রিজিক বৃদ্ধির আমল ও করণীয়
Faith and Belief · Hanafi
Question
Kharap takdir hole takdir Valo sovhaggo takdir Jonno ki ki Amol korbo bathroom e Allah nam chole ashe onk ibadot namaz Kotha bole feli Muk diye ata theke bachar upai ki
Answer
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে স্পর্শ করেছে:
- রিজিক বৃদ্ধির আমল
- তাকদির পরিবর্তনের আমল
- ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) থেকে মুক্তির উপায়
ইসলামে এই তিনটি বিষয়েরই সুস্পষ্ট সমাধান রয়েছে। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথম অংশ: রিজিক বৃদ্ধির আমল
১. তাকওয়া ও ইস্তিগফার
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" — সূরা আত-তালাক: ২-৩
আরও ইরশাদ হয়েছে:
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ۞ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا ۞ وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
"তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সাহায্য করবেন, তোমাদের জন্য বাগান ও নদী-নালা তৈরি করবেন।" — সূরা নূহ: ১০-১২
আমল: প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তিগফার (أَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّي مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ) পড়ুন। ফজরের পর ও রাতে ঘুমানোর আগে বিশেষভাবে পড়ুন।
২. সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْوَاقِعَةِ كُلَّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَاقَةٌ
"যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়াহ পড়বে, তার কখনো দারিদ্র্য আসবে না।" — বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ২৪৯৮; ইবনে আসাকির
আমল: প্রতিদিন মাগরিবের পর বা ঘুমানোর আগে সূরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াত করুন।
৩. সূরা মুযাম্মিলের শেষ আয়াত
وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
আমল: সূরা মুযাম্মিলের শেষ আয়াত নিয়মিত পড়া রিজিক বৃদ্ধির কারণ।
৪. দরুদ শরিফ
হাদিসে এসেছে:
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا
"যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত পাঠান।" — সহিহ মুসলিম: ৪০৮
আমল: প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার দরুদ শরিফ পাঠ করুন। বিশেষ করে জুমার দিনে বেশি পড়ুন।
৫. সকাল-সন্ধ্যার আমল
- সকালে ও সন্ধ্যায় ৩ বার: أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
- সকালে ৭ বার: حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
- সকাল-সন্ধ্যায় ১০০ বার: سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ
৬. সদকা
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ
"সদকা সম্পদ কমায় না।" — সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮
আমল: প্রতিদিন সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করুন, অল্প হলেও। বিশেষ করে ফজরের পর।
৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
"যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" — সহিহ বুখারী: ৫৯৮৬
৮. হালাল উপার্জন ও পরহেজগারি
ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়া-তে উল্লেখ আছে: হারাম উপার্জন রিজিকের বরকত নষ্ট করে। হালাল উপার্জন ও সৎ পথে ব্যবসা-বাণিজ্য রিজিক বৃদ্ধির প্রধান মাধ্যম।
দ্বিতীয় অংশ: তাকদির পরিবর্তন ও সৌভাগ্য লাভের আমল
তাকদিরের মূল ধারণা
আকিদা: তাকদির আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তবে দুআ, আমল ও সদকা দ্বারা তাকদির পরিবর্তন হয়। হাদিসে এসেছে:
لَا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ
"দুআ ছাড়া কোনো কিছু তাকদিরকে রদ করতে পারে না, এবং নেকি ছাড়া আয়ু বৃদ্ধি পায় না।" — তিরমিজি: ২১৩৯; ইবনে মাজাহ: ৯০
إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
"নিশ্চয়ই বান্দা পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।" — ইবনে মাজাহ: ৪০২২
আমলসমূহ
১. তাওবা ও ইস্তিগফার: সব পাপ থেকে খাঁটি তাওবা করুন। রাদ্দুল মুহতার (৬/১৫৪) ও ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে, তাওবা সকল বিপদ-আপদ দূর করে।
