মেস কমিটির আমানতের টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা কি জায়েয? গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর সাজগোজ ও পর্দার শরীয়তসম্মত সীমা কী?
Halal and Haram · Hanafi
Question
২.পাত্রর সামনে কতটুকু সাজগোজ করে যাওয়া যাবে? তার সামনে কতটুকু পর্দা করতে হবে?
Answer
উত্তর
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রথম প্রশ্ন: মেসের টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা
আপনি যেহেতু মেস কমিটির দায়িত্বে আছেন এবং মেসের টাকা আপনার কাছে আমানত হিসেবে জমা রাখা হয়, সেহেতু এই টাকা আমানত (Amanah) হিসেবে গণ্য। আমানতের টাকা নিজের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা—যদিও পরে সমপরিমাণ টাকা ফেরত দেওয়ার নিয়ত থাকে—শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়। কারণ:
১. আমানতের খিয়ানত: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ، وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ» "যে ব্যক্তি তোমাকে আমানত রেখেছে, তার আমানত আদায় করো; আর যে তোমার সাথে খিয়ানত করেছে, তুমিও তার সাথে খিয়ানত করো না।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৬৪)
২. গাসব/অবৈধ দখলের শামিল: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন—
"আমানতদার ব্যক্তির জন্য আমানতের বস্তু নিজের কাজে ব্যবহার করা জায়েয নয়; যদি ব্যবহার করে এবং তা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সে যামিন (ক্ষতিপূরণদাতা) হবে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃ. ২৭৩, দারুল ফিকর)
৩. পরে ফেরত দিলেও গুনাহ থেকে মুক্ত নয়: কেননা ব্যবহারের মুহূর্তেই সে আমানতের সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং মালিকের অনুমতি ছাড়া তার সম্পদে হস্তক্ষেপ করেছে। হ্যাঁ, যদি মেস কমিটির সকল সদস্য বা মালিকপক্ষ স্পষ্টভাবে অনুমতি দেয় যে "প্রয়োজনে টাকা ব্যবহার করতে পারবে, পরে ফেরত দিলেই হবে"—তাহলে ভিন্ন কথা; তখন তা কারজে হাসানাহ (সুদেরহিত ঋণ) হিসেবে গণ্য হবে এবং জায়েয হবে।
সমাধান: মেসের টাকা থেকে নিজের প্রয়োজন মেটানো থেকে বিরত থাকুন। যদি কখনো প্রয়োজন হয়, তবে মেস কমিটির অনুমতি নিয়ে ঋণ হিসেবে নিন এবং নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দিন। অন্যথায় এই কাজ থেকে তাওবা করুন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: পাত্রের সামনে সাজগোজ ও পর্দা
ক. সাজগোজের সীমা
নারীর জন্য নিজের স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের সামনে সাজগোজ করে বের হওয়া বা সৌন্দর্য প্রদর্শন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন—
«وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ» "আর তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।" — (সূরা আহযাব: ৩৩)
«وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا» "তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না, তবে যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া।" — (সূরা নূর: ৩১)
ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন—
"নারীর জন্য পরপুরুষের সামনে সুগন্ধি, অলংকার, উজ্জ্বল পোশাক ইত্যাদি দ্বারা সাজগোজ করা নিষিদ্ধ; কারণ তা ফিতনার কারণ।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃ. ৩৫০)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেন—
"নারীর জন্য গায়রে মাহরামের সামনে সাজগোজ করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা বা আকর্ষণীয় পোশাক পরিধান করা জায়েয নয়।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ২, পৃ. ৩২১)
সারসংক্ষেপ: গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে সাজগোজ করে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে স্বামীর সামনে সাজগোজ করা সওয়াবের কাজ।
খ. পর্দার সীমা
গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর জন্য পুরো শরীর ঢাকা ফরজ—মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি পর্যন্ত সহ (হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও রজীহ মত অনুযায়ী)। আল্লাহ তা'আলা বলেন—
«وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ» "মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত করুক, লজ্জাস্থান হেফাজত করুক এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করুক, তবে যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া; আর তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে।" — (সূরা নূর: ৩১)
ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) «আহকামুল কুরআন»-এ বলেন—
"আয়াতের ظاهر (প্রকাশ্য) অর্থ হলো, নারীর জন্য গায়রে মাহরামের সামনে মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি ছাড়া বাকি সব ঢাকা ফরজ; আর হানাফি মাযহাবের মুফতি-মুহাক্কিকদের রজীহ মত হলো, ফিতনার যুগে মুখমণ্ডলও ঢাকা ফরজ।" — (আহকামুল কুরআন, খণ্ড: ৩, পৃ. ২৪১)
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন—
"গায়রে মাহরামের সামনে নারীর মুখমণ্ডল, হাতের কব্জি, পা—সব ঢাকা ফরজ।" — (বেহেশতী জেওর, পর্দার বিবরণ অধ্যায়)
সারসংক্ষেপ: গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর জন্য মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জিসহ সমগ্র শরীর ঢাকা ফরজ। শুধু চোখের প্রয়োজন পরিমাণ খোলা রাখা জায়েয।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | মেসের টাকা নিজের কাজে ব্যবহার করে পরে ফেরত দেওয়া | জায়েয নয় (আমানতে খিয়ানত); তবে মালিকপক্ষের অনুমতি থাকলে ঋণ হিসেবে জায়েয | | গায়রে মাহরামের সামনে সাজগোজ | নিষিদ্ধ | | গায়রে মাহরামের সামনে পর্দা | মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জিসহ সমগ্র শরীর ঢাকা ফরজ |
والله أعلم بالصواب