শনিবার রোজা রাখা, ক্লাসে প্রক্সি দেওয়া
Halal and Haram · Hanafi
Question
২. ক্লাসে প্রক্সি দেওয়া অর্থাৎ অনুপস্থিত কারো এটেন্ডেস দিয়ে দেওয়ার কি কোনোক্ষেত্রে পারমিশন আছে? এমন অসুস্থ যে এটেন্ডেস না আসলে পরীক্ষায় বসতে দেবে না আবার অনেক বেশি অসুস্থতার বিষয়ও টিচাররা কনসিডার করেন না এমতাবস্থায়?
Answer
শনিবার/শুক্রবার একাকী নফল রোজা এবং ক্লাসে প্রক্সি দেওয়ার বিধান
প্রশ্ন ১: শুধু শনিবার বা শুধু শুক্রবার নফল রোজা রাখা কি গুনাহ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
শুধু শনিবার বা শুধু শুক্রবার একাকী (আলাদাভাবে) নফল রোজা রাখা মাকরূহ। তবে যদি শুক্রবারের সাথে বৃহস্পতিবার বা শনিবারের সাথে রবিবার মিলিয়ে রাখা হয়, তাহলে মাকরূহ হবে না।
বিস্তারিত দলিল
হাদিস শরিফে এসেছে:
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সাঃ) বলেছেন:
«لَا تَخْتَصُّوا لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ بِقِيَامٍ مِنْ بَيْنِ اللَّيَالِي، وَلَا تَخْتَصُّوا يَوْمَ الْجُمُعَةِ بِصِيَامٍ مِنْ بَيْنِ الْأَيَّامِ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ فِي صَوْمٍ يَصُومُهُ أَحَدُكُمْ»
অর্থ: "তোমরা রাতসমূহের মধ্যে শুধু জুমার রাতকে (বিশেষভাবে) কিয়ামের জন্য নির্ধারিত করো না এবং দিনসমূহের মধ্যে শুধু জুমার দিনকে রোজার জন্য নির্ধারিত করো না; তবে যদি কারো অভ্যাসগত রোজা হয় (তাহলে ভিন্ন কথা)।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৪৪; সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৮৫
হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا تَصُومُوا يَوْمَ السَّبْتِ إِلَّا فِيمَا افْتَرَضَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ»
অর্থ: "তোমরা শনিবারের দিন রোজা রাখো না, তবে যে রোজা আল্লাহ তোমাদের উপর ফরজ করেছেন (সেটি ভিন্ন)।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪২১; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৪৪
হানাফি ফিকহের বিধান
ফাতাওয়া আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:
"وَيُكْرَهُ صَوْمُ يَوْمِ السَّبْتِ وَحْدَهُ، وَكَذَا يَوْمُ الْجُمُعَةِ وَحْدَهُ، إِلَّا أَنْ يَصُومَ مَعَهُ يَوْمًا آخَرَ"
অর্থ: "একাকী শনিবার রোজা রাখা মাকরূহ, অনুরূপভাবে একাকী শুক্রবারও; তবে সাথে অন্য দিন মিলিয়ে রাখলে মাকরূহ নয়।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ২০২
রাদ্দুল মুহতারে ইবনে আবিদীন শামি (রহঃ) বলেন:
"وَيُكْرَهُ إفْرَادُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ بِالصَّوْمِ، وَكَذَا يَوْمِ السَّبْتِ عَلَى الْمُعْتَمَدِ"
অর্থ: "শুক্রবারকে একাকী রোজার জন্য নির্ধারিত করা মাকরূহ, অনুরূপভাবে শনিবারও — এটাই মু'তামাদ (নির্ভরযোগ্য) মত।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৩৭৮
সমাধান
- শুক্রবার একাকী: মাকরূহ তাহরিমি (তবে গুনাহ নয়, তবে নবী (সাঃ)-এর নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্জনীয়)
- শনিবার একাকী: মাকরূহ (হানাফি মাযহাবে মু'তামাদ মত)
- সমাধান: বৃহস্পতিবার+শুক্রবার একসাথে, অথবা শনিবার+রবিবার একসাথে রাখলে মাকরূহ হবে না
- ব্যতিক্রম: কারো যদি অভ্যাসগত/নিয়মিত রোজা হয় (যেমন আইয়ামে বীজ বা দাউদ (আঃ)-এর রোজা), তাহলে শুক্রবার বা শনিবার পড়লে অসুবিধা নেই
প্রশ্ন ২: ক্লাসে প্রক্সি দেওয়া (অনুপস্থিত কারো এটেন্ডেস দেওয়া) কি জায়েজ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রক্সি দেওয়া বা মিথ্যা এটেন্ডেস দেওয়া জায়েজ নয়। এটি মিথ্যা সাক্ষ্য ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে হারাম। তবে অসুস্থতার কারণে পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার বিষয়টি ভিন্ন — সেটি প্রশাসনিক বিষয়, যা শিক্ষার্থীর সরাসরি দায় নয়।
বিস্তারিত দলিল
কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ»