২. রাতে তাহাজ্জুদ: তাহাজ্জুদ নামাজ দুআ কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। রিজিক ও তাকদিরের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।
৩. সূরা ইয়াসিন: প্রতিদিন সকালে সূরা ইয়াসিন পড়লে দিনের সকল কাজে বরকত হয়।
৪. সূরা দুখান: রাতে সূরা দুখান পড়লে ৭০ হাজার ফেরেশতা রাতভর ইস্তিগফার করে (তিরমিজি)।
৫. দুআ: নিম্নোক্ত দুআ বেশি পড়ুন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
"হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক ও কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করি।" — ইবনে মাজাহ: ৯২৫
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
"হে আল্লাহ! তোমার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে বাঁচাও এবং তোমার অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে তোমার সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী করো।" — তিরমিজি: ৩৫৬৩
৬. ইস্তিখারা ও তাওয়াক্কুল: সব কাজে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
৭. কুরআন তিলাওয়াত: প্রতিদিন অন্তত এক পারা কুরআন পড়ুন।
৮. দান-সদকা: বিশেষ করে বিপদে পড়লে বেশি সদকা করুন।
৯. পিতা-মাতার খেদমত: পিতা-মাতার সেবা রিজিক ও তাকদিরের বরকতের বড় মাধ্যম।
১০. নামাজে পাঁচ ওয়াক্ত নিয়মিত: বাহিশতী জেওর-এ উল্লেখ আছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করা সকল সমস্যার সমাধান।
তৃতীয় অংশ: ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায়
সমস্যার স্বরূপ
আপনি বলছেন — বাথরুমে আল্লাহর নাম চলে আসে, ইবাদত-নামাজের কথা মুখ দিয়ে বলে ফেলেন। এটি ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা)। এটি একটি মানসিক রোগ যা শয়তান সৃষ্টি করে। ফতোয়ায়ে উসমানি (১/২৩৪) ও ইমদাদুল ফতোয়া-তে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
সমাধান
১. ওয়াসওয়াসা থেকে ভয় পাওয়া যাবে না
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَ النَّاسِ
"নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের মধ্যে কুমন্ত্রণা দেয়।"
শয়তান তখনই কুমন্ত্রণা দেয় যখন সে দেখে বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী হচ্ছে। এটি আসলে আপনার ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ।
২. বাথরুমে প্রবেশের দুআ পড়ুন
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
"হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে অপবিত্র জিন ও শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।" — সহিহ বুখারী: ১৪২
বাথরুমে প্রবেশের আগে এই দুআ পড়লে শয়তান দূরে থাকে।
৩. বাথরুমে নীরব থাকুন
বাথরুমে কোনো যিকির, দুআ বা কুরআন পড়া যাবে না। মুখে কিছু আসলে চুপ থাকুন, জিহ্বা বন্ধ রাখুন।
৪. ওয়াসওয়াসা আসলে "আউযুবিল্লাহ" পড়ুন
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
"যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" — সূরা আরাফ: ২০০
৫. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না
রাদ্দুল মুহতার (১/৪৬০) ও ফতোয়ায়ে উসমানি-তে উল্লেখ আছে: ওয়াসওয়াসা যত গুরুত্ব দেবেন, তত বাড়বে। এটিকে উপেক্ষা করুন, ভুলে যান। এটি আপনার ইচ্ছাকৃত কাজ নয়, তাই গুনাহ হবে না।
৬. নামাজে ওয়াসওয়াসা হলে
- আউযুবিল্লাহ পড়ুন
- বাম দিকে ৩ বার থুতু ফেলুন (হালকাভাবে)
- সিজদায় যান বা ডান হাত দিয়ে বাম উরুতে চাপ দিন
- নামাজ শেষে সিজদায়ে সাহু করুন
৭. নিয়মিত যিকির করুন
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
"জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।" — সূরা রাদ: ২৮
প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ১০০ বার সুবহানাল্লাহ, ১০০ বার আলহামদুলিল্লাহ, ১০০ বার আল্লাহু আকবার পড়ুন।
৮. ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পড়ুন
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ ও قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ — এগুলো ওয়াসওয়াসা থেকে সুরক্ষা দেয়।
৯. ডাক্তারি পরামর্শ
যদি ওয়াসওয়াসা অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তবে অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এটি মানসিক চিকিৎসার বিষয়ও হতে পারে।
১০. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" — সূরা তালাক: ৩