রিয়াদুল জান্নাহ বা মসজিদে নববীতে ঢোকার জন্য ওযু ফরজ কি না?
Taharah Purity · Hanafi
Question
আমি জানতে চাচ্ছিলাম রিয়াজুল জান্নাহ তে ঢুকতে গেলে কি ওজু রাখা ফরজ? এক বোন আসরে অজু করে নামাজ আদায় করে ইশা অবধি মসজিদে নববীতে বসে ছিলেন। অতঃপর উনার রিয়াজুল জান্নাহ তে ঢুকার পারমিট হয় ইশার পর। উনি রিয়াজুল জান্নাহ ঘুরে আরো কিছুক্ষণ চত্বরে থাকেন। তারপর হোটেলে এসে দেখেন সাদা স্রাব গেছে হালকা। এখন এই ক্ষেত্রে কি ধরে নেওয়া উচিৎ?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: রিয়াদুল জান্নাহ (মসজিদে নববীর সেই নির্দিষ্ট অংশ) বা মসজিদে নববীতে ঢোকার জন্য ওযু রাখা ফরজ নয়; বরং মসজিদে প্রবেশের জন্য পবিত্র থাকা (হাদাস থেকে মুক্ত হওয়া) শর্ত। আর নামাজ, তাওয়াফ ও কুরআন স্পর্শের জন্য ওযু ফরজ। সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত বোনের ক্ষেত্রে সাদা স্রাব (সাদা পাতলা পানি) বের হওয়ার কারণে তার ওযু ভেঙে গেছে; কিন্তু এতে সে নাপাক (হাদাসে আকবার) হয়নি, তাই গোসল ফরজ হয়নি। শুধু ওযু করে নিলেই সে পবিত্র হয়ে যাবে এবং পুনরায় মসজিদে/রিয়াদুল জান্নাহয় প্রবেশ ও নামাজ আদায় করতে পারবে। রিয়াদুল জান্নাহ ঘোরার সময় যদি তার ওযু ভেঙে থাকে, তবে সেটি গুনাহ নয়; কারণ সেখানে ভ্রমণের জন্য ওযু শর্ত নয়। তবে ভেতরে নামাজ পড়লে ওযু লাগবে।
বিস্তারিত:
১) মসজিদে প্রবেশের হুকুম:
মসজিদে প্রবেশের জন্য পবিত্র থাকা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّىٰ تَغْتَسِلُوا»
(সূরা আন-নিসা: ৪৩)
অর্থাৎ জুনুব অবস্থায় (গোসল ফরজ অবস্থায়) মসজিদে প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু শুধু ওযু ভেঙে গেলে (হাদাসে আসগার) মসজিদে বসা বা চলাচল করা নিষিদ্ধ নয়; বরং নামাজ ও কুরআন স্পর্শের জন্য ওযু লাগে।
ফুকাহায়ে কেরাম বলেন:
«وَيَحْرُمُ بِالْحَدَثِ الصَّلَاةُ وَالطَّوَافُ وَمَسُّ الْمُصْحَفِ، لَا دُخُولُ الْمَسْجِدِ وَالْبُثُوثُ فِيهِ»
(আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; রাদ্দুল মুহতার, ১/১৭২-১৭৩)
অর্থাৎ হাদাসে আসগার অবস্থায় নামাজ, তাওয়াফ ও কুরআন স্পর্শ হারাম; কিন্তু মসজিদে প্রবেশ ও অবস্থান করা হারাম নয়।
তবে মসজিদে নববীতে রিয়াদুল জান্নাহ একটি বিশেষ ফজিলতপূর্ণ স্থান; সেখানে প্রবেশের জন্য ওযু থাকা উত্তম ও আদব, কিন্তু ফরজ নয়। ফরজ হলো নামাজের জন্য ওযু।
২) সাদা স্রাবের হুকুম:
হানাফি মাযহাবে সাদা স্রাব (সাদা পাতলা পানি) যা شهوة ছাড়া বের হয়, তা হাদাসে আসগার; এতে ওযু ভেঙে যায়, গোসল ফরজ হয় না।
«وَمَا خَرَجَ مِنْ سَبِيلِ الْبَوْلِ مِنْ نَجَاسَةٍ أَوْ غَيْرِهَا فَهُوَ نَاقِضٌ لِلْوُضُوءِ»
(রাদ্দুল মুহতার, ১/১৩৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০)
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন:
«الرَّطُوبَةُ الَّتِي تَخْرُجُ مِنْ فَرْجِ الْمَرْأَةِ إِذَا كَانَتْ مِنْ غَيْرِ شَهْوَةٍ تُنْقَضُ الْوُضُوءَ»
(শরহু মাআনিল আছার, কিতাবুত তাহারাত)
সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত বোনের ওযু ভেঙে গেছে; তাকে নতুন করে ওযু করতে হবে। তবে সে নাপাক নয়, তাই গোসল ফরজ নয় এবং মসজিদে প্রবেশও নিষিদ্ধ নয়।
৩) রিয়াদুল জান্নাহ ঘোরার সময় ওযু না থাকা:
যেহেতু রিয়াদুল জান্নাহ ঘোরার জন্য ওযু শর্ত নয়, তাই ওযু ছাড়া ঘোরা বা সেখানে অবস্থান করা গুনাহ নয়। তবে সেখানে দুই রাকাত নামাজ পড়ার জন্য ওযু লাগবে।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«مَا بَيْنَ بَيْتِي وَمِنْبَرِي رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ»
(সহিহ বুখারি: ১১৯৮; সহিহ মুসলিম: ১৩৯১)
অর্থাৎ আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।
এখানে নামাজ পড়ার ফজিলত রয়েছে; কিন্তু ওযু ছাড়া সেখানে বসা বা চলাচল করা নিষিদ্ধ নয়।
৪) প্রশ্নে বর্ণিত বোনের করণীয়:
- সে যখন হোটেলে এসে দেখল সাদা স্রাব গেছে, তখন তার ওযু ভেঙে গেছে।
- তাকে নতুন করে ওযু করতে হবে; গোসল ফরজ নয়।
- রিয়াদুল জান্নাহ ঘোরার সময় যদি ওযু ভেঙে থাকে, তবে সেটি গুনাহ নয়; কারণ সেখানে ভ্রমণের জন্য ওযু শর্ত নয়।
- তবে ভবিষ্যতে সতর্কতা হিসেবে মসজিদে প্রবেশের আগে ওযু করে নেওয়া উত্তম, বিশেষত রিয়াদুল জান্নাহয় নামাজ পড়ার ইচ্ছা থাকলে।
উপসংহার:
রিয়াদুল জান্নাহ বা মসজিদে নববীতে ঢোকার জন্য ওযু রাখা ফরজ নয়; ফরজ হলো নামাজ, তাওয়াফ ও কুরআন স্পর্শের জন্য। সাদা স্রাব বের হলে ওযু ভেঙে যায়, কিন্তু গোসল ফরজ হয় না। তাই প্রশ্নে বর্ণিত বোনের শুধু ওযু করা আবশ্যক; তার রিয়াদুল জান্নাহ ঘোরা বা মসজিদে অবস্থান করা গুনাহ নয়।
তবে সাদা স্রাব বের হলে এমতাবস্থায় অযু ছাড়া নামাজ পড়া যাবেনা।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।