অতিরিক্ত সাদাস্রাব (ইস্তিহাযা) ও প্রেগন্যান্সির শেষ দিকে সিজদায় কষ্ট হলে হানাফী মাযহাবে করণীয় কী? মা'যূর হওয়ার শর্ত, ইস্তিহাযার হুকুম ও ইশারায় সিজদার বিধান স সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই?
Taharah Purity · Hanafi
Question
উস্তায আমার অতিরিক্ত সাদাস্রাব যায়,সলাতের পুরো ওয়াক্তে অনবরত যায় না কিছুসময় অফ থাকে।তবে ওযু করে মাত্র উঠেও টের পাই আবার যাবে সাথে সাথে পবিত্র হই।এরপর সলাতে দাড়ালেই ২/১ রাকাত পড়তেই আবার টের পাই, কখনো বা পাই না পরে দেখি কাপড় এ ।কখনো বা সুন্নাত সলাত শেষে যায়। তো পবিত্র হয়ে এলে ফরয সলাত আদায়কালীন আবার টের পাই।আজ এমন হয়েছে।মাঝে কয়েকদিন এমন হয়েছে যে কয়েকবার ওযু করে এসে সলাতে দাড়িয়েছি সেই কয়েকবার ই গিয়েছে।প্রেগন্যান্সির এ টাইমে আমার জন্য বিষয় টা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আমার এ সিচুয়েশনে আমি কি মাযুর হিসেবে গণ্য হবো?
২/আরেকটি প্রশ্ন উস্তায,সিজদা দিতে আমার এখন প্রেগ্ন্যাসির শেষ দিকে খুবই কষ্ট হয়।পেটে চাপ পড়ে যার দরুন কখনো শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।একটু উচু হয়ে সিজদা দিলেও এমন হয়।বেশিরভাগ সময়ই এমন হচ্ছে, মাঝেমধ্যে স্বাভাবিক সিজদা দিতে পারছি।এখন এক্ষেত্রে আমি কি পুরুষদের মত সিজদা দিতে পারব বাকি রুকন ঠিক রেখে?
Answer
উত্তর
প্রশ্ন ১: অতিরিক্ত সাদাস্রাব (ইস্তিহাযা) — মা'যূর হওয়ার বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, আপনার বর্ণিত অবস্থায় আপনি মা'যূর (معذور) হিসেবে গণ্য হবেন না। কারণ মা'যূর হওয়ার জন্য শর্ত হলো—একটি পূর্ণ নামাযের ওয়াক্ত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ফরয নামাযের ওয়াক্তের পুরো সময়ে অনবরত (এতটুকু বিরতি ছাড়া যাতে ওযু করা ও ফরয নামায আদায় করা সম্ভব হয়) সাদাস্রাব/রক্ত ইত্যাদি নির্গত হতে থাকা। আপনার ক্ষেত্রে কিছু সময় বন্ধ থাকে, এমনকি ওযু করে নামাযে দাঁড়ানোর পরও কখনো যায়, কখনো যায় না—সুতরাং আপনি মা'যূর নন; বরং ইস্তিহাযার হুকুমে আছেন।
বিস্তারিত:
মা'যূরের সংজ্ঞা (হানাফী ফিকহ):
মা'যূর বলা হয় সেই ব্যক্তিকে, যার ওযু ভঙ্গকারী কোনো কারণ (যেমন—অতিরিক্ত সাদাস্রাব, ইস্তিহাযার রক্ত, দীর্ঘস্থায়ী নাক দিয়ে পানি পড়া, বায়ু নির্গমনের রোগ ইত্যাদি) একটি পূর্ণ ফরয নামাযের ওয়াক্তের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিরত বিদ্যমান থাকে, এমনকি ওই ওয়াক্তের মধ্যে ওযু করে ফরয নামায আদায় করার মতো সময়ও বন্ধ হয় না।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার (১/৩০৫)-এ আছে: «المعذور من يكون به حدث دائم لا يمكنه حفظه وقتاً كاملاً من أوقات الصلاة، بحيث لا ينقطع مقدار ما يمكنه أن يتوضأ ويصلي» অর্থ: মা'যূর সে-ই, যার দীর্ঘস্থায়ী অপবিত্রতা একটি পূর্ণ নামাযের ওয়াক্তে এমনভাবে থাকে যে, ওযু করে নামায পড়ার সমপরিমাণ সময়ও তা বন্ধ হয় না।
আপনার অবস্থা:
- আপনার সাদাস্রাব পুরো ওয়াক্তে অনবরত যায় না; কিছু সময় বন্ধ থাকে।
- ওযু করে নামাযে দাঁড়ানোর পর কখনো যায়, কখনো যায় না; কখনো সুন্নাত শেষে যায়।
- অর্থাৎ ওযু করে ফরয নামায আদায় করার মতো সময় স্রাব বন্ধ থাকে।
সুতরাং আপনি মা'যূর নন। আপনার ক্ষেত্রে ইস্তিহাযার সাধারণ হুকুম প্রযোজ্য:
- প্রতি ফরয নামাযের জন্য আলাদা ওযু করতে হবে (ওযু করার পর যতক্ষণ স্রাব না যায়, ততক্ষণ নামায পড়া যাবে)।
- এক ওযুতে এক ফরয নামায আদায় করা যাবে; তবে ওযু ভেঙে গেলে (স্রাব নির্গত হলে) পুনরায় ওযু করতে হবে।
- নামাযের ভেতরে স্রাব নির্গত হলে: হানাফী মাযহাবে ইস্তিহাযার রক্ত/স্রাব নামাযের ভেতরে নির্গত হলে নামায ভঙ্গ হয় না, তবে ওযু ভেঙে যায়। এমতাবস্থায়—
