তালাকের সন্দেহের পর সংসার করা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১. বিয়ের ছয়দিনের মাথায় আমি তখন হায়েজ অবস্থায় ছিলাম।আমার স্বামী জানতো না মজা করে বললেও তালাক হয়।উনি আমাকে মজা করে বলে এই আমি তোকে ছেড়ে দিব। নাকি ছেড়ে দিলাম বলেছে আমি ঠিক মতো শুনতে পাইনি।আমি নিশ্চিত ও নই উনি কি বলেছে। একবার নাকি দুইবার বলেছে সেটাও নিশ্চিত নই। অনেকদিন পর উনাকে জিজ্ঞাসা করলে উনি বলে মনে নেই।
২.আসসালামুআলাইকুম। আমাদের বিবাহের ১২-১৫ দিনের মাথায় আমরা দুজন একটু বাহিরে ঘুরতে যাই।যার কারনে আমার শাশুড়ি অনেক রাগ করে। এটা নিয়ে অনেক ঝগড়া হয়। পরে আমার স্বামী তাদের সাথে রাগ করে আমাকে বলে তুমি চলে যাও।এবার তোমার বাবা মাকে বলো ভালো দেখে বিয়ে দিতে। তুমি এখান থেকে চলে গেলে তোমার জীবনটা সুন্দর হবে। তখন আমি তালাক সম্পর্কে এতো সচেতন ছিলাম না যার কারনে আমরা দুজন সংসার করতে থাকি।পরে যখন সচেতনতা আসে তখন উনাকে নিয়তের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে উনি সঠিকটা বলতে পারেন না।উনি বলে উনি বাপের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেছে।তালাকের কথা বলেনি।
আমাদের কি তালাক হয়েছে??
৩.আসসালামুআলাইকুম। আমার তখন নতুন বিয়ে হয় ১৩ থেকে ১৪ দিন হবে এমন। একদিন বিকালে চা বানানো নিয়ে আমার আর আমার স্বামীর মধ্যে খুনসুঁটি হয় তখন উনি আমাকে বলে তুমি চলে যাও। আমি বলি সত্যি চলে যাবো।উনি বলে হ্যা। তারপর আমি আমার মা কে কল দেই। আমি আমার মাকে বলি আমার স্বামী আমাকে চলে যেতে বলেছে।তখন আমার মা আমার স্বামীকে কল দিলে উনি সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নেয়। পরের দিন আমি উনাকে এই ব্যাপারে বললে উনি বলে উনি জানেনা চলে যাও বললে কিছু হয়।তখন আমিও তালাকের মাসাআলা সম্পর্কে এতো বিস্তারিত জানতাম। এর অনেক মাস পর আমি যখন সব ভালোভাবে জানলাম তখন উনাকে জিজ্ঞাসা করলে উনি বলে বাপের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেছে তালাকের কথা বলেনি। আসলে উনার তালাকের নিয়ত ছিল কিনা আজও জানি না।এখানে আমার করনীয় কি।অনেক চিন্তা হয়.
৪.আসসালামুআলাইকুম। আমার স্বামী আমাকে বলেছে উনি আমার সাথে থাকবেনা।অনেকবার বলেছে তখন আমি উনাকে বলেছি আপনি এসব কি বলেন। উনি বলে কেন স্বামী স্ত্রী কি আলাদা থাকেনা?? তখন আমি উনাকে বলেছি আপনি কি ঐ উদ্দেশ্যে বলেছেন( মানে আমি তালাকের উদ্দেশ্যের কথা জিজ্ঞাসা করেছি যদি মুখ দিয়ে বলিনি)? উনি বলেছেন হ্যা ঐ উদ্দেশ্যেই বলেছি জানি না উনি বুঝে বলেছেন কিনা। পরে উনাকে আবার জিজ্ঞাসা করলে উনি বলে স্বামী স্ত্রী আলাদা বাসায় থাকার কথা বলেছে।তখন আমি বলি আমি তো ঐ বলতে তালাকের কথা জিজ্ঞাসা করছি। তখন উনি বলে তুমি কোন উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করছো তা জানার দরকার আছে??
এখানে কি তালাক হবে??
৫.আসসালামুআলাইকুম। আমার আর আমার স্বামীর মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া হয়।উনি কল করে আমার বাবা মাকে বলে আপনারা দেশে আসেন বসেন।আমিও আমার মামা খালুকে নিয়ে বসি। আমার পক্ষে আর সংসার করা সম্ভব না। অনেক চেষ্টা করেছি সংসারটা বাঁচানোর। উনি এসব রাগের মাথায় বলেছে।নিয়তের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে উনি চুপ থাকবেন কিছুই বলবেন না জানি এবং
। আমার স্বামী আমাকে বলেছে আমার সাথে সংসার করতে চান না অনেকবারই বলেছেন। কিন্তু নিয়তের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে বলে আমি তোমারে কিছু কইছি?? আমি তোমার মার লগে কথা কইছি।তোমার মা দেশে আসুক তারপর যা করার করবে। এটাও রাগ করে বলেছে এখানে তালাক হয়েছে??
