কাদিয়ানী কোম্পানিতে চাকরি করা কি হারাম? প্রাণ-আরএফএল-এ চাকুরিরত ব্যক্তির জন্য ইসলামী শরীয়তের বিধান কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6389
Questioner: Mehedi Hasan Ruman
Question Asked: 04 Oct 2026, 08:41 PM
Reviewed & Published: 05 Oct 2026, 04:37 AM
Views: 11
Tokens: 4,626
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

সম্প্রতি এক বক্তব্যে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সম্মানিত খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক(দা.বা) বলেন যে কাদিয়ানী কোম্পানির পন্য বর্জন করা ফরয।আমি প্রাণ আরএফএল কোম্পানিতে চাকুরিরত আছি,এক্ষেত্রে আমার চাকরি করাটাও কি হারাম হবে?যেহেতু পন্য বয়কট করতে হবে।কারন আমাদের কাজ হচ্ছে মার্কেটে পন্য উঠানো ও সর্বোচ্চ পরিমানে কোম্পানির লাভ এনে দেয়া।

Answer

কাদিয়ানী কোম্পানিতে চাকরির বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী প্রাণ-আরএফএল কোম্পানিতে চাকুরিরত। তিনি জানতে চান—কাদিয়ানী (আহমদীয়া) সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন কোম্পানির পণ্য বর্জন ফরয হলে, সেখানে চাকরি করা কি হারাম হবে? কারণ তাঁর কাজ হলো মার্কেটে পণ্য সরবরাহ করা ও কোম্পানির সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করা।


প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন কোম্পানি কি না—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণিত তথ্য প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কাদিয়ানী হওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে শুধু গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে তাকে কাদিয়ানী বলা বা তার পণ্য বর্জন করা শরীয়তসম্মত নয়। ইসলামে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া জরুরি।

তবে প্রশ্নে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃতপক্ষে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন এবং বিষয়টি প্রমাণিত।


কাদিয়ানীদের সাথে লেনদেনের মূল বিধান

কাদিয়ানী সম্প্রদায় (আহমদীয়া) ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে কাফির ও মুরতাদ।因为他们 হযরত মুহাম্মদ ﷺ-কে শেষ নবী মানে না, যা কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার পরিপন্থী:

مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ "মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী।" —(সূরা আহযাব: ৪০)

ফিকহের কিতাবসমূহে মুরতাদ ও কাফিরদের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনের বিধান বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, দারুল হারব-এর কাফিরদের সাথে ব্যবসা করা জায়েয, তবে দারুল ইসলামে বসবাসকারী মুরতাদদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা মাকরূহ তাহরীমী হিসেবে বিবেচিত।

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) উল্লেখ করেন:

"মুরতাদদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় করা মাকরূহ, কারণ তা তাদের শক্তিবৃদ্ধির কারণ হয়।" —(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বয়ু, খণ্ড ৫)


চাকরির বিধান—বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. যদি কোম্পানির মূল ব্যবসা হালাল হয়

প্রাণ-আরএফএল মূলত খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, ভোক্তাপণ্য উৎপাদন ও বিপণন করে—যা মূলত হালাল ব্যবসা। কোম্পানির মালিক কাদিয়ানী হওয়া সত্ত্বেও যদি পণ্য নিজেই হারাম না হয় এবং চাকরির কাজে সরাসরি কুফর বা শিরকের প্রচার না থাকে, তাহলে সেখানে চাকরি করা সম্পূর্ণ হারাম হবে না।

ইসলামী ফিকহের মূলনীতি (কায়েদা):

الْأَصْلُ فِي الْمُعَامَلَاتِ الْإِبَاحَةُ "মুআমালাত (লেনদেন)-এ মূলনীতি হলো বৈধতা।"

অর্থাৎ, যতক্ষণ না কোনো কাজ স্পষ্টভাবে হারাম প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ তা হালাল।

২. যদি চাকরির কাজ কুফর প্রচারে সহায়তা করে

যদি চাকরির দায়িত্বের মধ্যে কাদিয়ানী মতবাদের প্রচার, তাদের ধর্মীয় কার্যক্রমে সহায়তা, বা তাদের কুফরি আকীদা বিস্তারে সরাসরি ভূমিকা থাকে—তাহলে তা হারাম হবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহায়তা করো না।" —(সূরা মায়িদা: ২)