অর্থ: "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।" — সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ১১৯
«وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ»
অর্থ: "তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা বর্ণনা করে যা বলে, তা বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম।" — সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১১৬
হাদিস শরিফে এসেছে:
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا»
অর্থ: "যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১
«إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ»
অর্থ: "নিশ্চয়ই সত্যবাদিতা সৎকর্মের দিকে পরিচালিত করে এবং সৎকর্ম জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে।" — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৯৪
হানাফি ফিকহের বিধান
ফাতাওয়া উসমানিতে মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) বলেন:
"কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার পক্ষ থেকে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বা জাল স্বাক্ষর করা সম্পূর্ণ হারাম। এটি আমানতের খিয়ানত এবং মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত।"
ইমদাদুল ফাতাওয়ায় হাকিমুল উম্মত থানভি (রহঃ) বলেন:
"মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কবিরা গুনাহ। কোনো অবস্থাতেই এর অনুমতি নেই, চাই বন্ধুর উপকারের জন্যই হোক।"
পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
প্রশ্নে উল্লিখিত পরিস্থিতি:
- অসুস্থ শিক্ষার্থী — এটেন্ডেস না থাকলে পরীক্ষায় বসতে দেবে না
- টিচাররা অসুস্থতার বিষয়টি কনসিডার করেন না
- অনেক বেশি অসুস্থতা সত্ত্বেও সমস্যা হয়
সমাধান:
- প্রক্সি দেওয়া যাবে না — এটি মিথ্যা, হারাম
- বিকল্প পথ:
- শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে সরাসরি শিক্ষক/প্রশাসনের কাছে অসুস্থতার প্রমাণ (মেডিকেল সার্টিফিকেট) জমা দেওয়া
- অভিভাবকের মাধ্যমে আবেদন করা
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী ছাড়ের আবেদন
- প্রয়োজনে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা
- যদি প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা থাকে: শিক্ষার্থী নিজে উপস্থিত থেকে বা অনুমোদিত ছুটি নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে, মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না
বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামের মূলনীতি: উপকারের জন্য মিথ্যা বলা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে, দুই মুসলিমের মধ্যে মীমাংসার জন্য এবং স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক সংশোধনের জন্য — এই তিন ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬০৫)
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রক্সি দেওয়া এই তিন ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই এটি নাজায়েজ ও হারাম।
বিকল্প ফিকহি সমাধান: যদি শিক্ষার্থী সত্যিই অসুস্থ হয় এবং পরীক্ষায় বসতে না দেওয়া হয়, তাহলে সেটি প্রশাসনের জুলুম। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীর জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায্য দাবি জানানো জায়েজ। কিন্তু প্রক্সি দেওয়া বা মিথ্যা এটেন্ডেস দেওয়া কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | শুধু শুক্রবার নফল রোজা | মাকরূহ তাহরিমি (বর্জনীয়) | | শুধু শনিবার নফল রোজা | মাকরূহ (মু'তামাদ) | | বৃহস্পতিবার+শুক্রবার | জায়েজ, মাকরূহ নয় | | শনিবার+রবিবার | জায়েজ, মাকরূহ নয় | | ক্লাসে প্রক্সি দেওয়া | হারাম (মিথ্যা ও প্রতারণা) | | অসুস্থতার কারণে এটেন্ডেস সমস্যা | প্রশাসনের কাছে প্রমাণসহ আবেদন করুন, প্রক্সি নয় |
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।