হায়েজ ও নেফাস শেষ হওয়ার সঠিক নিয়ম কী? ভেতরে আঙুল দিয়ে চেক করা কি জরুরি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 6507
Questioner: মদিনা আক্তার মনি
Question Asked: 07 Oct 2026, 01:55 AM
Reviewed & Published: 07 Oct 2026, 02:51 AM
Views: 39
Tokens: 7,803
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
২০১৩ থেকে আমার হায়েজ শুরু হয়।আমি তখন থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নামাজের কাজা আদায়ের নিয়ত করেছি এবং করছি। কিন্তু এখন সমস্যা হচ্ছে,, যখন থেকে নিয়মিত নামাজ পরি সেই সময়ের হায়েজের দিনগুলোর অনুপাতে ২০১৩-২০২০ এর হায়েজকালিন সময় বাদ দিয়ে কাযা নামাযের সংখ্যা বের করে আদায় করছি। আমার কোনোভাবেই মনে নাই কতদিন তখন হায়েজ থাকত। এখন ২০২১ থেকেও যে দিনগুলো হায়েজ ছিল তা নিয়ে ও মাসয়ালা ক্লিয়ার না থাকার কারনে সমস্যাটা দেখা দিয়েছে।
আমি হায়েজের রক্ত বাইরে বের হয়ে আসা যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন থেকেই যে পবিত্রতা সময় শুরু তা জানতাম না। আমি রক্ত বাইরে বের হয়ে আসা বন্ধের পর লজ্জাস্থানের ভিতরে আংগুল দিয়ে চেক করতাম স্রাব কি রঙের, যতক্ষণ পর্যন্ত সাদা স্রাব দেখা না যেত আমি ফরজ গোসল নামাজ পরতাম না। আজ জানলাম যে, লজ্জাস্থানের ভিতরে আংগুল দিয়ে চেক করার মাধ্যমে পবিত্র না বরং লজ্জা স্থান হতে বাইরে বের না হলেই পবিত্রতা।
উস্তাদ, আমি ত এতগুলো বছর এভাবেই করে আসছি,, তাহলে আমার এখন এতদিনের নামাজ গুলোর কি হবে? এমনকি আমি নেফাস শেষের ব্যাপারটা ও এভাবেই করেছি,, আমার ত স্মৃতিতে নাই কখন নেফাসের রক্ত বাইরে আসা বন্ধ হয়ছিল আর এতদিনের হায়েজের রক্ত ও কখন বাইরে আসা বন্ধ হয়েছিল।
উস্তাদ এর সমাধান কিভাবে করব এখন,, ২০১৩-২০২০ কাযা নামাযের হিসাব ত বর্তমানের হায়েজের অভ্যাসের দিন গুলোর অনুপাতেই ধরেছিলাম।

Answer

হায়েজ-নেফাস সংক্রান্ত মাসআলা ও কাযা নামাযের সমাধান

উত্তর (সংক্ষেপে):

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি:

১. হায়েজ/নেফাস শেষ হওয়ার সঠিক নিয়ম — লজ্জাস্থানের ভেতরে আঙুল দিয়ে চেক করা জরুরি নয়; বরং রক্ত/স্রাব বাইরে বের হওয়া বন্ধ হলেই পবিত্রতা শুরু হয়ে যায়। ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে দেখা শরীয়তের দৃষ্টিতে পবিত্রতা নির্ণয়ের জন্য শর্ত নয়।

২. অতীতের কাযা নামাযের হিসাব — যেহেতু আপনি ভুল পদ্ধতিতে (ভেতরে চেক করে সাদা স্রাব দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করে) গোসল ও নামায শুরু করতেন, তাই হায়েজ/নেফাসের প্রকৃত দিনসংখ্যা সঠিকভাবে জানা না থাকলে শরীয়ত আপনাকে কষ্ট দেয় না; বরং অনুমান (গুমান/আন্দাজ) করে হিসাব করে কাযা আদায় করাই আপনার উপর ওয়াজিব।


