শিশুর প্রসাব ঘরের মেঝেতে লাগলে কীভাবে পবিত্র করা হবে? শুধু ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে কি পবিত্র হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
শিশুর প্রসাব ঘরের মেঝেতে লাগলে সেই স্থান পবিত্র করার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
শিশুর প্রসাব ঘরের মেঝেতে লাগলে পানি ঢেলে ধোয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে প্রথমে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে, পরে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে সেই জায়গায় সালাত আদায় করা যাবে কি?
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, শুধু ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে মেঝে পবিত্র হবে না। পবিত্র করতে হলে ধোয়া (গাসল) আবশ্যক। তবে মেঝে যেহেতু পানি ঢেলে ধোয়া সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে ভেজা কাপড় বা স্পঞ্জ দিয়ে এতবার মুছতে হবে যাতে নাপাকি দূর হয়ে যায় এবং পানি নিংড়ে ফেলা হয়—এভাবে তিনবার বা প্রয়োজন অনুযায়ী মুছলে পবিত্র হয়ে যাবে।
বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা
১. নাপাকি দূর করার মূলনীতি
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—নাপাকি দূর করতে হবে ইযালাতুল নাজাসাহ (নাপাকি সম্পূর্ণ অপসারণ) দ্বারা। মেঝে বা এমন কোনো বস্তু যা ধোয়া সম্ভব নয়, সেখানে নাপাকি দূর করার পদ্ধতি হলো:
وَالْأَصْلُ فِي تَطْهِيرِ النَّجَاسَةِ إِزَالَتُهَا، وَإِنَّمَا يَتَحَقَّقُ ذَلِكَ بِالْغَسْلِ فِيمَا يَقْبَلُ الْغَسْلَ
"নাপাকি পবিত্র করার মূলনীতি হলো তা দূর করা; আর তা ধোয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয় সেই সব বস্তুতে যা ধোয়া গ্রহণ করে।"
— আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাহ
২. মেঝেতে নাপাকি লাগলে করণীয়
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, মেঝে বা জমিনে নাপাকি লাগলে:
- যদি নাপাকি দৃশ্যমান ও ঘন হয় (যেমন পায়খানা), তবে তা প্রথমে উঠিয়ে ফেলতে হবে।
- এরপর পানি ঢেলে ধুতে হবে যতক্ষণ না নাপাকির চিহ্ন (রং, গন্ধ, স্বাদ) দূর হয়।
- যদি মেঝে পানি শোষণ না করে (যেমন টাইলস, পাকা মেঝে), তবে পানি ঢেলে মুছে ফেললেই পবিত্র হয়ে যায়।
- যদি মেঝে পানি শোষণ করে (যেমন মাটি, কার্পেট), তবে ভেজা কাপড়/স্পঞ্জ দিয়ে মুছে নিংড়ে ফেলতে হবে—এভাবে অন্তত তিনবার, অথবা যতবারে নাপাকির চিহ্ন দূর হয়।
وَلَوْ أَصَابَتِ الْأَرْضَ نَجَاسَةٌ فَإِنْ كَانَتْ رَطْبَةً فَطَهَارَتُهَا أَنْ تُجَفَّفَ حَتَّى تَذْهَبَ النَّجَاسَةُ، وَإِنْ كَانَتْ يَابِسَةً فَطَهَارَتُهَا أَنْ تُبَلَّ وَتُجَفَّفَ
"যদি জমিনে নাপাকি লাগে—যদি তা ভেজা হয়, তবে পবিত্র করার পদ্ধতি হলো শুকানো পর্যন্ত যাতে নাপাকি দূর হয়; আর যদি শুকনো হয়, তবে তা ভিজিয়ে শুকাতে হবে।"
— রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃ. ৩১৭
৩. শুধু মুছে ফেলা যথেষ্ট নয়
শুধু শুকনো বা ভেজা কাপড় দিয়ে একবার মুছে ফেললে নাপাকি সম্পূর্ণ দূর হয় না, কারণ কাপড়ে নাপাকির অংশ লেগে থাকে এবং মেঝেতে কিছু অংশ থেকে যায়। তাই:
- ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে নিংড়ে ফেলতে হবে—এভাবে বারবার, যতক্ষণ না নাপাকির চিহ্ন দূর হয়।
