৩ দিনের কম কিংবা ১০ দিনের বেশি স্রাব গেলে তা হায়েয, কিন্ত আগেই কিভাবে বুঝবো কতদিন রক্তস্রাব হবে? এই অবস্থায় হায়েজ ধরে নামাজ বন্ধ রাখতে হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
মাসয়ালা অনুযায়ী ৩ দিনের কম কিংবা ১০ দিনের বেশি স্রাব গেলে তা নেফাস, কিন্ত আগেই কিভাবে বুঝবো কতদিন লাস্ট করবে? এই অবস্থায় হায়েজ ধরে নামাজ বন্ধ রাখবো? পরবর্তীতে হায়েজ ছিলো না বুঝা গেলে নিফাস ধরবো নাকি?
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
১. আপনার বর্তমান করণীয় (হায়েজ ধরে নামাজ বন্ধ রাখা):
- তৎক্ষণাৎ নামাজ বন্ধ রাখবেন: পিরিয়ডের (মাসিকের) নির্ধারিত বা অভ্যাসের সময়ে হঠাৎ কফি কালার, গাঢ় বাদামী, মাটি বা কাদাবর্ণের স্রাব দেখা দিলে তাকে হায়েজ (মাসিক) হিসেবে গণ্য করে তৎক্ষণাৎ নামাজ পড়া ও রোজা রাখা বন্ধ রাখতে হবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৪, ১১৫; নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭]।
- রক্তের রঙের ফিকহী বিধান: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, হায়েজের নির্ধারিত দিনে নির্গত রক্তের রঙ কেবল লাল হওয়াই জরুরী নয়; বরং লাল, কালো, কফি কালার (বাদামী), হলুদ কিংবা ময়লা রঙের পানি/স্রাব নির্গত হলেও তা হায়েজের রক্ত হিসেবেই ধর্তব্য হয় [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৪, ১১৫]।
২. পরিভাষাগত স্পষ্টীকরণ (নিফাস নয়, ইস্তিহাজা):
আপনার প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন যে, "৩ দিনের কম বা ১০ দিনের বেশি গেলে তা নেফাস।" এটি একটি পরিভাষাগত ভুল। ফিকহে হানাফীর নিয়মানুযায়ী:
- নিফাস (নেফাস): সন্তান প্রসবের পর যে রক্ত নির্গত হয়, তাকে নিফাস বলা হয় [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৪]।
- ইস্তিহাজা (ইস্তিহাযাহ): হায়েজের নির্ধারিত মেয়াদের চেয়ে কম (অর্থাৎ ৩ দিনের কম) কিংবা সর্বোচ্চ মেয়াদের চেয়ে বেশি (অর্থাৎ ১০ দিনের বেশি) রক্ত বা স্রাব নির্গত হলে তাকে ইস্তিহাজা (অসুস্থতাজনিত স্রাব) বলা হয়, নিফাস নয় [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৯৮]।
৩. কতদিন লাস্ট করবে তা আগে থেকে না জেনেও নামাজ বন্ধ রাখার নিয়ম:
স্রাবটি কতদিন স্থায়ী হবে তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয় এবং শরীআতে তা আগে থেকে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করারও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। মাসিকের নির্ধারিত সময়ে রক্তের রঙ বা কফি কালার স্রাব প্রকাশ পাওয়া মাত্রই বাহ্যিক আলামতের ভিত্তিতে হায়েজ গণ্য করে নামাজ বন্ধ রাখাই শরীআতের ফরয বিধান [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৪, ১১৫]।
৪. পরবর্তীতে হায়েজ প্রমাণিত না হলে (৩ দিনের কম হলে) করণীয়:
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী হায়েজের সর্বনিম্ন মেয়াদ হলো ৩ দিন ৩ রাত (পূর্ণ ৭২ ঘণ্টা) [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৯৮]।
- যদি ৩ দিনের কম সময়ে বন্ধ হয়ে যায়: এই কফি কালারের স্রাব যদি ৩ দিনের (৭২ ঘণ্টার) আগেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় (যেমন ১ বা ২ দিন পর বন্ধ হয়ে গেল), তবে প্রকাশ পাবে যে এটি হায়েজ ছিল না; বরং তা ছিল ইস্তিহাজা।
- করণীয়: সে ক্ষেত্রে শরীর ও কাপড় পবিত্র করে সাধারণ অযু/গোসল করে নামাজ শুরু করবেন এবং ওই ১ বা ২ দিনে হায়েজ মনে করে যেসব ওয়াক্তের নামাজ পড়া হয়নি, সে সময়ের নামাজগুলো পরবর্তীতে কাযা আদায় করে নিতে হবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৫–১১৬; নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১২৯]।
- যদি ৩ দিন বা তার বেশি স্থায়ী হয়: আর যদি এই স্রাব ৩ দিন বা তার বেশি সময় (সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত) অব্যাহত থাকে, তবে তা পূর্ণাঙ্গ হায়েজ হিসেবেই গণ্য হবে। সে ক্ষেত্রে ওই দিনগুলোতে বন্ধ রাখা নামাজগুলোর কোনো কাযা আদায় করতে হবে না [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৪, ১১৫]।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৪–১১৬: (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ৩য় অনুচ্ছেদ: হায়েয, নিফাস ও ইস্তিহায়ার আহকাম — রক্তের বিবিধ রং, হায়েজের মেয়াদের সীমা এবং ৩ দিনের কম হলে কাযা করার ফিকহী মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৪, ১১৫, ১১৬]।
২. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ৪৭: (পরিচ্ছেদ: হায়েয, নিফাস ও ইস্তিহাযার বিবরণ — ৩ দিনের কম ও ১০ দিনের বেশি স্রাব ইস্তিহাজা হওয়া এবং নিফাসের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা) [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭]।
- পৃষ্ঠা: ১২৯: (পরিচ্ছেদ: কাযা নামায আদায় করা — ইস্তিহাজা প্রমাণিত হলে তরককৃত নামাজের কাযা আদায়ের বিধান) [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১২৯]।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৯৮: (অধ্যায়: বাবুল হায়েয ওয়ানিফাস ওয়াল মু'যুর, ১ম পরিচ্ছেদ: হায়েজের সর্বনিম্ন সময়সীমা ৩ দিন হওয়া সংক্রান্ত মাসআলা) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৯৮]।
মূল রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (বুরহানুদ্দীন মারগীনানী)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), ১/২৮৩-২৯৮
- ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৪২
- ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩০২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- সহিহ বুখারি ও মুসলিম (ইস্তিহাযার হাদিস)