কলেজ প্রদত্ত খাবার খাওয়া ও কমিটির সদস্য হিসেবে অর্থ/উপহার নেওয়া জায়েজ কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
মুহতারাম মুফতি সাহেব,
আমাদের কলেজটি পুরোপুরি প্রাইভেট একটি কলেজ । সরকার থেকে কোন আর্থিক সহায়তা পায় না । এখানে, ছাত্রছাত্রীদেরকে কলেজে ভর্তি করার সময়ে সবার কাছ থেকে ইনডোর গেমস, আউটডোর গেমস আর নবীন বরণের জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হয় ।
সব ছাত্রছাত্রীকে নোটিশের মাধ্যমে এসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে বলা হলেও অনেকেই ইচ্ছায়, অনিচ্ছায়, অপারগতায় অংশগ্রহণ করে না ।
এসব অনুষ্ঠানে কলেজ কর্তৃপক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সকাল, দুপুর ও ক্ষেত্রবিশেষে বিকালের খাবারও সরবরাহ করে থাকে ।
অবশ্য, ছাত্রছাত্রীদেরকে খাবার দেওয়া হয় না ।
আর এসব অনুষ্ঠান পরিচালনায় যারা বিভিন্ন কমিটিতে থাকে তাদেরকে সম্মানী হিসেবে নগদ অর্থ অথবা বিভিন্ন সামগ্রী দেওয়া হয় ৷
আমার জানা নেই যে, এসব খাবার, অর্থ, উপহারসামগ্রী কলেজের সার্বিক ফান্ড থেকেই দেওয়া হয় - না কী নির্দিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট খাতের অর্থ থেকেই দেওয়া হয় ।
এখন, এ অবস্থায় -
১) কলেজ প্রদত্ত খাবার খাওয়া জায়েজ হবে কী না?
২) কমিটির সদস্য হিসেবে অর্থ / উপহার নেওয়া জায়েজ হবে কী না?
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায়—
১) কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত খাবার খাওয়া জায়েজ হবে, যদি তা কলেজের বৈধ (হালাল) ফান্ড থেকে সরবরাহ করা হয় এবং খাবার নিজেও হালাল হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ফি-এর টাকা যেহেতু ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট খাতের (গেমস/নবীন বরণ) জন্য নেওয়া হয়েছে, তাই সেই টাকা দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের খাবারের ব্যবস্থা করা—যারা উক্ত অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন—শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ আছে, কারণ এটি অনুষ্ঠান পরিচালনার একটি বৈধ ব্যয় (খিদমতের বিনিময়/আপ্যায়ন)। তবে ছাত্রছাত্রীদের টাকা দিয়ে শুধু শিক্ষকদের ভোজের আয়োজন করা—যদি তা ছাত্রদের স্বার্থবিরোধী হয় বা তাদের সম্মতি ছাড়া হয়—তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
২) কমিটির সদস্য হিসেবে সম্মানী (নগদ অর্থ বা উপহার) নেওয়া জায়েজ হবে, যদি তা কলেজের বৈধ ফান্ড থেকে হয় এবং কমিটির সদস্যরা প্রকৃতপক্ষে দায়িত্ব পালন করেন। এটি পারিশ্রমিক/সম্মানী হিসেবে গণ্য হবে। তবে শর্ত হলো—উক্ত অর্থ হারাম বা সুদ/ঘুষের সম্পদ থেকে না হওয়া, এবং কমিটির সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা।
বিস্তারিত আলোচনা
১) কলেজ প্রদত্ত খাবার খাওয়ার বিধান
মূলনীতি: ইসলামে খাবারের হালাল-হারাম নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর—
- (ক) খাবার নিজে হালাল কি না (শরাব, শূকরের মাংস, নাপাক ইত্যাদি নয়)।
- (খ) যে সম্পদ দিয়ে তা ক্রয়/সরবরাহ করা হয়েছে, তা হালাল উপার্জন থেকে কি না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا “হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র, তা থেকে খাও।” (সূরা বাকারা: ১৬৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ “নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট।” (সহীহ বুখারী: ৫২, সহীহ মুসলিম: ১৫৯৫)
