হারাম সম্পর্ক ও অন্যায়ের প্রতিশোধ সম্পর্কে ইসলামের বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: হারাম সম্পর্ক ও অন্যায়ের প্রতিশোধ সম্পর্কে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: প্রশ্নকারী বলছেন—একসময় তাঁর সঙ্গে একজনের হারাম সম্পর্ক ছিল। সেই ব্যক্তি তাঁর কারণে অনেক কষ্ট পেয়েছিল, তাঁর জন্য অনেক কিছু করেছিল। পরে যখন প্রশ্নকারী তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন, তখন সে খারাপ ব্যবহার করেছে, কটু কথা বলেছে, অতীত নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছে, বিরক্তির কথা বলেছে, এমনকি বলেছে—"তোমার ভালোবাসা-কষ্ট আমার উপর কোনো প্রভাব ফেলে না।" প্রশ্নকারী চান, আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে তাঁর কৃতকর্মের প্রতিফল দিন এবং প্রশ্নকারীর কষ্টের প্রতিশোধ দিন। তিনি জানতে চান—আল্লাহ কি সেই ছেলেটির কাছে থেকে প্রতিশোধ নেবেন?
১. প্রথমেই একটি জরুরি বিষয়: হারাম সম্পর্ক
ইসলামে বিবাহবন্ধন ছাড়া নারী-পুরুষের প্রেম, প্রণয়, গোপন সম্পর্ক, একাকী মেলামেশা—সবই হারাম। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" — (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে মিলিত হবে না, তবে তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।" — (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫)
হুকুম: যে সম্পর্কটি হারাম ছিল, সেটি নিজেই একটি গুনাহ। তাই প্রথম করণীয় হলো—তাওবা। আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করুন, সেই সম্পর্ক সম্পূর্ণ ত্যাগ করুন, এবং ভবিষ্যতে এমন সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকুন। আল্লাহ বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — (সূরা আন-নূর: ৩১)
২. অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার কার?
ইসলামে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশোধ নেওয়া নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ "ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না; মন্দের জবাব দাও যা সর্বোত্তম।" — (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ "এবং যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।" — (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
তবে আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া জায়েজ। মাজলুমের দুআ আল্লাহর কাছে কবুল হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ "মাজলুমের দুআ থেকে বেঁচে থাকো; কারণ তার ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।" — (সহিহ বুখারি: ৪৩৪, সহিহ মুসলিম: ১৯)
কিন্তু মনে রাখতে হবে—প্রতিশোধ আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া সর্বোত্তম। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ "নিশ্চয়ই আল্লাহ এক অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।" — (সূরা আন-নিসা: ৪০)
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ ۚ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ "আর তুমি কখনো মনে করো না যে, জালিমরা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল। তিনি তাদেরকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন চোখগুলো স্থির হয়ে যাবে।" — (সূরা ইবরাহিম: ৪২)
৩. প্রশ্নকারীর করণীয়
১. তাওবা করুন — হারাম সম্পর্কের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। ২. সেই ব্যক্তির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করুন — কোনো যোগাযোগ, মেসেজ, দেখা—সব বন্ধ করুন। ৩. প্রতিশোধ আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন — আল্লাহই সর্বোত্তম বিচারক। ৪. দুআ করুন — মাজলুমের দুআ কবুল হয়, তবে দুআ হবে নিজের হেদায়াত ও শান্তির জন্য; প্রতিশোধের আগুন নিয়ে নয়। ৫. নিজের জীবন গড়ুন — হালাল পথে বিবাহের মাধ্যমে জীবন সাজান। ৬. অতীতের কষ্টকে শিক্ষা বানান — যেন ভবিষ্যতে এমন ভুল না হয়।
৪. সরাসরি উত্তর
প্রশ্ন: আল্লাহ কি সেই ছেলেটির কাছে থেকে প্রতিশোধ নেবেন?
উত্তর: আল্লাহ আদল (ন্যায়বিচার) করেন। কেউ যদি কারো প্রতি জুলুম করে, কটু কথা বলে, কষ্ট দেয়, মিথ্যা অপবাদ দেয়—আল্লাহ তা জানেন এবং এর হিসাব নেবেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَٰكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো জুলুম করেন না, কিন্তু মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।" — (সূরা ইউনুস: ৪৪)
কিন্তু প্রতিশোধ চাওয়া আপনার দায়িত্ব নয়; বরং আপনি যদি ক্ষমা করেন, তবে তা আপনার জন্য উত্তম। আল্লাহ বলেন:
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا ۖ فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ "মন্দের প্রতিফল সমান মন্দ; কিন্তু যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।" — (সূরা আশ-শূরা: ৪০)
সারকথা: আল্লাহ অবশ্যই ন্যায়বিচার করবেন। কিন্তু আপনার জন্য সর্বোত্তম পথ হলো—তাওবা করা, সম্পর্ক ত্যাগ করা, আল্লাহর কাছে নিজের কষ্টের প্রতিদান চাওয়া, এবং ক্ষমা করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ আপনার কষ্ট লাঘব করুন এবং উত্তম জীবন দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب