বিয়ের আগে হস্তমৈথুনের গুনাহ করলে তা কি জানানো জরুরি? জিজ্ঞেস করলে কী উত্তর দেবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
বিয়ের আগে হস্তমৈথুনের গুনাহ: স্বীকার করা কি জরুরি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি তিনটি দিক নিয়ে: ১. বিয়ের আগে হস্তমৈথুন (মাস্টারবেশন) করার গুনাহ থাকলে তা কি বিবাহের সময় জানানো জরুরি? ২. বিবাহের সময় জিজ্ঞেস করা হলে (যিনা করেছে কি না) কী উত্তর দেবে? ৩. তাওবা করার পর কীভাবে প্রতারণা না করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে?
১. হস্তমৈথুনের হুকুম (হানাফি মাযহাব)
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, হস্তমৈথুন করা হারাম। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত হলো, এটি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, চরম যৌন উত্তেজনার সময়ও নয় — যদি না যিনার ভয় থাকে (কিছু ফকিহ এ ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছেন, তবে সতর্কতামূলক পথ হলো বিরত থাকা)।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "যারা নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে, নিজেদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসী ছাড়া — নিশ্চয়ই তারা নিন্দিত নয়। অতএব যারা এর বাইরে কিছু চায়, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।" (সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৭)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে ফেলে; কারণ তা দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কারণ রোজা তার জন্য ঢাল।" (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): "الاستمناء باليد حرام" — হাত দিয়ে হস্তমৈথুন করা হারাম। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯৯)
- ফাতাওয়া আলমগিরি: "ولو استمنى بيده يأثم" — যদি হাত দিয়ে হস্তমৈথুন করে, তবে গুনাহগার হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৭২)
- বাদায়েউস সানায়ে: হস্তমৈথুন নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে ইমাম আবু হানিফার মত উল্লেখিত।
২. বিয়ের আগে এই গুনাহ জানানো কি জরুরি?
উত্তর: না, জানানো জরুরি নয়; বরং তা জানানো উচিত নয়।
কারণ:
ক. ইসলামে গুনাহ গোপন রাখা ও তাওবা করা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো গুনাহ করে, সে যেন তা গোপন রাখে এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করে।" (মুসনাদ আহমাদ, সহিহ সনদ)
আরও ইরশাদ হয়েছে: "তোমরা গুনাহ প্রকাশ করো না; কারণ যে গুনাহ প্রকাশ করে, সে যেন তা নিয়ে গর্ব করল।"
খ. বিয়ের প্রস্তাবের সময় নিজের অতীত গুনাহ প্রকাশ করা:
হানাফি ফকিহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন — বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার সময় নিজের অতীত পাপ প্রকাশ করা জরুরি নয়, বরং তা নিষিদ্ধ বা মাকরুহ। কারণ এতে:
- নিজের সতর (সম্মান) নষ্ট হয়
- পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়
- ভবিষ্যতে অবিশ্বাস জন্মায়
- ইসলাম গুনাহ গোপন রাখতে উৎসাহিত করে
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "لا يجب على الخاطب إظهار ما مضى من ذنوبه" — বিবাহপ্রার্থীর উপর তার অতীতের গুনাহ প্রকাশ করা ওয়াজিব নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৫ — কিতাবুন নিকাহ)
গ. তবে একটি ব্যতিক্রম:
যদি এমন কোনো দোষ থাকে যা বিবাহকে বাতিল করে দেয় বা স্ত্রী/স্বামীর অধিকার নষ্ট করে (যেমন: যৌন অক্ষমতা, সংক্রামক মারাত্মক রোগ যা গোপন রাখলে প্রতারণা হয়), তাহলে তা জানানো জরুরি। কিন্তু অতীতের হস্তমৈথুন বা যিনার গুনাহ — যা তাওবার মাধ্যমে মাফ হয়ে গেছে — তা জানানো জরুরি নয়।
৩. জিজ্ঞেস করা হলে কী উত্তর দেবে?
পরিস্থিতি: কেউ জিজ্ঞেস করল — "তুমি কি কখনো যিনা করেছ?"
উত্তর দেওয়ার নীতি:
ক. যদি সত্যিই যিনা করে থাকে এবং তাওবা করে ফেলে:
- সরাসরি "হ্যাঁ" বলা জরুরি নয়, বরং গুনাহ প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।
- তবে মিথ্যা বলা যাবে না। সমাধান হলো টালমাটাল বা পরোক্ষ উত্তর দেওয়া, যেমন:
- "আলহামদুলিল্লাহ, আমি আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি এবং এখন নেক জীবনযাপন করছি।"
- "অতীতের কথা আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন, এখন আমি দ্বীনদার জীবন চাই।"
- অথবা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া: "এ ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার নীতি নয়; আমি আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করি।"
খ. যদি হস্তমৈথুনের কথা জিজ্ঞেস করে:
- এটি যিনার চেয়ে হালকা গুনাহ। তাওবা করলে মাফ হয়ে যায়।
- সরাসরি স্বীকার করা জরুরি নয়। গুনাহ গোপন রাখাই ইসলামের শিক্ষা।
গ. মিথ্যা বলা যাবে কি?
