কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কোথাও "আমি" আর কোথাও "আমরা" কেন বলেন?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6809
Questioner: Zannatun Naiem
Question Asked: 12 Oct 2026, 08:07 PM
Reviewed & Published: 12 Oct 2026, 09:05 PM
Views: 11
Tokens: 3,339
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অনেক আয়াতে আমার না বলে আমাদের কেন বলেছেন?

Answer

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অনেক আয়াতে "আমার" না বলে "আমাদের" কেন বলেছেন?

ভূমিকা

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা কোথাও একবচন (আমি/আমার) এবং কোথাও বহুবচন (আমরা/আমাদের) ব্যবহার করেছেন। এটি আরবি ভাষার বিশেষ রীতি ও কুরআনের অলৌকিকতা (ই'জায) এর অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে ইসলামী আকীদা হলো—আল্লাহ তায়ালা এক, অদ্বিতীয়, অংশীদারমুক্ত; বহুবচন ব্যবহারে কখনোই আল্লাহর একত্বে কোনো আঁচ পড়ে না।


১. আরবি ভাষার "আযমত ও জালাল" (মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব) প্রকাশের রীতি

আরবি ভাষায় কোনো মহান ব্যক্তি বা রাজা-বাদশাহ নিজেকে বোঝাতে বহুবচন ব্যবহার করেন—একে বলা হয় "নূনুল আযমত" (نون العظمة) বা "আমনুল জালালাহ"। যেমন—একজন বাদশাহ বলেন, "আমরা আদেশ দিচ্ছি" যদিও তিনি একা। এটি তার মহিমা ও ক্ষমতার প্রকাশ।

আল্লাহ তায়ালা সর্বোচ্চ মহিমার অধিকারী, তাই তিনি কোথাও "আমি" (إني، أنا) এবং কোথাও "আমরা" (إنا، نحن) ব্যবহার করেন। উভয়ই আল্লাহর একত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আল-হিদায়াহ ও উসূলুশ শাশী-তে উল্লেখ আছে যে, আরবি ভাষায় মহিমা প্রকাশের জন্য বহুবচন ব্যবহার করা বৈধ ও প্রচলিত।


২. কুরআনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ অনুযায়ী ব্যবহার

(ক) যেখানে "আমি" (একবচন) এসেছে:

এসব স্থানে সাধারণত আল্লাহর সত্তা, রহমত, ক্ষমা, নৈকট্য ইত্যাদি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় বর্ণিত হয়েছে।

সূরা আল-হিজর, আয়াত ৪৯:
نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিন যে, নিশ্চয়ই আমি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"

সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৬:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ
"আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, (বলো) নিশ্চয়ই আমি নিকটে।"

(খ) যেখানে "আমরা" (বহুবচন) এসেছে:

এসব স্থানে সাধারণত সৃষ্টি, বিধান প্রদান, কিতাব নাযিল, শাস্তি প্রদান, রাজত্ব পরিচালনা ইত্যাদি মহান কাজের বর্ণনা এসেছে।

সূরা আল-হিজর, আয়াত ৯:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
"নিশ্চয়ই আমরা এই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক।"

সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৭:
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَهَا
"নিশ্চয়ই আমরা পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে তা তার জন্য শোভা বানিয়েছি।"


৩. তাফসীরের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা

ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) ও ইমাম তাবারী (রহ.)-এর বক্তব্য:

তারা বলেন, আরবি ভাষায় মহান ব্যক্তিরা নিজেদের মহিমা প্রকাশের জন্য বহুবচন ব্যবহার করেন। আল্লাহ তায়ালা আরবদের ভাষায় কুরআন নাযিল করেছেন, তাই তাদের ভাষার রীতি অনুসারেই তিনি কোথাও একবচন, কোথাও বহুবচন ব্যবহার করেছেন।

মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফী রহ.):

মুফতি মুহাম্মদ শাফী (রহ.) উল্লেখ করেন—"আল্লাহ তায়ালা কোথাও 'আমি' বলে বান্দার সাথে সরাসরি সম্পর্ক ও নৈকট্য প্রকাশ করেন, আবার কোথাও 'আমরা' বলে নিজের মহিমা, ক্ষমতা ও রাজত্বের বিশালতা প্রকাশ করেন।"

ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.):

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন—"কুরআনে বহুবচন ব্যবহার আল্লাহর একত্বের পরিপন্থী নয়; বরং এটি আরবি ভাষার মহিমা প্রকাশের রীতি। এতে আল্লাহর সাথে কোনো বহুত্ব বা অংশীদারিত্বের ধারণা করা সম্পূর্ণ ভুল ও কুফরির অন্তর্ভুক্ত।"


৪. আকীদাগত সতর্কতা

কেউ যদি মনে করে যে, "আমরা" দ্বারা আল্লাহ তায়ালা একাধিক সত্তাকে বোঝাচ্ছেন (নাউযুবিল্লাহ), তবে তা হবে কুফরি ও শিরক। কারণ:

সূরা আল-ইখলাস, আয়াত ১:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
"বলো, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।"

সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৬৩:
وَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ
"তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ; তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।"

সুতরাং, "আমরা" শব্দটি আল্লাহর মহিমা, ক্ষমতা ও আযমত প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়—এটি সর্বসম্মত আকীদা।


৫. সংক্ষিপ্ত সারমর্ম

| বিষয় | ব্যাখ্যা | |------|----------| | "আমি" (أنا/إني) | আল্লাহর নৈকট্য, রহমত, ক্ষমা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক | | "আমরা" (نحن/إنا) | আল্লাহর মহিমা, ক্ষমতা, রাজত্ব, সৃষ্টি ও বিধান | | মূল কারণ | আরবি ভাষার "নূনুল আযমত" বা মহিমা প্রকাশের রীতি | | আকীদা | আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়; বহুবচনে কোনো বহুত্ব নেই |


উপসংহার

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কোথাও "আমি" এবং কোথাও "আমরা" বলেছেন—এটি আরবি ভাষার মহিমা প্রকাশের রীতি (نون العظمة)। এতে আল্লাহর একত্বে কোনো আঁচ পড়ে না। বরং এটি কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতা ও আল্লাহর অসীম মহিমার প্রকাশ। মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো—এ বিষয়ে সঠিক আকীদা পোষণ করা এবং কোনো প্রকার সন্দেহ বা বিভ্রান্তিতে না পড়া।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.