- যদি নামাযের ভেতরে স্রাব নির্গত হয় এবং আপনি নামায চালিয়ে যান, তাহলে ওই নামায আদায় হবে না; বরং ওযু করে নামায পুনরায় পড়তে হবে।
- তবে যদি স্রাব নির্গত হওয়ার পর অবিলম্বে ওযু করে নামায পুনরায় শুরু করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ নামায সহীহ হবে।
ফাতাওয়া উসমানী (১/১৩৫)-এ মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন: ইস্তিহাযাওয়ালা মহিলার প্রতি ফরয নামাযের জন্য নতুন ওযু করা জরুরি; এক ওযুতে এক ফরয নামায।
বিশেষ নোট (প্রেগন্যান্সি):
প্রেগন্যান্সির সময় অতিরিক্ত সাদাস্রাব হওয়া স্বাভাবিক। এটি ইস্তিহাযার অন্তর্ভুক্ত। আপনি মা'যূর না হওয়ায় প্রতি ফরয নামাযের জন্য নতুন ওযু করবেন। যদি নামাযের ভেতরে স্রাব নির্গত হয়, তাহলে ওযু করে নামায পুনরায় পড়বেন। এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই; বরং আপনি অসুস্থতার কারণে বিশেষ ছাড় পাবেন ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্ন ২: প্রেগন্যান্সির শেষ দিকে সিজদায় কষ্ট হলে কী করবেন?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, আপনি পুরুষদের মতো স্বাভাবিক সিজদা দিতে অক্ষম হলে বসে ইশারায় (ইঙ্গিতে) সিজদা করতে পারবেন, তবে রুকন ঠিক রেখে। অর্থাৎ—
- দাঁড়ানো সম্ভব হলে দাঁড়িয়ে কিরাআত পড়বেন,
- রুকু স্বাভাবিকভাবে বা ইশারায়,
- সিজদা বসে মাথা নিচু করে ইশারায় আদায় করবেন।
তবে একটু উঁচু হয়ে সিজদা করা (যেমন—চেয়ার/স্টুল/বালিশের উপর সিজদা করা) হানাফী মাযহাবে জায়েয নয়; বরং ইশারায় সিজদা করাই শরীয়তসম্মত পদ্ধতি।
বিস্তারিত:
হানাফী মাযহাবে অসুস্থ ব্যক্তির নামায:
আল-হিদায়া (১/১২৩)-এ আছে: «وإن لم يقدر على السجود يسجد بإيماء ويجعل السجود أخفض من الركوع» অর্থ: যদি সিজদা করতে অক্ষম হয়, তবে ইশারায় সিজদা করবে এবং সিজদার ইশারা রুকুর চেয়ে নিচু করবে।
রাদ্দুল মুহতার (২/৯৭)-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: «المريض إذا عجز عن السجود على الأرض يومئ بالركوع والسجود، ويكون سجوده أخفض من ركوعه»
আপনার করণীয়:
- দাঁড়িয়ে কিরাআত পড়ুন (সম্ভব হলে)।
- রুকু স্বাভাবিকভাবে করুন; সম্ভব না হলে ইশারায়।
- সিজদা বসে মাথা নিচু করে ইশারায় করুন; সিজদার ইশারা রুকুর চেয়ে নিচু হবে।
- চেয়ার/টেবিল/বালিশের উপর সিজদা করা হানাফী মাযহাবে জায়েয নয়। হ্যাঁ, যদি একেবারে মাটিতে সিজদা করা কষ্টকর হয়, তবে ইশারাই করবেন।
ফাতাওয়া উসমানী (১/২৪৫)-এ উল্লেখ আছে: অসুস্থ ব্যক্তি যদি সিজদায় কষ্ট পায়, তবে ইশারায় সিজদা করবে; কোনো বস্তুর উপর সিজদা করা জায়েয নয়।
বিশেষ ছাড়া (প্রেগন্যান্সি):
প্রেগন্যান্সির শেষ দিকে সিজদায় কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। আপনি যদি স্বাভাবিক সিজদা করতে না পারেন, তবে ইশারায় সিজদা করবেন। তবে মাঝেমধ্যে স্বাভাবিক সিজদা সম্ভব হলে তা-ই করবেন; কারণ সামর্থ্য থাকলে স্বাভাবিক সিজদাই উত্তম।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. মা'যূর হবো কি? | না, কারণ স্রাব পুরো ওয়াক্তে অনবরত যায় না। ইস্তিহাযার হুকুমে প্রতি ফরযের জন্য নতুন ওযু করবেন। | | ২. সিজদায় কষ্ট হলে? | বসে ইশারায় সিজদা করবেন; চেয়ার/বালিশের উপর সিজদা জায়েয নয়। |
দুআ
আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রেগন্যান্সির এই কষ্ট দূর করুন এবং আপনার ইবাদতগুলো কবুল করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (১/১২৩, ১/৩০৫)
- রাদ্দুল মুহতার (১/৩০৫, ২/৯৭)
- ফাতাওয়া উসমানী (১/১৩৫, ১/২৪৫)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৪২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/১৪৫)
والله أعلم بالصواب