সুদভিত্তিক এনজিওর শিক্ষা প্রকল্পে সুপারভাইজার পদে চাকরি করা কি হারাম?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6499
Questioner: Mehedi Hasan
Question Asked: 06 Oct 2026, 09:47 PM
Reviewed & Published: 06 Oct 2026, 10:32 PM
Views: 17
Tokens: 3,565
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোন সুদ ভিত্তিক এনজিওর কোন শিক্ষা প্রকল্পের সুপারভাইজার পদে চাকরি করা কি হারাম হবে?

Answer

সুদভিত্তিক এনজিওর শিক্ষা প্রকল্পে সুপারভাইজার পদে চাকরির হুকুম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—কোন সুদভিত্তিক (রিবাভিত্তিক) এনজিওর শিক্ষা প্রকল্পে সুপারভাইজার পদে চাকরি করা কি হারাম হবে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

সুদভিত্তিক এনজিওতে চাকরি করা মূলত জায়েয নয়; আর যদি চাকরির কাজটি সরাসরি সুদ, ঋণদান, আদায় বা তার হিসাব-নিকাশের সাথে সম্পৃক্ত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে হারাম। তবে শিক্ষা প্রকল্পের সুপারভাইজার পদে চাকরি করার হুকুম নির্ভর করে কাজের প্রকৃতির উপর—যদি তার কাজ সুদী কারবারের সাথে কোনোভাবে সহযোগিতা বা তার প্রচার-প্রসার না হয়, শুধু শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি হয়, তবে কিছু ফকীহ এটিকে জায়েয বলেছেন; তবে এনজিওর মূল আয় সুদ থেকে হলে এবং সেই অর্থ দিয়েই বেতন দেওয়া হলে সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য।


কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — সূরা আল-বাকারা: ২৭৫

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" — সূরা আল-বাকারা: ২৭৮

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "নেক কাজ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা কর, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" — সূরা আল-মায়িদা: ২

এই আয়াতের ভিত্তিতে সুদের কারবারে কোনোভাবে সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ।


হাদিসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং তার দুই সাক্ষীকে অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন—তারা সবাই সমান (গুনাহে)।" — সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৩

ইমাম তহাবী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, সুদের লেনদেনে যে কোনোভাবে অংশগ্রহণকারী—সে লেখক হোক বা সাক্ষী—সবাই সমান গুনাহগার। (শরহু মাআনিল আসার, হাদিস নং ৪৬৭৫)


হানাফি ফিকহের বিধান

১. সুদী প্রতিষ্ঠানে চাকরির মূলনীতি

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:

"সুদী কারবারে সহযোগিতা করা জায়েয নয়; কেননা তা পাপের কাজে সহযোগিতা।" — রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯১ (কিতাবুল বাইউ)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"যদি কোনো ব্যক্তি সুদী কারবারে লেখক বা হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করে, তবে তা মাকরূহ তাহরিমি।" — ফাতাওয়া আলমগিরি: ৩/২২৭

২. শিক্ষা প্রকল্পের সুপারভাইজার পদের বিশেষ বিবেচনা

ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"সুদী ব্যাংক বা সুদী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা মূলত জায়েয নয়। তবে যদি চাকরির কাজটি সরাসরি সুদী লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত না হয়—যেমন: শিক্ষা, দাওয়াহ, বা সমাজসেবামূলক প্রকল্প—এবং প্রতিষ্ঠানের মূল কারবার সুদী হলেও সেই প্রকল্পের অর্থ সুদ থেকে আলাদা হালাল উৎস থেকে আসে, তবে সেই নির্দিষ্ট পদে চাকরি করার অনুমতি আছে। কিন্তু যদি বেতন সুদী আয় থেকে দেওয়া হয়, তবে তা সন্দেহমুক্ত নয়।" — ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪৩১-৪৩২ (কিতাবুল বাইউ)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

"সুদী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা তখনই জায়েয হবে যখন চাকরির কাজ সুদী কারবারের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে এবং প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস হালাল হয়। অন্যথায় তা হারাম।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৩/২৮৭

৩. ইমাম আবু হানিফার মূলনীতি

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বিখ্যাত মূলনীতি হলো:

"যে কাজটি স্বয়ং হারাম, তা সম্পাদনে সহযোগিতা করা হারাম; আর যে কাজটি মূলত হালাল কিন্তু হারামের সাথে মিশ্রিত, তা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম।" — আল-হিদায়া: ৩/৭৮ (কিতাবুল কারাহিয়াত)


বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত

যদি নিম্নলিখিত অবস্থা হয়, তবে চাকরি হারাম:

  1. চাকরির কাজ সরাসরি সুদী ঋণদান, আদায়, হিসাব-নিকাশ বা তার প্রচারের সাথে সম্পৃক্ত।
  2. বেতন সরাসরি সুদী আয় থেকে প্রদান করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানের কোনো হালাল আয়ের উৎস নেই।
  3. চাকরির শর্ত হিসেবে সুদী কারবারে সহযোগিতা করতে বলা হয়।

যদি নিম্নলিখিত অবস্থা হয়, তবে চাকরি জায়েয হতে পারে (তবে সতর্কতা কাম্য):

  1. শিক্ষা প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ আলাদা—শুধু শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি, শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ইত্যাদি।
  2. প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা প্রকল্পের অর্থ হালাল উৎস (যেমন: যাকাত, সাদাকা, অনুদান) থেকে আসে।
  3. সুদী কারবারের সাথে কোনোভাবে সহযোগিতা করতে হয় না।

তবে উত্তম ও নিরাপদ পথ:

যেকোনো সুদী প্রতিষ্ঠানে চাকরি থেকে বিরত থাকাই তাকওয়ার দাবি। কেননা রাসূল ﷺ সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন। যদি বিকল্প হালাল চাকরির সুযোগ থাকে, তবে তা গ্রহণ করা উচিত।


করণীয়

  1. প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস যাচাই করুন—শিক্ষা প্রকল্পের অর্থ কোথা থেকে আসে?
  2. চাকরির কাজের বিবরণ ভালোভাবে বুঝুন—সুদী কারবারের সাথে কোনো সম্পর্ক আছে কি?
  3. বিকল্প খুঁজুন—হালাল উৎসের প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করুন।
  4. সন্দেহ থাকলে ইস্তিখারা করুন এবং নির্ভরযোগ্য মুফতির সাথে পরামর্শ করুন।
  5. যদি চাকরি করতে হয়, তবে নিয়ত পরিষ্কার রাখুন—শিক্ষা প্রচারই লক্ষ্য, সুদী কারবারে সহযোগিতা নয়।

উপসংহার

সুদভিত্তিক এনজিওর শিক্ষা প্রকল্পের সুপারভাইজার পদে চাকরি করা সরাসরি হারাম নয়, যদি কাজটি সুদী কারবারের সাথে সম্পৃক্ত না হয় এবং বেতন হালাল উৎস থেকে আসে। তবে সুদী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম ও তাকওয়ার পরিচায়ক। কেননা হাদিসে সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমান গুনাহগার বলা হয়েছে। যদি চাকরি করতে হয়, তবে কাজের প্রকৃতি যাচাই করে নিন এবং সুদী কারবারে কোনোভাবে সহযোগিতা করবেন না।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.