অন্য কারো গাড়ির ব্যবসায় টাকা ইনভেস্ট করলে তা থেকে টাকা নেওয়া জায়েজ হবে কী?
Halal and Haram · Hanafi
Question
প্রথম পদ্ধতিতে
৫ লক্ষ টাকা দিলে তারা মহিলাকে ব্যবসায়ে লাভ কিংবা লস হউক মাসে ১০০০০ টাকা দিবেন।
এতে কী এটা সুদ হবে ?
দ্বিতীয় পদ্ধতি
মহিলা ৫ লক্ষ টাকা দিলে তাকে মাসে ৭০% লাভ দিবে । সেই গাড়ি ব্যবসা ওয়ালা ৩০% লাভ নিবে। আবার যদি লস হয় ব্যবসায়ে মহিলা এবং গাড়ি ব্যবসা ওয়ালা দুজনই ক্ষতি বহন করবে এবং বেশি লাভ হলে লাভ ৭০% এর বেশি দেওয়া হবে।
এখন এই পদ্ধতিতে কী সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে
কোন পদ্ধতিতে মহিলা টাকা ইনভেস্ট করলে তা শরীয়াহ পদ্ধতিতে জায়েজ হবে ইনশাআল্লাহ জানাবেন?
Answer
গাড়ির ব্যবসায় বিনিয়োগ: সুদ বনাম শরীয়াহসম্মত মুদারাবা/শিরকাত
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: এক ব্যক্তির গাড়ি ব্যবসা। অনেকের টাকা একত্র করে বড় গাড়ি কেনা হয়। এক মহিলা ৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করতে চান। ব্যবসায়ীরা দুইটি পদ্ধতি প্রস্তাব করেছেন:
- প্রথম পদ্ধতি: লাভ-লস যা-ই হোক, প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা দেবেন।
- দ্বিতীয় পদ্ধতি: মাসে ৭০% লাভ মহিলাকে, ৩০% গাড়ি ব্যবসায়ীকে; লস হলে উভয়ে অনুপাতে বহন করবেন; বেশি লাভ হলে ৭০%-এর বেশি দেওয়া হবে।
প্রথম পদ্ধতির বিধান: এটা সুদ (রিবা), হারাম
প্রথম পদ্ধতিতে "লাভ হোক বা লস, প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা" — এটি সুদে ফাসিদ (রিবা)। কারণ এখানে মূলধন (৫ লক্ষ) নিশ্চিত থাকল এবং তার উপর নির্দিষ্ট মাসিক আয় (১০,০০০) চুক্তিবদ্ধ হলো। ব্যবসায় লাভ হোক বা ক্ষতি হোক, বিনিয়োগকারীর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিশ্চিত করা মানে হলো নিশ্চিত মুনাফার বিনিময়ে ঋণ — যা সুস্পষ্ট সুদ।
আল-কুরআন: "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "প্রত্যেক সেই ঋণ যা মুনাফা টানে, তা সুদ।" (সুনানে বাইহাকি, হাদিস নং ১১০৩৪; কানযুল উম্মাল: ২৩৩৩৯)
ফাতাওয়া আলমগিরি: "যদি কেউ একশত দিরহাম এ শর্তে ঋণ দেয় যে, ঋণগ্রহীতা প্রতি মাসে এক দিরহাম বেশি দেবে, তবে তা সুদ।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল বাইউ, খণ্ড ৩, পৃ. ১৭০)
রাদ্দুল মুহতার: "প্রত্যেক ঋণ যা মুনাফা আনে, তা সুদ।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৬)
সিদ্ধান্ত: প্রথম পদ্ধতি সম্পূর্ণ হারাম। এতে বিনিয়োগ করা জায়েজ নয়।
দ্বিতীয় পদ্ধতির বিধান: শরীয়াহসম্মত মুদারাবা (যদি শর্ত পূরণ হয়)
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে লাভ-লস উভয় পক্ষ অনুপাতে ভাগ করবেন — এটি মুদারাবা বা শিরকাতুল ইনান-এর অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে জায়েজ। তবে কিছু শর্ত মানতে হবে:
শর্তসমূহ:
- লাভের অনুপাত নির্দিষ্ট শতাংশে চুক্তি হবে (৭০%-৩০%) — এখানে হয়েছে, তাই জায়েজ।
- লসের বণ্টন মূলধনের অনুপাতে হবে — অর্থাৎ মহিলা ৫ লক্ষ দিলে এবং ব্যবসায়ী নিজেও মূলধন দিলে, লস মূলধনের অনুপাতে হবে। যদি ব্যবসায়ী কোনো মূলধন না দেন (শুধু শ্রম দেন), তাহলে লস পুরোটাই মহিলার (মুদারাবা-র রাব্বুল মাল) উপর পড়বে; ব্যবসায়ী শুধু তার শ্রম হারাবেন। প্রশ্নে বলা হয়েছে "দুজনই ক্ষতি বহন করবে" — এটা তখনই সঠিক হবে যদি ব্যবসায়ীও মূলধনের অংশীদার হন। যদি তিনি শুধু মুদারিব (শ্রমদাতা) হন, তাহলে লসে তার আর্থিক অংশ থাকবে না।
