অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলে কী করবেন? ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়।
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি । একজন লোকের একটা মেয়ের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই ছেলে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে ।
পরে ওই মেয়ের বাকি সব আত্মীয়রা ওই ছেলেকে ধরে গায়ে বড় বড় কাটা ঢুকাতে থাকে দরজার কাছে চেপে ধরে। এগুলা অদ্ভুত জিনিসের কোনো মানে আছে কী?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত স্বপ্নটি একটি অদ্ভুত ও বিভ্রান্তিকর স্বপ্ন। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বপ্নের ব্যাপারে কয়েকটি মূলনীতি রয়েছে, যা নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. স্বপ্ন তিন প্রকার
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الرُّؤْيَا ثَلَاثَةٌ: رُؤْيَا الصَّالِحَةُ بُشْرَى مِنَ اللهِ، وَرُؤْيَا تَحْزِينٌ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ
"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) সুসংবাদমূলক সৎ স্বপ্ন — যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) দুঃস্বপ্ন — যা শয়তানের পক্ষ থেকে দুশ্চিন্তা, (৩) মনগত স্বপ্ন — যা মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনা থেকে জন্ম নেয়।"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৮৭)
২. স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা কঠিন ও অনিশ্চিত
ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.)-এর মতো মুফাসসিরে স্বপ্নগণ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতেন, কিন্তু তারা সবসময় সতর্ক থাকতেন এবং বলতেন যে স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি অনুমানমূলক বিষয় (ظني)। কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যা চূড়ান্তভাবে বলা যায় না।
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:
"স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা একটি ইজতিহাদী বিষয়; এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে দ্বীনি বিধান হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৬৪০ — দারুল মা'রিফা সংস্করণ)
৩. প্রশ্নে বর্ণিত স্বপ্নের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
আপনার স্বপ্নে যা ঘটেছে — বিয়ের কথা ছিল কিন্তু ছেলে অন্য মেয়েকে বিয়ে করল, এরপর মেয়ের আত্মীয়রা ছেলেকে ধরে গায়ে কাটা ঢুকাতে থাকে — এ ধরনের স্বপ্ন সাধারণত নিম্নলিখিত কারণগুলোর একটি হতে পারে:
| সম্ভাব্য কারণ | ব্যাখ্যা | |---|---| | শয়তানের দুঃস্বপ্ন | শয়তান মানুষকে দুশ্চিন্তা ও ভয় দেখানোর জন্য এ ধরনের স্বপ্ন দেখায়। | | নফসের চিন্তা | আপনি হয়তো সাম্প্রতিক সময়ে বিয়ে, সম্পর্ক বা পারিবারিক কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, যা স্বপ্নে প্রতিফলিত হয়েছে। | | অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা | দৈনন্দিন জীবনের কোনো ঘটনা বা আলোচনা মস্তিষ্কে রেখাপাত করে স্বপ্নে রূপ নিয়েছে। |
এ ধরনের স্বপ্নের কোনো দ্বীনি বা শরীয়তসম্মত তাৎপর্য নেই — এটিকে ভবিষ্যদ্বাণী বা কোনো নির্দিষ্ট অর্থ বহনকারী হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়।
৪. দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ দুঃস্বপ্ন দেখলে যা করতে বলেছেন:
إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلْيَتَحَوَّلْ عَنْ جَنْبِهِ الَّذِي كَانَ عَلَيْهِ
"যখন তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করে (হালকাভাবে), শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে, এবং যে পার্শ্বে শুয়ে ছিল তা পরিবর্তন করে।"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬২)
আরও করণীয়:
- আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়া
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া
- কারও কাছে স্বপ্নের কথা না বলা (বিশেষত যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানে না)
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং দুশ্চিন্তা না করা
৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না — যেমন বিয়ে, ব্যবসা, বা সম্পর্ক ছিন্ন করা।
- স্বপ্নকে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে বিশ্বাস করা বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
- স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য যাদু, জ্যোতিষী বা গণকের কাছে যাওয়া হারাম। রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে তার কথা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর নাযিলকৃত কিতাবকে অস্বীকার করল।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯০৪)
উপসংহার
আপনার দেখা স্বপ্নটি শয়তানি বা মনগত স্বপ্ন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এর কোনো শরীয়তসম্মত তাৎপর্য নেই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, দুশ্চিন্তা করবেন না। দুঃস্বপ্ন দেখলে উপরোক্ত আমলগুলো করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আপনার জীবনে যা ঘটবে তা আল্লাহর হুকুমেই ঘটবে — স্বপ্ন তার পূর্বাভাস নয়।
والله أعلم بالصواب