যাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকলেও কেউ যদি বাবা মার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জামানো টাকা দিয়ে কুরবানী দিতে চান, তবে বিধান কি?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: যাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকলেও কেউ যদি বাবা-মার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জমানো টাকা দিয়ে কুরবানী দিতে চান, তবে বিধান কী?
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
কুরবানী ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হানাফী মাযহাব মতে, কুরবানী ওয়াজিব হয় সেই ব্যক্তির উপর যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ (সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রৌপ্য বা সমমূল্যের অর্থ) কুরবানীর দিন বিদ্যমান থাকে এবং তা মূল প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়। যদি কারো নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তবে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়; তবে ইচ্ছা করলে নফল (সুন্নত) হিসেবে কুরবানী দিতে পারেন।
প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তির যাকাতযোগ্য সম্পদ নেই, অর্থাৎ তার নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, তাই তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। তিনি নিজের জমানো টাকা দিয়ে নফল কুরবানী দিতে চান, কিন্তু তার বাবা-মা তা চান না।
পিতা-মাতার আনুগত্যের বিধান
ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা ফরজ। কোনো বৈধ বিষয়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করা নাজায়েয, যদি না তা আল্লাহর নাফরমানী হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا
"আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আল-আনকাবুত: ৮)
হাদীস শরীফে এসেছে:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর ব্যাপারে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদে আহমদ, সহীহ ইবনে হিব্বান)
কিন্তু এখানে কুরবানী নিজেই একটি ইবাদত; এটি গুনাহের কাজ নয়। তবে যেহেতু এটি ওয়াজিব নয় বরং নফল, তাই পিতা-মাতার ইচ্ছার বিপরীত করা তাদের অবাধ্যতা (উকূক) হবে, যা একটি বড় গুনাহ। পিতা-মাতার অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি, এমনকি নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফকীহগণের বক্তব্য
হানাফী ফিকহের কিতাবে এসেছে:
لَا يَجُوزُ لِلْوَلَدِ أَنْ يَتَصَرَّفَ فِي مَالِهِ بِغَيْرِ إِذْنِ وَالِدَيْهِ إِذَا كَانَ فِي ذَلِكَ إِيذَاءٌ لَهُمَا، وَلَوْ كَانَ التَّصَرُّفُ طَاعَةً غَيْرَ وَاجِبَةٍ
"ছেলের জন্য পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া নিজ মালে এমনভাবে ব্যয় করা জায়েয নয়, যাতে তাদের কষ্ট হয়, যদিও তা নফল ইবাদত হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৬২)
হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) লিখেছেন:
"নফল কুরবানী যদি পিতা-মাতার নিষেধ সত্ত্বেও দেওয়া হয়, তাহলে তা তাদের অবাধ্যতা গণ্য হবে এবং এই অবাধ্যতার পাপ নফল কুরবানীর সওয়াব অপেক্ষা অধিক। তাই এ অবস্থায় পিতা-মাতার কথা মেনে নেওয়া কর্তব্য।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৪২)
বিশেষ বিবেচনা
- যদি পিতা-মাতা অমুসলিম হন বা স্পষ্ট অন্যায়ভাবে নিষেধ করেন, তবে ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু সাধারণত মুসলিম পিতা-মাতার ক্ষেত্রে তাদের অসম্মতি থাকলে নফল কুরবানী না করাই উত্তম এবং জায়েয নয়।
- জমানো টাকা যদি সম্পূর্ণ আপনার নিজস্ব হয়, তবুও পিতা-মাতার অবাধ্যতার পাপ এড়ানোর জন্য তাদের অনুমতি নেওয়া বা তাদের রাজি করানো চেষ্টা করা উচিত। যদি তারা কিছুতেই রাজি না হন, তবে সেই টাকা অন্য কোনো বৈধ সাদাকায় বা অন্য নফল ইবাদতে ব্যয় করা ভালো।
সারসংক্ষেপ
যাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকলে কুরবানী ওয়াজিব নয়। তাই পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের জমানো টাকা দিয়ে কুরবানী দেওয়া জায়েয নয়। বরং পিতা-মাতার আনুগত্য করা ফরজ; তাদের নিষেধ সত্ত্বেও নফল কুরবানী করলে উকূকে ওয়ালিদাইন (পিতা-মাতার অবাধ্যতা) হবে। তাই তাদের অনুমতি নেওয়া বা তাদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া আবশ্যক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন।
মহাগ্রন্থ ও হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯১ (কিতাবুল উকূক)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৬২ (ফাস্লুন ফি বিিররিল ওয়ালিদাইন)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৪২ (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৪১
- বাহিশতী জেওর, ২/২১ (পিতা-মাতার হক)
- আল-হিদায়া, ৪/১০৪ (কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্ত)
আল্লাহ-ই ভালো জানেন।