুন।
  3. সাবান বা শ্যাম্পু ব্যবহার করলে তা আরও সহজ হয় – ফেনার মাধ্যমে পানি ত্বকে পৌঁছায়। তবে শুধু ফেনাই যথেষ্ট নয়; পানি সরাসরি ত্বক স্পর্শ করতে হবে।
  4. যদি লোম এত ঘন হয় যে পানি ত্বক পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন, তবে লোমকে হাত দিয়ে আঁচড়িয়ে বা আলাদা করে সরাসরি ত্বকে পানি ঢালতে হবে।

হানাফি ফতওয়া:

  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী) – “শরীরের লোমের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। তা না হলে গোসল হবে না।”
  • ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) – “যদি লোম খুব ঘন হয়, তবে হাত দিয়ে পানিকে ত্বক পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।”

৩. পানি অপচয় না করে কতটুকু পানি ব্যবহার করা উচিত?

ইসলামে পানির অপচয় নিষেধ, এমনকি প্রবাহিত নদীর ধারেও। তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন-হাদিসে বাঁধা নেই; বরং প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা জায়েজ।

সুন্নাহি পরিমাণ:

  • রাসূলুল্লাহ (সা.) ফরয গোসলের জন্য ১ সা’ (প্রায় ২.৫-৩ কেজি) থেকে ৫ মুদ (প্রায় ৬-৮ লিটার) পানি ব্যবহার করতেন। (বুখারি, মুসলিম)
  • পানি কম使用时 আবশ্যক স্তর পর্যন্ত পানি পৌঁছানো। সাবান/শ্যাম্পু ব্যবহার করলে স্বাভাবিকভাবেই বেশি পানি লাগবে। ১০ লিটার ব্যবহার করা অপচয় নয় যদি তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত না হয়।

অপচয়ের সীমা:

  • গোসলের জন্য স্বাভাবিক প্রয়োজনের বেশি পানি ব্যবহার করাই অপচয়। যেমন: অকারণে পানি ফেলা, অনেকক্ষণ কল খোলা রাখা ইত্যাদি।
  • সাবান বা শ্যাম্পু লাগানোর মধ্যবর্তী সময়ে কল বন্ধ রাখা সুন্নত ও অপচয় রোধের উপায়।

হাদিস: “নদীর ধারেও ওযু করলে পানি অপচয় করো না।” (ইবনে মাজাহ, সহিহ)
হানাফি রেফারেন্স:

  • শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবী) – গোসলের পানি পরিমাণের বর্ণনা।
  • ফতোয়া আলমগীরী – “পানি অপচয় মাকরুহ। প্রয়োজনমতো ব্যবহার করাই উত্তম।”

উপসংহার: ১০ লিটার পানি ব্যবহার করে সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করলে তা অপচয় নয় যদি আপনার চুল ও শরীরের আকারে তা প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রয়োজনের অধিক ব্যবহার না করাই ভালো।


সারসংক্ষেপ ও ফিকহী নির্দেশনা

| প্রশ্ন | হানাফি মতে উত্তর | সূত্র | |------------|----------------------|-----------| | চুলের গোড়ায় পানি দেওয়া | পানি ঢেলে আঙুল দিয়ে ঘষে চামড়া ভিজাতে হবে। ঘন চুলের জন্য বিশেষ যত্ন। | রদ্দুল মুহতার, বেহেশতি জেওর | | দেহের বড় লোমের গোড়া | পানি ত্বক পর্যন্ত পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। লোম সরিয়ে বা ঘষে পানি প্রবেশ করান। | ইমদাদুল ফতোয়া, ফতোয়া উসমানী | | পানি অপচয়ের পরিমাণ | ১০ লিটার ব্যবহার স্বাভাবিক, তবে প্রয়োজনমতো সীমিত রাখা সুন্নত। | ফতোয়া আলমগীরী, শরহু মা‘আনিল আসার |

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহভাবে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.