বিকাশ বা মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট হিসেবে টাকা আদান-প্রদানের ব্যবসা ইসলামে জায়েয কি না?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6341
Questioner: Umm Yahya
Question Asked: 03 Oct 2026, 10:57 PM
Reviewed & Published: 04 Oct 2026, 04:22 AM
Views: 11
Tokens: 4,309
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

اسلام عليكم ورحمة ال وبركاته

কেউ কি বিকাশের টাকা আদান প্রদানের কাজ বা ব্যবসা করতে পারবে? যেহেতু এটা এমন কোম্পানির যারা LGBTQ প্রমোট করে এবং ইসলাম বিদ্বেষী অনেক কার্যকলাপ ও করে থাকে।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
বিকাশ বা অনুরূপ মোবাইল ব্যাংকিং/এজেন্ট ব্যাংকিং-এর টাকা আদান-প্রদানের কাজ বা ব্যবসা করা নিজে থেকে নাজায়েয নয়; বরং তা মূলত একটি বৈধ উকালাহ/ওকালত (প্রতিনিধিত্ব) ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চুক্তি। তবে কোম্পানির আয়ের উৎস, কার্যক্রম এবং ইসলামবিরোধী কার্যকলাপে সহায়তা হওয়ার দিক বিবেচনা করে সতর্কতা ও পরিহার প্রয়োজন। প্রশ্নে উল্লিখিত কারণে—যদি প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে LGBTQ প্রমোশন, ইসলামবিদ্বেষী কার্যক্রম বা হারাম কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে এবং এজেন্ট হিসেবে কাজ করলে সরাসরি সেই হারাম কার্যক্রমে সহায়তা হয়—তাহলে এমন প্রতিষ্ঠানের এজেন্টশিপ/টাকা আদান-প্রদানের ব্যবসা পরিহার করাই ইহতিয়াত ও তাকওয়ার দাবি। আর যদি শুধু টাকা পাঠানো-নেওয়ার বৈধ সেবা হয় এবং হারাম কাজে সহায়তা না হয়, তাহলে মূল চুক্তি নাজায়েয নয়; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ইসলামবিরোধী ভূমিকার কারণে অন্য বিকল্প খোঁজা উত্তম।


বিস্তারিত দলিল ও আলোচনা

১. মূলনীতি: ওকালত/প্রতিনিধিত্ব ও মোবাইল ব্যাংকিং

ইসলামে অন্যের পক্ষ থেকে টাকা গ্রহণ-প্রদান, লেনদেন সম্পাদন করা ওকালত-এর অন্তর্ভুক্ত। ওকালত নিজে থেকে জায়েয, যদি তার বিষয়টি হারাম না হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

“নেক কাজ ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদা: ২)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

“গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদা: ২)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ

“মুসলিমরা তাদের শর্তাবলির উপর প্রতিষ্ঠিত।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯৪; তিরমিজি, হাদিস: ১৩৫২ — হাসান সহিহ)

অন্য হাদিসে:

كُلُّ الْمُسْلِمِينَ عَلَى شُرُوطِهِمْ إِلَّا شَرْطًا حَرَّمَ حَلَالًا أَوْ أَحَلَّ حَرَامًا

“প্রত্যেক মুসলিম তার শর্তের উপর থাকবে, তবে যে শর্ত হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৫২)

সুতরাং মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট হিসেবে টাকা পাঠানো-নেওয়া, ক্যাশ-ইন/ক্যাশ-আউট করা মূলত জায়েয ওকালত; কারণ এতে মূলত বৈধ আর্থিক সেবা প্রদান করা হয়।


২. শর্ত: হারাম কাজে সহায়তা হওয়া যাবে না

যেহেতু প্রশ্নে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি LGBTQ প্রমোশন করে এবং ইসলামবিদ্বেষী কার্যকলাপ করে, তাই দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:

  1. এজেন্টের নিজের কাজ: টাকা পাঠানো-নেওয়া, ক্যাশ-ইন/ক্যাশ-আউট—এগুলো নিজে থেকে হারাম নয়।
  2. প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রম: যদি প্রতিষ্ঠানের আয় বা কার্যক্রমের বড় অংশ হারাম, LGBTQ প্রমোশন, ইসলামবিদ্বেষ বা সুদ-জুয়া-মদ-অশ্লীলতা ইত্যাদিতে সহায়তা করে, তাহলে এমন প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টতা পরিহার করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ

“যারা জালিম, তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না; অন্যথায় তোমাদের আগুন স্পর্শ করবে।” (সূরা হুদ: ১১৩)

