স্বামী বিয়ের কাগজ ছিঁড়ে ফেললে বা বিয়ে অস্বীকার করলে শরিয়তের বিধান কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ ও ফিকহি বিশ্লেষণ
প্রশ্ন: স্বামী ও তার পরিবার বিয়ের কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলেছে, বিয়েকে অস্বীকার করেছে, স্ত্রীকে গালিগালাজ করেছে। এখন স্ত্রী জানতে চান—এমন ব্যক্তিকে নিজের স্বামী মনে করা কি ঠিক হবে? বিয়ে কি বহাল আছে?
১. বিয়ের বৈধতা কাগজপত্রের উপর নির্ভরশীল নয়
ইসলামি শরিয়তে নিকাহর বৈধতা কাবিননামা বা ডকুমেন্টের উপর নির্ভর করে না। নিকাহ সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ)
- দুইজন সাক্ষী (একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা অথবা দুইজন পুরুষ সাক্ষী)
আল-হিদায়া গ্রন্থে আছে: "النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول بحضرة شاهدين" — নিকাহ ইজাব-কবুল ও দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়।
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) ৩/৯: "ولا يشترط الكتابة في النكاح" — নিকাহতে লিখিত দলিল শর্ত নয়।
সুতরাং: সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে দুজন পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে স্বামী স্ত্রীর ইজাব কবুল এর মাধ্যমে যদি আপনাদের বিবাহ হয়ে থাকে, তাহলে এই বিবাহ এখনো অব্যাহত আছে। সে আপনার বৈধ স্বামী।
কাগজ ছিঁড়ে ফেললে বা হারিয়ে গেলে নিকাহ বাতিল হয় না। কাগজ শুধু প্রমাণের মাধ্যম।
২. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিধান
ক) স্বামী যদি বিয়ে অস্বীকার করে
যদি স্বামী ও তার পরিবার মৌখিকভাবে বা আচরণগতভাবে নিকাহ অস্বীকার করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিকাহ সম্পন্ন হয়েছিল (সাক্ষীসহ), তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে নিকাহ বহাল আছে। অস্বীকার করা মানে নিকাহ বাতিল নয়; বরং এটি মিথ্যা বলা ও অস্বীকারের গুনাহ।
তবে যদি তারা তালাক দেয় বা খুলা করে, তাহলে সম্পর্ক শেষ হবে।
খ) স্ত্রীর করণীয়
আপনি যদি নিশ্চিত হন যে নিকাহ সহীহভাবে সম্পন্ন হয়েছিল (সাক্ষী, মোহর, ইজাব-কবুল), তাহলে:
- শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি এখনও আপনার স্বামী।
- তিনি যদি খরচ না দেন, যোগাযোগ বন্ধ রাখেন, গালিগালাজ করেন—এগুলো স্বামীর দায়িত্বে অবহেলা ও গুনাহ।
- আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
- প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের বা স্থানীয় ইমাম/মুফতির মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করুন।
গ) যদি স্বামী তালাক দিতে অস্বীকার করে
আপনি খুলা (মোহর ফিরিয়ে দিয়ে তালাক) চাইতে পারেন। অথবা শরিয়তি আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।
৩. গালিগালাজ ও অপমানের বিধান
স্বামী বা তার পরিবার কর্তৃক স্ত্রীকে "অসুন্দর, পাগল, জানুয়ার" ইত্যাদি বলা:
- এটি হারাম ও কবিরা গুনাহ।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده" — মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১০)
- স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করা স্বামীর শরিয়তি দায়িত্ব।
মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা নিসার ১৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: "স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করা স্বামীর অবশ্য কর্তব্য।"
৪. সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার বিষয়
বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে চাইলে:
- ইসলামি শরিয়তে পিতা-মাতা ইচ্ছামতো ওয়ারিশকে বঞ্চিত করতে পারেন না। ফরজ অংশ কুরআনেই নির্ধারিত।
- তবে জীবদ্দশায় পিতা-মাতা নিজের সম্পত্তি যে কাউকে দিতে পারেন, কিন্তু মৃত্যুর পর ফরজ অংশ বাতিল করা যাবে না।
- ফাতাওয়া আলমগিরি ও রাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট: ওয়ারিশকে বঞ্চিত করার অসিয়ত নাজায়েজ।
৫. সরাসরি উত্তর: তাকে কি নিজের স্বামী মনে করা ঠিক হবে?
যদি নিকাহ সহীহভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে (সাক্ষী, মোহর, ইজাব-কবুল), তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি আপনার স্বামীই আছেন—যদিও তিনি কাগজ ছিঁড়েছেন, অস্বীকার করেছেন, গালি দিয়েছেন।
কিন্তু আপনার হৃদয়ে তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া বা না নেওয়া ভিন্ন বিষয়। শরিয়ত আপনাকে ধৈর্য ও সমঝোতার নির্দেশ দেয়, তবে নির্যাতন সহ্য করা ফরজ নয়।
আপনার করণীয়:
- নিকাহর প্রমাণ সংগ্রহ করুন (সাক্ষী, মোহর, তারিখ)।
- স্থানীয় মুফতি/ইমামের সাথে পরামর্শ করুন।
- স্বামী যদি খরচ না দেন, যোগাযোগ বন্ধ রাখেন, নির্যাতন করেন—তাহলে খুলা বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার আপনার আছে।
- অপমান ও গালিগালাজ সহ্য করবেন না; প্রয়োজনে পারিবারিক সালিশ করুন।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং ইস্তিখারা করুন।