অন্নপূর্ণ ভান্ডার প্রকল্পের টাকা নেওয়া ।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
অন্নপূর্ণ ভান্ডার প্রকল্পের টাকা গ্রহণ করা কি জায়েজ?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
ভারত সরকার আর্থিকভাবে অসচ্ছল মহিলাদের জন্য "অন্নপূর্ণ ভান্ডার" নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এতে ফর্ম পূরণ করে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়—যেমন: মাসিক আয় ১০,০০০ টাকার কম, আয়কর প্রদানকারী নন, ২ কক্ষবিশিষ্ট পাকাবাড়ি নেই ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো—একজন মুসলিম নারীর জন্য এই প্রকল্পের টাকা গ্রহণ করা জায়েজ হবে কি?
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. সরকারি অনুদান/সহায়তার মূল বিধান
ইসলামি শরিয়তে সরকার বা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান, ভাতা বা সহায়তা গ্রহণ করা মূলত জায়েজ, যদি তা হারাম উপায়ে অর্জিত না হয় এবং তাতে কোনো প্রতারণা বা মিথ্যা বিবৃতির আশ্রয় নিতে না হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।" — (সূরা আন-নিসা: ২৯)
২. শর্তগুলো যাচাই করা জরুরি
প্রকল্পের শর্তগুলো যদি বাস্তবিকভাবে সত্য হয়—অর্থাৎ মহিলার প্রকৃত আয় ১০,০০০ টাকার কম, তিনি আয়করদাতা নন, তার ২ কক্ষবিশিষ্ট পাকাবাড়ি নেই—তাহলে প্রকৃত তথ্য দিয়ে ফর্ম পূরণ করে টাকা গ্রহণ করা জায়েজ।
কিন্তু যদি প্রকৃত অবস্থা ভিন্ন হয় এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করা হয়, তাহলে তা হারাম। কারণ এটি প্রতারণা ও মিথ্যা বিবৃতির অন্তর্ভুক্ত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" — (সহিহ মুসলিম: ১০১)
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে প্রদত্ত অনুদান বা ভাতা গ্রহণ করা বৈধ, যদি তা হালাল উৎস থেকে হয় এবং গ্রহণকারী প্রকৃত হকদার হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৯৮)
আল্লামা কাসানি (রহ.) "বাদায়েউস সানায়ে" গ্রন্থে বলেন:
"বাইতুল মাল থেকে প্রদত্ত সাহায্য গ্রহণ করা জায়েজ, যদি গ্রহণকারী শরিয়ত নির্ধারিত হকদারদের অন্তর্ভুক্ত হয়।" — (বাদায়েউস সানায়ে: ৭/১১৭)
৪. মুফতি তাকি উসমানির মতামত
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি" গ্রন্থে বলেন:
"সরকারি অনুদান বা ভাতা গ্রহণ করা জায়েজ, তবে শর্ত হলো—তাতে মিথ্যা তথ্য প্রদান বা প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। যদি প্রকৃত তথ্য দিয়েই যোগ্যতা অর্জন করা যায়, তাহলে গ্রহণ করা বৈধ।" — (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪২৫)
সিদ্ধান্ত
যদি তাতে শিরকী কোনো কিছু না থাকে,এবং নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়, তাহলে অন্নপূর্ণ ভান্ডার প্রকল্পের টাকা গ্রহণ করা জায়েজ:
১. মহিলার প্রকৃত আয় সত্যিই ১০,০০০ টাকার কম। ২. তিনি প্রকৃতপক্ষে আয়করদাতা নন। ৩. তার প্রকৃতপক্ষে ২ কক্ষবিশিষ্ট পাকাবাড়ি নেই। ৪. ফর্মে কোনো মিথ্যা তথ্য বা অতিরঞ্জন নেই। ৫. টাকাটি হালাল কাজে ব্যয় করা হবে।
যদি প্রকৃত অবস্থা ভিন্ন হয় এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করা হয়, তাহলে তা হারাম এবং তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
মহিলার উচিত—প্রথমে নিজের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা, তারপর সত্য তথ্য দিয়ে আবেদন করা। যদি সত্য তথ্য দিয়েও যোগ্যতা অর্জন না হয়, তাহলে সেই প্রকল্পে আবেদন না করা এবং টাকা না নেওয়াই উত্তম।
তথ্যসূত্র:
- আল-কুরআন: সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯
- সহিহ মুসলিম: হাদিস ১০১
- রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৯৮
- বাদায়েউস সানায়ে: ৭/১১৭
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪২৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৩/৪২৫
- ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩৪৫