স্বামী বলেছে, আমি যদি বাসা থেকে বের হই তাহলে সব শেষ করেই যেনো বের হই, এখন কি আমি বাবার বাড়ী যেতে পারবো ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি বিড়াল পালি,তো আমার বিড়াল পাশের বাড়িতে চলে গেসে এজন্য আমি পাশের বাড়িতে গিয়ে বিড়াল নিয়ে আসতে আমার হাসবেন্ড এর অনুমতি চাইলে সে বলে পাশের বাড়িতে গিয়ে বিড়াল নিয়ে আসতে চাইলে আমি যেনো একেবারে সম্পর্ক শেষ করেই যেনো বের হয়ে যাই।এই কথায় আমি রেগে গিয়ে আমার হাসবেন্ড কে বলি যে তাকে বিয়ে করে আমার জীবন ধ্বংস হয়ে গেসে।সে এটা শুনে বলে যে, আমার বেশি মনে চাইলে আমি যেনো বিড়াল নিয়ে একেবারেই চলে যাই।
আমার হাসবেন্ড অল্পতেই রেগে যায়।তার কথার এদিক ওদিক হলেই বলে,অমুক না হলে চলে যাও, তমুক না পারলে চলে যাও।হুজুর আর কতো শুনব? এভাবে পান থেকে চুন খসলেই বাসা থেকে চলে যেতে বলে ভিন্ন ভিন্ন কারণেই শুধু বিড়ালের জন্য না।আর সে বিড়াল অপছন্দ করে বা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিড়াল পালতেসি তাও না।
সে সরকারি চাকরি করে দেখে আমাকে প্রতিনিয়ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আর কোনো কিছু তার মন মত না হলেই চলে যেতে বলে।
তো আজকেও বলসে দেখে আমি বলসি ঠিক আছে চলে যাবো। এবং বোরকা পড়ে ফেলি।
তখন সে বলে যে আমি যদি বাসা থেকে বের হই তাহলে সব শেষ করেই যেনো বের হই।মানে তালাক করে বের হতে বলে,এটা বার বার বলে যে আমি যদি বাসা থেকে বের হই তাহলে সব শেষ।
এরকম টাইপ কথা।
হুজুর আমি এটা শুনে বাসা থেকে বের হই নাই।এখন আমার মা বাবা আমাকে বাপেরবাড়ি যেতে বলসে আগামীকাল।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমি কি বাসা থেকে বের হতে পারবো না আগামীকাল ও?
কোনো কাজেই বের হতে পারবো না? বের হলেই কি তালাক পতিত হবে?
আমার কোনো বিষয় আপনাদের নারাজ করলে মাফ চাই।
দয়া করে উত্তর দিবেন হুজুর যে উপরে কোনো কথায় কি তালাক হবে? আর আমি বাসা থেকে বের হলে কি তালাক পতিত হবে??
Answer
উত্তর: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আপনার স্বামী রাগের মাথায় বারবার “চলে যাও”, “সব শেষ করে যাও”, “সম্পর্ক শেষ করে বের হও” ইত্যাদি কথা বলা ইসলামী আইনে তালাকের স্পষ্ট ইবারত (صريح) নয়, বরং এটি কিনায়া শব্দ (অস্পষ্ট শব্দ) হিসেবে গণ্য হয়। হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, কিনায়া শব্দের মাধ্যমে তালাক তখনই পতিত হয়, যখন তা উচ্চারণের সময় স্পষ্ট নিয়তে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা থাকে। আর আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, স্বামী শুধু রাগের মাথায় বারবার “চলে যেতে বলছে” বা “সব শেষ করতে বলছে”, কিন্তু তালাক দেওয়ার স্পষ্ট শব্দ “তালাক” বলেনি, এবং তার নিয়ত তালাক দেওয়ার ছিল না, বরং ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল। তাই এসব কথার দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়নি।
এখন প্রশ্ন হলো, আপনি যদি বাসা থেকে বের হন (যেমন বাপের বাড়ি যান) তাহলে কি তালাক পতিত হবে?
