প্রক্সি দিয়ে ফেললে কি করণীয়
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
প্রক্সি দেওয়ার গুনাহ ও তার কাফফারা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—প্রক্সি দেওয়া কবীরা গুনাহ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, পূর্বে কেউ প্রক্সি দিয়ে থাকলে তার কাফফারা হিসেবে কী করা উচিত? আর যে কয়টি ক্লাসে প্রক্সি দেওয়া হয়েছে, পরবর্তীতে সেই ক্লাসগুলো গুনে সংশ্লিষ্ট সাবজেক্টের ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে কি মাফ হওয়ার আশা করা যায়?
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন
প্রক্সি দেওয়া বা নেওয়া—উভয়ই মিথ্যা, প্রতারণা ও আমানতদারীর খিয়ানত। ইসলামে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা এবং আমানতে খিয়ানত করা—এগুলো সবই কবীরা গুনাহ-এর অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি—যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে, আর যখন আমানত রাখা হয় তখন খিয়ানত করে।"
— সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৫৯
প্রক্সি দেওয়া মূলত তিনটি গুনাহের সমন্বয়: (১) মিথ্যা বলা (উপস্থিত না থেকেও উপস্থিত বলে দাবি করা), (২) প্রতারণা (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষককে ধোঁকা দেওয়া), (৩) আমানতদারীর খিয়ানত (শিক্ষা গ্রহণের যে দায়িত্ব ও আমানত আপনার উপর ছিল তা নষ্ট করা)।
কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে করণীয়
১. খাঁটি তাওবা ও ইস্তিগফার
প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হলো আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করা। তাওবার শর্ত চারটি:
- গুনাহটি সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া — অর্থাৎ ভবিষ্যতে আর কখনো প্রক্সি দেওয়া বা নেওয়া থেকে বিরত থাকা।
- গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া — অন্তর থেকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
- আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
- যদি কারো হক নষ্ট হয়, তবে তার হক আদায় করা বা ক্ষমা চাওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।"
— সূরা আন-নূর: ৩১
২. যাদের হক নষ্ট হয়েছে তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া বা হক আদায় করা
প্রক্সির মাধ্যমে মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে এবং শিক্ষকের সাথে মিথ্যা বলা হয়েছে। তাই:
- সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া উচিত (যদি সম্ভব হয় এবং এতে আরও বড় ক্ষতি না হয়)।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী যদি কোনো জরিমানা বা শাস্তি প্রযোজ্য হয়, তা মেনে নেওয়া।
- যদি প্রক্সির কারণে অন্য কোনো ছাত্রের ক্ষতি হয়ে থাকে (যেমন: মেধাক্রমে তার স্থান নষ্ট হওয়া), তবে তার প্রতিও ইনসাফ করা।
৩. কাজা বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ক্লাস পুনরায় করা
যে ক্লাসগুলোতে প্রক্সি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর জ্ঞান অর্জন করা আপনার দ্বীনি ও দুনিয়াবি দায়িত্ব। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা বা উপস্থিত না থাকা—এটি হুকুকুল ইবাদ-এর অন্তর্ভুক্ত, যার কাফফারা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যক ক্লাস বাদ দেওয়া নয়; বরং এর কাফফারা হলো তাওবা, ক্ষমা প্রার্থনা এবং ভবিষ্যতে সংশোধন।
মূল প্রশ্নের উত্তর: ক্লাস গুনে এটেনডেন্স না দিলে কি মাফ হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, শুধু ক্লাস গুনে এটেনডেন্স না দেওয়া কাফফারা হিসেবে যথেষ্ট নয়।
এর কারণ:
-
কাফফারা শরীয়তে নির্ধারিত ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য (যেমন: রোজার কাফফারা, ইয়ামিনের কাফফারা)। কিন্তু প্রক্সি দেওয়ার মতো গুনাহের জন্য শরীয়তে কোনো নির্দিষ্ট কাফফারা (দাস মুক্ত করা, রোজা রাখা, দান করা ইত্যাদি) নির্ধারিত নেই। বরং এর কাফফারা হলো তাওবা ও হক আদায়।