বিস্তারিত উত্তর

১. হায়েজ শেষ হওয়ার সঠিক নিয়ম

হায়েজ বা নেফাসের রক্ত যখন লজ্জাস্থানের বাইরে আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখনই হায়েজ/নেফাস শেষ হয়ে যায় এবং পবিত্রতা শুরু হয়। এরপর ফরজ গোসল করে নামায-রোযা শুরু করা ওয়াজিব।

হাদীস: উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন: "হায়েজের রক্ত আসা বন্ধ হলে গোসল করবে এবং নামায পড়বে।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৪

ভেতরে আঙুল দিয়ে চেক করা:

  • এটি পবিত্রতা নির্ণয়ের জন্য শর্ত নয়।
  • বরং এতে অপবিত্রতা ও সন্দেহ সৃষ্টি হয়, যা শরীয়ত পছন্দ করে না।
  • ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতে, বাইরে রক্ত আসা বন্ধ হলেই হায়েজ শেষ।
  • ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মতে, ভেতরে সাদা স্রাব দেখা গেলে হায়েজ শেষ। তবে ফতোয়া ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতেই।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৮-৩০০
  • ফতোয়ায়ে আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭
  • আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত
  • ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫-১৩৭
  • ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৫

সারকথা: আপনার জানা ভুল ছিল না — বাইরে রক্ত আসা বন্ধ হলেই পবিত্রতা। ভেতরে আঙুল দিয়ে চেক করা শরীয়তসম্মত পদ্ধতি নয়।


২. অতীতের কাযা নামাযের হিসাব

আপনি ২০১৩ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ভুল পদ্ধতিতে হায়েজ শেষ হওয়ার পর গোসল করতেন। অর্থাৎ, প্রকৃত হায়েজের দিনসংখ্যার চেয়ে বেশি দিন আপনি হায়েজ গণনা করেছেন (কারণ ভেতরে সাদা স্রাব দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন)। ফলে:

  • যে দিনগুলোতে প্রকৃতপক্ষে হায়েজ শেষ ছিল কিন্তু আপনি এখনো হায়েজ মনে করে নামায পড়েননি — সেগুলোর নামায কাযা হয়েছে।
  • যে দিনগুলোতে প্রকৃতপক্ষে হায়েজ ছিল — সেগুলোর নামায মাফ।

সমস্যা: আপনার স্মৃতিতে নেই কতদিন হায়েজ থাকত, কখন বন্ধ হত।

সমাধান (শরীয়তের নীতি):

قاعدة: "الضرورات تبيح المحظورات" এবং "المشقة تجلب التيسير"
(প্রয়োজন নিষিদ্ধকে বৈধ করে, কষ্ট সহজতা আনে)

আপনার করণীয়:

১. বর্তমানের হায়েজের অভ্যাস (আদত) অনুযায়ী হিসাব করুন।

  • যেমন: বর্তমানে আপনার হায়েজ সাধারণত ৭ দিন হলে, ২০১৩-২০২০ সালেও ৭ দিন ধরুন।
  • যদি ৫ দিন হয়, ৫ দিন ধরুন।

২. প্রতি মাসে ৩০ দিন ধরে হিসাব করুন:

  • মাসে ৩০ দিন — হায়েজ ৭ দিন = ২৩ দিন নামায।
  • ২০১৩ থেকে ২০২০ = ৮ বছর = ৯৬ মাস।
  • ৯৬ × ২৩ = ২২০৮ দিনের নামায (প্রতি দিন ৫ ওয়াক্ত = ১১০৪০ ওয়াক্ত)।

৩. নেফাসের ক্ষেত্রেও একই নীতি:

  • সাধারণত নেফাস ৪০ দিন পর্যন্ত। যদি আপনার অভ্যাস ৪০ দিন হয়, ৪০ দিন ধরুন।
  • যদি কম হয়, সেটাই ধরুন।
  • সন্তান জন্মের তারিখ মনে থাকলে হিসাব সহজ হবে।