আরও বলেন:

وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۖ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ

“আল্লাহ তো কিতাবে তোমাদের উপর নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শোনো আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করা হচ্ছে ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন তাদের সাথে বসো না, যতক্ষণ তারা অন্য প্রসঙ্গে না যায়। নিশ্চয়ই তখন তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে।” (সূরা নিসা: ১৪০)

এ আয়াত থেকে ফকিহগণ বলেন, কুফর, ইসলামবিদ্বেষ ও গুনাহের মজলিসে সন্তুষ্টচিত্তে অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করা জায়েয নয়।


৩. হানাফি ফিকহের মূলনীতি

হানাফি ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কায়েদা:

الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ

“কাজগুলো নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

আরেক কায়েদা:

مَا أَدَّى إِلَى الْحَرَامِ فَهُوَ حَرَامٌ

“যা হারামের দিকে নিয়ে যায়, তাও হারাম।”

আর:

الدَّرْءُ الْمُفْسِدِ مُقَدَّمٌ عَلَى جَلْبِ الْمَصَالِحِ

“অকল্যাণ দূর করা কল্যাণ অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।”

ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন:

وَالْإِعَانَةُ عَلَى الْحَرَامِ حَرَامٌ

“হারাম কাজে সহায়তা করা হারাম।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১-এর আশপাশে; কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা অধ্যায়)

মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টশিপ মূলত জায়েয; তবে শর্ত হলো—লেনদেন বৈধ হবে, সুদ/জুয়া/হারাম কাজে সহায়তা হবে না, এবং প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা হারাম না হবে।
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২৩-৪২৫, মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং অধ্যায়)


৪. প্রশ্নের প্রয়োগ

প্রশ্নে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি LGBTQ প্রমোশন করে এবং ইসলামবিদ্বেষী কার্যকলাপ করে। এমতাবস্থায়:

  • যদি এজেন্টশিপের মাধ্যমে সরাসরি LGBTQ প্রমোশন, ইসলামবিদ্বেষ বা হারাম কার্যক্রমে সহায়তা হয়—তাহলে নাজায়েয।
  • যদি শুধু টাকা পাঠানো-নেওয়ার বৈধ সেবা হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রম ইসলামবিরোধী ও হারামে লিপ্ত—তাহলে পরিহার করা উত্তম ও তাকওয়ার দাবি; কারণ এতে পরোক্ষ সহযোগিতা ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার আশঙ্কা রয়েছে।
  • যদি বিকল্প কোনো হালাল মোবাইল ব্যাংকিং/ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যায়, তাহলে সেই বিকল্প গ্রহণ করা উচিত।

ইমাম গাজালি রহ. বলেন:

مَا يُعِينُ عَلَى الْحَرَامِ فَهُوَ حَرَامٌ

“যা হারামে সহায়তা করে, তা হারাম।” (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, খণ্ড ২, পৃ. ১০৭-এর আশপাশে)


৫. সতর্কতামূলক ফতোয়া

সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটি ও অন্যান্য মুফতি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রকাশ্যে কুফর, ইসলামবিদ্বেষ বা হারাম কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে তার সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক পরিহার করা উচিত; বিশেষত যখন তা দ্বীনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
(ফাতাওয়া লাজনাতিদ দাইমা, খণ্ড ১৪, পৃ. ২৯৯-৩০০; ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা, খণ্ড ৩, পৃ. ২৯১)


চূড়ান্ত ফতোয়া

  1. বিকাশ/মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টশিপ মূলত জায়েয—যদি লেনদেন বৈধ হয় এবং হারাম কাজে সহায়তা না হয়।
  2. প্রশ্নে উল্লিখিত কারণে—যেহেতু কোম্পানিটি LGBTQ প্রমোশন ও ইসলামবিদ্বেষী কার্যকলাপ করে—এমন প্রতিষ্ঠানের এজেন্টশিপ/টাকা আদান-প্রদানের ব্যবসা পরিহার করাই উত্তম ও ইহতিয়াত।
  3. যদি সরাসরি হারাম কার্যক্রমে সহায়তা হয়, তাহলে নাজায়েয।
  4. বিকল্প হালাল মোবাইল ব্যাংকিং/ব্যাংকিং সেবা থাকলে তা গ্রহণ করুন।
  5. যদি কেউ ইতিমধ্যে এই কাজ করে থাকে, তাহলে তাওবা করুন এবং অন্য হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা করুন।

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ

“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করে না।” (সূরা তালাক: ২-৩)


والله أعلم بالصواب
والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.