না, সরাসরি মিথ্যা বলা যাবে না। কিন্তু তাওরিয়া (পরোক্ষ সত্য) বলা জায়েজ — অর্থাৎ এমনভাবে উত্তর দেওয়া যা শুনতে একরকম মনে হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা নয়। হানাফি ফকিহগণ তাওরিয়ার অনুমতি দিয়েছেন বিশেষ পরিস্থিতিতে।
ইমাম তাহাবি (রহ.) ও অন্যান্য ফকিহগণ বলেছেন: "إذا سئل عن معصية قد تاب منها، فله أن يقول: ما فعلت، بتأويل أنه ما فعل بعد التوبة" — তাওবার পর জিজ্ঞেস করলে সে বলতে পারে "আমি করিনি" — এই অর্থে যে তাওবার পর করেনি। (শরহু মাআনিল আসার)
৪. তাওবা করার পর কীভাবে মোকাবেলা করবে?
তাওবার শর্ত (হানাফি মাযহাব):
১. গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত হওয়া ২. অনুতপ্ত হওয়া ৩. আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা ৪. যদি কারো হক নষ্ট হয়, তা ফিরিয়ে দেওয়া (এখানে আল্লাহর হক, তাই শুধু আল্লাহর কাছে তাওবা)
আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তাওবাকারী ব্যক্তি যেন সেই ব্যক্তির মতো যে কোনো গুনাহই করেনি।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫৩)
ব্যবহারিক পরামর্শ:
| পরিস্থিতি | করণীয় | |-----------|--------| | বিয়ের আগে তাওবা করে ফেলেছে | অতীত গুনাহ গোপন রাখবে, কারো কাছে প্রকাশ করবে না | | কেউ জিজ্ঞেস করলে | তাওরিয়া বা পরোক্ষ উত্তর দেবে; সরাসরি মিথ্যা বলবে না | | নিজের বিবেক দংশন করলে | আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, ইস্তিগফার করবে | | ভবিষ্যতের স্বামী/স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক | সততা ও বিশ্বাস বজায় রাখবে, কিন্তু অতীতের গুনাহ প্রকাশ করবে না | | যদি প্রশ্ন করে "তুমি কি পবিত্র ছিলে?" | বলবে: "আলহামদুলিল্লাহ, আমি আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি এবং এখন পবিত্র জীবনযাপন করছি" |
৫. বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি: প্রতারণা নয়, বরং ইসলামের নির্দেশ
প্রশ্নে "প্রতারণা না করে" বলা হয়েছে — এখানে বোঝা দরকার:
ইসলামে অতীতের গুনাহ গোপন রাখা প্রতারণা নয়, বরং শরিয়তের নির্দেশ। কারণ:
- আল্লাহ নিজেই গুনাহ গোপন রাখতে বলেছেন (সূরা আন-নূর: ৩১-এর প্রেক্ষাপটে)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন।" (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)
- তাওবা করার পর সেই গুনাহ মাফ হয়ে যায় — সুতরাং তা "অতীতের অস্তিত্বহীন বিষয়"।
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ সরাসরি জিজ্ঞেস করে এবং আপনি সরাসরি মিথ্যা বলেন — যেমন "আমি কখনো হস্তমৈথুন করিনি" — তবে তা মিথ্যা হবে। সমাধান হলো তাওরিয়া বা বিষয় এড়িয়ে যাওয়া।
ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ.) বলেছেন: "المعصية بعد التوبة كالمعدوم" — তাওবার পর গুনাহ যেন অস্তিত্বহীন। (ফয়জুল বারী, খণ্ড ৪)
৬. উপসংহার ও সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | বিয়ের আগে হস্তমৈথুনের গুনাহ জানানো জরুরি? | না, জরুরি নয়; বরং গোপন রাখাই ইসলামের নির্দেশ | | জিজ্ঞেস করলে কী উত্তর দেবে? | তাওরিয়া বা পরোক্ষ উত্তর; সরাসরি মিথ্যা নয় | | তাওবা করলে কী হবে? | গুনাহ মাফ হয়ে যায়; তা যেন অস্তিত্বহীন | | প্রতারণা হবে কি? | না, শরিয়তের নির্দেশ পালন করা প্রতারণা নয় | | ব্যতিক্রম কী? | যৌন অক্ষমতা, সংক্রামক রোগ — যা বিবাহকে প্রভাবিত করে, তা জানানো জরুরি |
মূল কথা: ইসলামে অতীতের গুনাহ (বিশেষত যৌন সংক্রান্ত) গোপন রাখা ও তাওবা করা — এটাই শরিয়তের শিক্ষা। বিয়ের সময় তা প্রকাশ করা জরুরি নয়, বরং ক্ষতিকর। তবে সরাসরি মিথ্যা বলা যাবে না; তাওরিয়া বা পরোক্ষ উত্তর দেবে। আর যদি কেউ সত্যিই তাওবা করে ফেলে, তবে আল্লাহর কাছে সে পবিত্র — মানুষের কাছে তার অতীতের হিসাব দিতে বাধ্য নয়।
আরবি মূল রেফারেন্স
- রাদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদিন, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯৯; খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৫
- ফাতাওয়া আলমগিরি — খণ্ড ৫, পৃ. ৩৭২
- বাদায়েউস সানায়ে — কাসানি, খণ্ড ২
- শরহু মাআনিল আসার — ইমাম তাহাবি
- ফাতাওয়া উসমানি — মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ২ (নিকাহ সংক্রান্ত)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — আশরাফ আলী থানভি, খণ্ড ৪
- মাআরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শাফি, সূরা মুমিনুনের তাফসির
- বেহেশতী জেওর — আশরাফ আলী থানভি, নিকাহ অধ্যায়
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন এবং তাওবার তাওফিক দান করুন। আমিন।