আপনার স্বামী যে বলেছে, “যদি বাসা থেকে বের হও তাহলে সব শেষ করে বের হও” – এটি একটি শর্তযুক্ত বক্তব্য। কিন্তু শর্তযুক্ত বক্তব্যে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো জরুরি:
- শর্তটি স্পষ্ট হতে হবে (যেমন: “যদি তুমি বের হও, তাহলে তালাক”)।
- শর্ত পূরণ হতে হবে (যেমন: আপনি বের হবেন)। আপনার ক্ষেত্রে স্বামী “সব শেষ” বলেছে, যা তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয় এবং তিনি তালাকের নিয়তও করেননি। তাই আপনি বের হলেও তালাক পতিত হবে না। তবে যদি স্বামী স্পষ্টভাবে বলে “যদি তুমি বের হও, তাহলে তুমি তালাক”, তাহলে বের হলেই তালাক পতিত হতো। যেহেতু তিনি এমন স্পষ্ট শর্ত দেননি, তাই আপনি বাসা থেকে বের হলেও তালাক পতিত হবে না।
তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়া জায়েয নেই, বিশেষ করে স্বামী যখন বারবার “চলে যেতে বলছে” তখন তার মানে এই নয় যে আপনি বের হতে পারবেন। বরং স্বামী অনুমতি দিলে বা কোনো জরুরি প্রয়োজনে (যেমন বাবা-মায়ের অসুস্থতা) বের হওয়া যেতে পারে। এখানে আপনার বাবা-মা আপনাকে বাসায় যেতে বলেছেন। এটি একটি জরুরি প্রয়োজন। তাই আপনি নিম্নোক্তভাবে কাজ করতে পারেন:
- স্বামীকে জানিয়ে এবং তার অনুমতি নিয়ে বাপের বাড়ি যান। যদি তিনি অনুমতি না দেন, তাহলে আপনি তাকে বুঝিয়ে বলুন যে, এটি সাময়িকভাবে বাবা-মায়ের সেবা বা প্রয়োজন। যদি তবুও অনুমতি না দেয়, তাহলে আপনি যদি স্বামীর অনুপস্থিতিতে বা তার রাগের সময় বের না হয়ে তার সামনেই বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করে বের হন, তাহলে তালাকের কোনো আশঙ্কা নেই।
সংক্ষেপে উত্তর:
- আপনার স্বামীর বলা “চলে যাও”, “সম্পর্ক শেষ করে যাও”, “সব শেষ করে বের হও” ইত্যাদি বাক্যে কোনো তালাক পতিত হয়নি।
- আপনি বাসা থেকে বের হলেও তালাক পতিত হবে না, কারণ শর্তযুক্ত তালাকের স্পষ্ট শব্দ ও নিয়ত ছিল না।
- তবে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া জায়েয নয়। উত্তম হলো স্বামীর সাথে পরামর্শ করে এবং তার রাগ কমিয়ে বাপের বাড়ি যাওয়া। যদি তিনি না মানেন, তাহলে প্রয়োজনে তাকে জানিয়ে বা তার সামনেই বের হওয়া জায়েয হবে, কিন্তু তালাকের কোনো ভয় নেই।
সতর্কবার্তা: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই ধরনের তালাকের কথা বলা ইসলামে খুবই গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত হালাল কাজ হলো তালাক।” (আবু দাউদ) আপনারা উভয়েই ধৈর্য ধরুন এবং পরস্পরের সাথে ভালো ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সালিশ করুন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (হানাফী ফিকহ): কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়তের শর্ত।
- ফাতাওয়া উসমানী: তালাকের স্পষ্ট ও অস্পষ্ট শব্দের ব্যাখ্যা।
- বেহেশতী জেওর: স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও তালাকের নিয়ম।
- মা’আরিফুল কুরআন: তালাকের গুরুত্ব ও নিষেধাজ্ঞা।
সেরা সমাধান: আপনি স্বামীকে জানিয়ে বাপের বাড়ি যান। তাকে বুঝান যে এভাবে তালাকের কথা বলা উচিত নয়। আপনার স্বামী সরকারি চাকরি করলেও ইসলামী শিক্ষা মতে স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করা ফরজ। আপনি ধৈর্য সহকারে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান এবং পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ আপনাদের সম্পর্ক মজবুত করুন ও শান্তি দান করুন। আমীন।