- সাধারণত তিনবার মুছলে পবিত্র হয়ে যায়, তবে নাপাকির পরিমাণ ও ধরন অনুযায়ী কম-বেশি হতে পারে।
- শুকনো কাপড় দিয়ে শেষে মুছে ফেলা ভালো, তবে এটি পবিত্রতার শর্ত নয়—মূল শর্ত হলো নাপাকির চিহ্ন দূর হওয়া।
وَالْمَاءُ الْمُسْتَعْمَلُ فِي إِزَالَةِ النَّجَاسَةِ... وَالْمَعْنَى أَنَّهُ لَا بُدَّ مِنْ إِزَالَةِ عَيْنِ النَّجَاسَةِ
"নাপাকি দূর করার জন্য ব্যবহৃত পানির ব্যাপারে... অর্থ হলো নাপাকির বস্তুগত অংশ দূর করা আবশ্যক।"
— ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৪২
৪. শিশুর প্রসাবের বিধান
শিশুর প্রসাব (বিশেষত ছেলে শিশুর) সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে:
عَنْ أَبِي السَّمْحِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنْتُ أَخْدُمُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأُتِيَ بِحَسَنٍ أَوْ حُسَيْنٍ فَبَالَ عَلَى صَدْرِهِ، فَأَرَادُوا غَسْلَهُ، فَقَالَ: «بُولُ الْغُلَامِ يُرَشُّ رَشًّا، وَبُولُ الْجَارِيَةِ يُغْسَلُ غَسْلًا»
"আবু সামহ (রহ.) থেকে বর্ণিত: আমি নবী (সা.)-এর খিদমতে ছিলাম। হাসান বা হুসাইন (রা.)-কে আনা হলে তিনি তাঁর বুকের উপর প্রসাব করলেন। তারা তা ধুতে চাইলে তিনি বললেন: 'ছেলে শিশুর প্রসাবের উপর পানি ছিটিয়ে দাও, আর মেয়ে শিশুর প্রসাব ধুয়ে ফেলো।'"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৭৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৬১০
তবে এই হাদিসটি কাপড়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, মেঝের ক্ষেত্রে নয়। মেঝেতে নাপাকি লাগলে তা দূর করতে হবে ইযালাতুল নাজাসাহ-এর নিয়মে।
৫. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"যদি মেঝে এমন হয় যে পানি ঢেলে ধোয়া সম্ভব নয়, তবে ভেজা কাপড় বা স্পঞ্জ দিয়ে মুছে নিংড়ে ফেলতে হবে। এভাবে তিনবার মুছলে পবিত্র হয়ে যাবে। শুধু শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে পবিত্র হবে না, কারণ নাপাকির অংশ মেঝেতে থেকে যায়।"
— ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫ (তাহারাত অধ্যায়)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে বলেন:
"কার্পেট বা মেঝেতে নাপাকি লাগলে যদি ধোয়া সম্ভব না হয়, তবে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে নিংড়ে ফেলতে হবে। যতবারে নাপাকির চিহ্ন দূর হবে, ততবার। এরপর সেই স্থানে নামাজ পড়া জায়েজ হবে।"
— ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৭
সিদ্ধান্ত
| বিষয় | বিধান | |------|------| | শুধু ভেজা কাপড় দিয়ে একবার মুছে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা | যথেষ্ট নয় | | ভেজা কাপড়/স্পঞ্জ দিয়ে মুছে নিংড়ে ফেলা (৩ বার বা চিহ্ন দূর হওয়া পর্যন্ত) | পবিত্র হয়ে যাবে | | পানি ঢেলে ধোয়া সম্ভব হলে | তা-ই উত্তম | | পবিত্র হওয়ার পর সেই স্থানে সালাত | জায়েজ |
সারকথা: আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে (শুধু ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা) মেঝে পবিত্র হবে না। পবিত্র করতে হলে ভেজা কাপড় বা স্পঞ্জ দিয়ে মুছে নিংড়ে ফেলতে হবে—এভাবে অন্তত তিনবার, অথবা যতবারে নাপাকির চিহ্ন (রং/গন্ধ) দূর হয়। এরপর সেই স্থানে সালাত আদায় করা যাবে।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।