-
ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লাস বাদ দেওয়া নতুন গুনাহ। প্রক্সি দেওয়ার গুনাহের কাফফারা হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে তা নতুন আরেকটি গুনাহ হবে—এটি কাফফারা হবে না, বরং গুনাহ বৃদ্ধি হবে।
-
জ্ঞান অর্জন করা ফরজে কিফায়া বা ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োজনীয়। যে বিষয়ে প্রক্সি দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ের জ্ঞান আপনার উপর দায়িত্ব ছিল। তাই সেই জ্ঞান অর্জন করা আপনার কর্তব্য। তবে এর জন্য ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা নয়; বরং নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থেকে জ্ঞান অর্জন করা উচিত।
-
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানা — প্রতিষ্ঠানের যে নিয়ম আছে (যেমন: নির্দিষ্ট শতাংশ এটেনডেন্স), তা মানা আপনার দায়িত্ব। প্রক্সির কারণে যদি আপনার এটেনডেন্সে ঘাটতি থাকে, তবে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া (যেমন: জরিমানা, অতিরিক্ত ক্লাস, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়া মেনে নেওয়া) —এটাই ইনসাফের দাবি।
সঠিক পদ্ধতি: কাফফারা হিসেবে করণীয়
| করণীয় | বিবরণ | |--------|--------| | ১. তাওবা | খাঁটি তাওবা, ইস্তিগফার, ভবিষ্যতে প্রক্সি না দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প | | ২. হক আদায় | শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষমা চাওয়া, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে নেওয়া | | ৩. জ্ঞান অর্জন | যে বিষয়ে প্রক্সি দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা (নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থেকে) | | ৪. সদকা | সামর্থ্য থাকলে সদকা করা—এটি তাওবার পরিপূরক হিসেবে করা যেতে পারে, তবে এটি বাধ্যতামূলক কাফফারা নয় | | ৫. ভবিষ্যতে সংশোধন | আর কখনো প্রক্সি না দেওয়া, না নেওয়া, এবং অন্যদেরও নিষেধ করা |
বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ
ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লাস বাদ দেওয়া কাফফারা নয়। বরং প্রক্সি দেওয়ার গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যা করতে হবে:
- আল্লাহর কাছে তাওবা — এটাই মূল কাফফারা।
- যাদের হক নষ্ট হয়েছে তাদের হক আদায় বা ক্ষমা চাওয়া।
- ভবিষ্যতে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকা — যাতে প্রক্সির প্রয়োজন না হয় এবং জ্ঞান অর্জন হয়।
- প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি মেনে নেওয়া — যদি প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যবস্থা নেয়, তা ধৈর্যের সাথে মেনে নেওয়া।
ফতোয়ার সারসংক্ষেপ
প্রক্সি দেওয়া কবীরা গুনাহ। এর কাফফারা হিসেবে শরীয়তে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যক ক্লাস বাদ দেওয়ার বিধান নেই। বরং কাফফারা হলো:
- খাঁটি তাওবা ও ইস্তিগফার — ভবিষ্যতে প্রক্সি না দেওয়ার দৃঢ় সংকল্পসহ।
- হক আদায় — শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষমা চাওয়া, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে নেওয়া।
- জ্ঞান অর্জন — যে বিষয়ে প্রক্সি দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা (নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থেকে)।
- সদকা — সামর্থ্য থাকলে সদকা করা (ঐচ্ছিক, তবে উপকারী)।
শুধু ক্লাস গুনে এটেনডেন্স না দেওয়া কাফফারা হিসেবে যথেষ্ট নয়; বরং তা নতুন গুনাহ। প্রক্সি দেওয়ার গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা এবং সংশ্লিষ্ট হক আদায় করা।
আরবি দোয়া
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি; যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।"
— সূরা আল-আরাফ: ২৩