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায়: কলেজ প্রাইভেট, সরকারি অনুদান নেই। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ইনডোর গেমস, আউটডোর গেমস ও নবীন বরণের জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হয়। এই ফি ছাত্রদের সম্মতিতে (ভর্তির শর্ত হিসেবে) নেওয়া হয়, তাই এটি বৈধ ফি। এই ফি থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের খাবারের ব্যবস্থা করা—যারা অনুষ্ঠান পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেন—শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। কারণ এটি অনুষ্ঠানের একটি বৈধ ব্যয়, এবং দায়িত্ব পালনকারীদের আপ্যায়ন করা শরীয়তসম্মত।
তবে সতর্কতা: যদি ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ফি নেওয়া হয় এই শর্তে যে তা শুধু তাদের গেমস/অনুষ্ঠানের জন্য ব্যয় হবে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা শিক্ষকদের ভোজে ব্যয় করা হয়—তাহলে এটি আমানতের খিয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) হবে। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন, আমানতসমূহ তার প্রাপ্য অধিকারীর কাছে প্রত্যর্পণ করতে।” (সূরা নিসা: ৫৮)
তাই কলেজ কর্তৃপক্ষের উচিত—ফি-এর খাত নির্ধারণ করে তা স্বচ্ছভাবে ব্যয় করা। যদি শিক্ষক-কর্মচারীদের খাবারের জন্য আলাদা বাজেট থাকে বা কলেজের সার্বিক ফান্ড থেকে তা দেওয়া হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন—
وَلَا بَأْسَ بِأَكْلِ مَا يُقَدَّمُ مِنْ طَعَامٍ إِذَا غَلَبَ عَلَى الظَّنِّ أَنَّهُ مِنْ مَالٍ حَلَالٍ “হালাল সম্পদ থেকে দেওয়া খাবার খাওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই, যখন প্রবল ধারণা হয় যে তা হালাল সম্পদ থেকে।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪১—মূলভাব)
উপসংহার (১): কলেজ প্রদত্ত খাবার খাওয়া জায়েজ, যদি—
- খাবার নিজে হালাল হয়,
- তা কলেজের বৈধ ফান্ড থেকে সরবরাহ হয়,
- ছাত্রদের ফি-এর খাত নির্ধারিত থাকে এবং স্বচ্ছভাবে ব্যয় হয়।
যদি সন্দেহ থাকে যে ফি-এর টাকা ছাত্রদের অনুমতি ছাড়া অন্য খাতে ব্যয় করা হচ্ছে, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।
২) কমিটির সদস্য হিসেবে অর্থ/উপহার নেওয়ার বিধান
মূলনীতি: ইসলামে পারিশ্রমিক (উজরত/সম্মানী) নেওয়া জায়েজ, যদি—
- কাজটি বৈধ হয়,
- পারিশ্রমিক বৈধ সম্পদ থেকে হয়,
- কাজের বিনিময় হিসেবে হয়।
আল্লাহ বলেন:
فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ “যদি তারা তোমাদের সন্তানকে দুধ পান করায়, তবে তাদের পারিশ্রমিক দাও।” (সূরা তালাক: ৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَلْيُعْلِمْهُ أَجْرَهُ “যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে, সে যেন তার পারিশ্রমিক জানিয়ে দেয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮৩—হাসান)
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায়: কমিটির সদস্যরা অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তাদেরকে সম্মানী হিসেবে নগদ অর্থ বা উপহার দেওয়া হয়। এটি পারিশ্রমিক হিসেবে গণ্য, যা জায়েজ। তবে শর্ত—
- অর্থ/উপহার কলেজের বৈধ ফান্ড থেকে হতে হবে,
- কমিটির সদস্যরা প্রকৃতপক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন,
- ঘুষ বা সুদ হিসেবে না হওয়া।