৪. যেহেতু সঠিক সংখ্যা জানা নেই, তাই অনুমান করে বেশি দিক ধরুন (এহতিয়াত)।

  • যেমন: সন্দেহ হলে কম নয়, বেশি দিনের কাযা আদায় করুন।

৫. কাযা নামাযের নিয়ম:

  • প্রতিটি ফরজ নামাযের কাযা পড়ুন (সুন্নাত-নফল নয়)।
  • কাযা নামাযের নিয়ত: "আমি আল্লাহর জন্য আমার যিম্মায় থাকা সর্বপ্রথম/নির্দিষ্ট ফরজ নামাযের কাযা আদায় করছি।"
  • তারতীব (ক্রম) জরুরি: ফজর → যোহর → আসর → মাগরিব → ইশা।
  • কাযা নামায একা পড়ুন, জামাতে নয় (হানাফি মতে)।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৭২-৭৫ (কাযা নামাযের নিয়ম)
  • ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৮৯-৪৯২
  • ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮৭
  • বাহিশতী জেওর, কাযা নামায অধ্যায়

৩. নেফাসের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা

নেফাসের সর্বোচ্চ সময় ৪০ দিন। এরপর রক্ত বন্ধ না হলেও ৪০ দিন পর গোসল করে নামায শুরু করতে হবে (হানাফি মতে)।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০২
  • ফতোয়ায়ে আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮
  • ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪২

আপনার করণীয়:

  • যদি সন্তান জন্মের তারিখ মনে থাকে, তবে ৪০ দিন ধরুন (বা আপনার অভ্যাস অনুযায়ী)।
  • যদি না থাকে, ৪০ দিন ধরেই কাযা হিসাব করুন (এহতিয়াত)।

৪. ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা

১. হায়েজ/নেফাসের রক্ত বাইরে আসা বন্ধ হলেই পবিত্রতা শুরু — ভেতরে চেক করবেন না।
২. গোসল করে নামায শুরু করবেন।
৩. সন্দেহ হলে ইহতিয়াত করুন — বেশি দিনের কাযা আদায় করুন।
৪. নোট রাখুন: প্রতি মাসে হায়েজের তারিখ, দিনসংখ্যা, নেফাসের তারিখ লিখে রাখুন।
৫. কাযা নামাযের হিসাব একটি খাতায় লিখে রাখুন, যাতে ভুল না হয়।


৫. দোয়া ও তাওবা

যেহেতু ভুলবশত অনেক নামায ছুটে গেছে, তাই:

  • আল্লাহর কাছে তাওবা করুন।
  • সাধ্যমতো কাযা আদায় করুন।
  • আল্লাহ তাওফিক দিলে ধীরে ধীরে আদায় করুন, কিন্তু নিয়ত ও চেষ্টা অব্যাহত রাখুন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا"
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।"
— সূরা আত-তালাক, আয়াত ২


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | সমাধান | |------|--------| | হায়েজ শেষের নিয়ম | বাইরে রক্ত বন্ধ হলেই পবিত্রতা, ভেতরে চেক নয় | | কাযা নামাযের হিসাব | বর্তমান অভ্যাস অনুযায়ী প্রতি মাসে ৩০ দিন ধরে হিসাব | | নেফাস | ৪০ দিন (বা অভ্যাস অনুযায়ী) ধরুন | | সন্দেহ হলে | বেশি দিনের কাযা আদায় করুন (এহতিয়াত) | | ভবিষ্যতে | নোট রাখুন, ভেতরে চেক করবেন না |


মুফতি তাকি উসমানী (দাঃবাঃ) বলেন:
"যে ব্যক্তি হায়েজ-নেফাসের সঠিক দিনসংখ্যা জানে না, সে তার অভ্যাস ও অনুমানের উপর ভিত্তি করে কাযা আদায় করবে। আল্লাহ তাওবা কবুল করেন এবং সহজতা দেন।"
— ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৫


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.