- মূলধন নগদ/নির্দিষ্ট হতে হবে — ৫ লক্ষ টাকা নির্দিষ্ট, তাই ঠিক আছে।
- মুনাফা নিশ্চিত করা যাবে না — "বেশি লাভ হলে ৭০%-এর বেশি দেওয়া হবে" — এটা জায়েজ, কারণ লাভের পরিমাণ আল্লাহর হাতে; তবে অনুপাত নির্দিষ্ট থাকা জরুরি। যদি "৭০%-এর বেশি" বলতে অতিরিক্ত লাভের একটি অংশ বোঝায়, তবে তা চুক্তিতে স্পষ্ট করতে হবে।
- ব্যবসা হালাল হতে হবে — গাড়ি ব্যবসা হালাল হলে ঠিক আছে; সুদ, জুয়া, হারাম পণ্য ইত্যাদি না থাকতে হবে।
আল-কুরআন: "তোমরা ব্যবসায় লাভ-লস উভয়ই ভাগ করে নেবে..." (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-এর ধারণা)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তিনটি জিনিসে বরকত আছে: মুদারাবা, মুকাবারা এবং বাইউ মুজাফ..." (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২২৮৯ — তবে সনদ দুর্বল; তবে মুদারাবার বৈধতা ইজমা দ্বারা প্রমাণিত)
আল-হিদায়া: "মুদারাবা জায়েজ, কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবায়ে কেরাম তা করেছেন।" (আল-হিদায়া, কিতাবুল মুদারাবা, খণ্ড ২, পৃ. ৬২৫)
রাদ্দুল মুহতার: "মুদারাবায় লাভের অনুপাত নির্দিষ্ট থাকতে হবে; লস মূলধনের উপর হবে।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ৬৫০)
কোন পদ্ধতি জায়েজ?
| পদ্ধতি | বিধান | |---|---| | প্রথম পদ্ধতি (মাসিক ১০,০০০ নিশ্চিত) | হারাম — সুদ | | দ্বিতীয় পদ্ধতি (৭০%-৩০% লাভ-লস ভাগ) | জায়েজ — মুদারাবা, যদি শর্ত পূরণ হয় |
সিদ্ধান্ত: দ্বিতীয় পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করা শরীয়াহসম্মত — ইনশাআল্লাহ জায়েজ হবে, তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে:
- চুক্তিপত্রে স্পষ্ট লিখতে হবে: লাভ ৭০%-৩০% অনুপাতে; লস মূলধনের অনুপাতে (যদি ব্যবসায়ীও মূলধন দেন) অথবা লস পুরোটাই মহিলার (যদি ব্যবসায়ী শুধু শ্রমদাতা হন)।
- ব্যবসায়ী যদি শুধু শ্রম দেন এবং মূলধন না দেন, তাহলে লসে তার আর্থিক দায় থাকবে না — শুধু শ্রম নষ্ট হবে। প্রশ্নে "দুজনই ক্ষতি বহন করবে" বলা হয়েছে; এটা তখনই ঠিক যদি ব্যবসায়ীও মূলধনের অংশীদার হন।
- ব্যবসা হালাল হতে হবে; গাড়ি ব্যবসায় সুদ, জুয়া, হারাম পণ্য ইত্যাদি থাকা যাবে না।
- লাভের হিসাব বিশ্বস্ত ও স্বচ্ছ হতে হবে; মিথ্যা হিসাব দেওয়া যাবে না।
সারসংক্ষেপ
- প্রথম পদ্ধতি: সুদ — সম্পূর্ণ হারাম। এতে বিনিয়োগ করা যাবে না।
- দ্বিতীয় পদ্ধতি: মুদারাবা — জায়েজ, যদি লাভ-লসের অনুপাত সঠিকভাবে নির্ধারিত হয় এবং ব্যবসা হালাল হয়। তবে লসের বণ্টন মূলধনের অনুপাতে হবে; যদি ব্যবসায়ী মূলধন না দেন, তাহলে লস পুরোটাই বিনিয়োগকারীর উপর পড়বে।
পরামর্শ: দ্বিতীয় পদ্ধতিতে যাওয়া উত্তম, তবে চুক্তিপত্র লিখিতভাবে করুন এবং একজন বিশ্বস্ত আলেমের তত্ত্বাবধানে চুক্তি সম্পাদন করুন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
তথ্যসূত্র:
- আল-কুরআন: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫
- সুনানে বাইহাকি, হাদিস নং ১১০৩৪
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল বাইউ, খণ্ড ৩, পৃ. ১৭০
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৬, ৬৫০
- আল-হিদায়া, কিতাবুল মুদারাবা, খণ্ড ২, পৃ. ৬২৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২২৫ (মুদারাবা অধ্যায়)
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩০৯ (মুদারাবা ও সুদের পার্থক্য)