৬.আমার মামা শ্বশুর মারা গেছে ঐ দিন আবার আমাদের মাঝে অনেক অশান্তি হয় তাই উনি অনেক রাগ করেছে। তখন উনাকে আমি জিজ্ঞাসা করি কি হয়েছে তখন উনি বলেন । হের লগে হের বউয়ের তালাক হইছে হেয় হেরে বউরে তালাক কইছে এটা বলেছে না কি তোর লগে আমার তালাক হইছে এটা বলেছে আমার স্পষ্ট মনে নেই।তোরে আমি তালাক কইছি এই দুই রকমের বাক্য নিয়ে সন্দেহ থাকে।মানে স্বামী কি নিজেদের কথা বলেছে নাকি আরেক জনের এই নিয়ে সন্দেহ থাকে তাহলে করনীয় কি।স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলে কিছুই বলেনা বিরক্ত হয়। আসলে হুজুর আমি সব ভুলে যাই যে কি বলেছে স্পষ্ট মনে রাখতে পারিনা
এখানে কি তালাক হবে??
৭.আসসালামুআলাইকুম। আমার আর আমার স্বামীর মাঝে প্রচন্ড ঝগড়া হয়।তখন উনি আমাকে বলে সবকিছু সমাধান করো। তোমার বাপ খালুরে জানাও উনি হয়তো সংসার ছাড়াছাড়ির কথা বুঝিয়েছেন কিন্তু মুখে তালাক দিলাম এমন কিছু বলেননি। তখন আমি বলি আপনি এসব উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না। উনি বলে এসবই বলবো।এটা ছাড়া আর পথ নেই
আমার। এগুলা উনি রাগ করে বলেছে
এখানে কি তালাক হয়েছে।
উপরের সবগুলা ঘটনার পর কি আমরা একসাথে সংসার করতে পারবো??
Answer
সংসার করা যাবে কি? — তালাক সংক্রান্ত বিস্তারিত ফতোয়া
উত্তর:
আপনার বর্ণিত সাতটি ঘটনার কোনোটিতেই — — তালাক পতিত হয়নি।
কারণ তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট তালাকের শব্দ (صريح) অথবা তালাকের নিয়তসহ কিনায়া শব্দ (كنائي) অপরিহার্য। আপনার স্বামী কোথাও স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দ উচ্চারণ করেননি; বরং "চলে যাও", "বাপের বাড়িতে যাও", "আলাদা থাকব না" — এসব কিনায়া শব্দ, যা নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত করে না।
আর নিয়তের ব্যাপারে স্বামী অস্বীকার করছেন এবং আপনার নিজেরও স্মৃতি স্পষ্ট নয়। সুতরাং সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হয় না — এই মূলনীতির আলোকে উভয়ে পূর্বের মতোই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সংসার করতে পারবেন।
«وَالشَّكُّ فِي الطَّلَاقِ لَا يُوجِبُ الطَّلَاقَ بِالْإِجْمَاعِ» — "তালাকের ব্যাপারে সন্দেহ ইজমা অনুযায়ী তালাক পতিত করে না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৭ — কিতাবুত তালাক)
আরও ইরশাদ:
«الْأَصْلُ بَقَاءُ النِّكَاحِ فَلَا يَزُولُ بِالشَّكِّ» — "মূলনীতি হলো বিবাহের স্থায়িত্ব; সন্দেহ দ্বারা তা দূর হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৭)
তালাকের দুই প্রকার শব্দ
১. صريح (স্পষ্ট) শব্দ
যেমন: "তালাক", "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" (তালাকের নিয়তে), "ফাসখ" ইত্যাদি। এতে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয় (রাজি'আহ বা বায়েন, শব্দের প্রকারভেদে)।
২. كناية (কিনায়া/ইঙ্গিতমূলক) শব্দ
যেমন: "চলে যাও", "বাপের বাড়িতে যাও", "আলাদা হয়ে যাও", "তোমার সাথে থাকব না" ইত্যাদি। এতে তালাকের নিয়ত অপরিহার্য। নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।
«وَالْكِنَايَاتُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ» — "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা অবস্থার দলীল থাকলে।" (আল-হিদায়া, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৯৪)