৩. সাধারণ বিপণন ও সরবরাহের কাজ

শুধু পণ্য মার্কেটে সরবরাহ করা, বিক্রয় বৃদ্ধি করা, বা কোম্পানির মুনাফা বাড়ানোর কাজ—যদি তা হালাল পণ্যের হয় এবং কুফরি মতবাদের প্রচার না হয়—তাহলে তা সরাসরি হারাম হবে না। তবে মাকরূহে তাহরীমী হতে পারে, কারণ এতে পরোক্ষভাবে কাদিয়ানীদের অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, যা তাদের কুফরি কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে।

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) উল্লেখ করেন:

"কাফির ও মুরতাদদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা জায়েয নেই, যদি তা তাদের দ্বীনি কার্যক্রমে সহায়তা করে। তবে সাধারণ হালাল পণ্যের লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়।" —(ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪)


ফাতাওয়া উসমানী-এর আলোকে

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ করেন:

"কোনো কাফির বা মুরতাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার বিধান নির্ভর করে কাজের প্রকৃতির উপর। যদি কাজটি হালাল হয় এবং কুফরি মতবাদের প্রচারে সহায়তা না করে, তাহলে চাকরি জায়েয। তবে যদি কাজটি সরাসরি কুফরি কার্যক্রমে সহায়তা করে, তাহলে তা নাজায়েয।" —(ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, কিতাবুল বয়ু)


সিদ্ধান্ত ও করণীয়

সারসংক্ষেপ:

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | কাদিয়ানী কোম্পানির হালাল পণ্য বর্জন | মুস্তাহাব/ইহতিয়াত হিসেবে উত্তম | | কাদিয়ানী কোম্পানিতে চাকরি (সাধারণ হালাল কাজ) | হারাম নয়, তবে মাকরূহে তাহরীমী | | কুফরি প্রচারে সরাসরি সহায়তা | হারাম | | শুধু গুজবের ভিত্তিতে বর্জন | শরীয়তসম্মত নয় |

করণীয়:

  1. প্রথমে যাচাই করুন—প্রাণ-আরএফএল প্রকৃতপক্ষে কাদিয়ানী মালিকানাধীন কি না, নির্ভরযোগ্য প্রমাণসহ।
  2. যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে সম্ভব হলে অন্য হালাল কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ খুঁজুন—এটি ইহতিয়াত ও তাকওয়ার পরিচায়ক।
  3. যদি বিকল্প না থাকে, তাহলে চাকরি চালিয়ে যাওয়া জায়েয, তবে:
    • কুফরি মতবাদের প্রচারে কোনোভাবে সহায়তা করবেন না।
    • কোম্পানির পণ্যের প্রচারে কাদিয়ানী মতবাদের প্রচার না থাকে তা নিশ্চিত করুন।
    • আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করুন।
  4. মুফতি সাহেবের বক্তব্য—যদি তিনি প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে বলে থাকেন, তাহলে তা ইহতিয়াতের দিক থেকে গ্রহণযোগ্য। তবে সাধারণ চাকরিকে সরাসরি হারাম বলা ফিকহের মূলনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ

মুফতি আব্দুল মালেক (দা.বা.) একজন বিজ্ঞ আলিম। তাঁর বক্তব্য সাধারণত ইহতিয়াত ও সতর্কতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তবে সাধারণ চাকরিকে সরাসরি হারাম বলা ফিকহের মূলনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং তা মাকরূহে তাহরীমী হিসেবে বিবেচিত হবে, যদি কুফরি প্রচারে সহায়তা না থাকে।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন এবং কুফরি ও শিরক থেকে হেফাজত করুন। আমীন।


রেফারেন্স:

  1. রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — কিতাবুল বয়ু
  2. ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফী) — খণ্ড ৪
  3. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) — খণ্ড ৩
  4. ফাতাওয়া আলমগীরী — কিতাবুল বয়ু
  5. আল-হিদায়া (বুরহানুদ্দীন মারগীনানী) — কিতাবুল বয়ু
  6. মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী) — সূরা আহযাব: ৪০
  7. বেহেশতি যেওর (আশরাফ আলী থানভী) — লেনদেন অধ্যায়

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.