ইসলামে খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা কি হারাম?
Halal and Haram · Hanafi
Question
ইসলামে খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা কি হারাম?
Answer
শিকার করা কি খাওয়ার উদ্দেশ্যে হারাম?
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি হলো: খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা কি হারাম?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা হারাম নয়; বরং এটি মূলত জায়েজ (বৈধ)। তবে কিছু শর্ত ও নিয়ম পালন করা আবশ্যক। যদি শর্তগুলো পূর্ণ না হয়, তাহলে শিকার করা নাজায়েজ বা হারাম হয়ে যেতে পারে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. শিকারের মূল বিধান (হুকুম)
ইসলামে খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা জায়েজ। কুরআন ও হাদিসে এর অনুমতি রয়েছে।
কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا "আর যখন তোমরা ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাও, তখন শিকার করো।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ "তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও তার খাদ্য হালাল করা হয়েছে।" (সূরা আল-মায়িদা: ৯৬)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
عَنْ عَدِيِّ بْنِ حَاتِمٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي أُرْسِلُ كَلْبِي وَأَذْكُرُ اسْمَ اللهِ عَلَيْهِ... قَالَ: إِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبَكَ وَذَكَرْتَ اسْمَ اللهِ عَلَيْهِ فَكُلْ "আদি ইবনে হাতিম (রা.) বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার কুকুর ছাড়ি এবং তার উপর আল্লাহর নাম নিই... তিনি বললেন: যখন তুমি তোমার কুকুর ছাড়ো এবং তার উপর আল্লাহর নাম নাও, তখন তা খাও।" (সহিহ বুখারি: ৫৪৭৫, সহিহ মুসলিম: ১৯২৯)
২. শিকার জায়েজ হওয়ার শর্তসমূহ
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী শিকার জায়েজ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূর্ণ হতে হবে:
(ক) শিকারী মুসলিম বা আহলে কিতাব হতে হবে শিকারী মুসলিম, অথবা ইহুদি-খ্রিস্টান (আহলে কিতাব) হতে হবে। মূর্তিপূজারী, নাস্তিক বা অমুসলিম (আহলে কিতাব ছাড়া) ব্যক্তির শিকার করা পশু খাওয়া জায়েজ নয়।
(খ) শিকারের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া শিকার ছাড়ার সময় "বিসমিল্লাহ" বলা আবশ্যক। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ না বলা হয়, তাহলে সেই শিকার হারাম।
وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ "আর তোমরা তা খেয়ো না, যার উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি।" (সূরা আল-আনআম: ১২১)
(গ) শিকারের হাতিয়ার ধারালো হতে হবে শিকারের জন্য ধারালো অস্ত্র, তীর, বন্দুক বা প্রশিক্ষিত শিকারি পশু ব্যবহার করতে হবে। ভোঁতা বা ভারী বস্তু (যা রক্ত প্রবাহিত করে না) দ্বারা শিকার করা পশু খাওয়া জায়েজ নয়।
عَنْ رَافِعِ بْنِ خَدِيجٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: مَا أَنْهَرَ الدَّمَ وَذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ فَكُلْ "রাফি ইবনে খাদিজ (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যা রক্ত প্রবাহিত করে এবং যার উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়, তা খাও।" (সহিহ বুখারি: ৫৪৮৪)
(ঘ) শিকার মৃত অবস্থায় পাওয়া গেলে যদি শিকার করা পশু আহত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তখনো জীবিত থাকে, তাহলে ইসলামি পদ্ধতিতে যবেহ করতে হবে। যদি যবেহ করার আগেই মারা যায়, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ।
(ঙ) শিকারি পশু প্রশিক্ষিত হতে হবে যদি শিকারি পশু (কুকুর, বাজপাখি ইত্যাদি) প্রশিক্ষিত হয় এবং শিকারের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয়, তাহলে তার শিকার করা পশু খাওয়া জায়েজ। তবে যদি শিকারি পশু নিজেই শিকার খেয়ে ফেলে, তাহলে বাকি অংশ খাওয়া জায়েজ নয় (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)।
৩. কখন শিকার হারাম বা নাজায়েজ হয়?
নিম্নলিখিত অবস্থায় শিকার করা হারাম বা নাজায়েজ:
-
ইহরাম অবস্থায় শিকার করা — হজ বা উমরাহর ইহরাম অবস্থায় স্থলভাগের শিকার করা হারাম।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার হত্যা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ৯৫)
-
শুধু খেল-তামাশা বা শখের বশে শিকার করা — যদি খাওয়ার নিয়ত না থাকে, শুধু বিনোদনের জন্য প্রাণী হত্যা করা হয়, তাহলে তা নাজায়েজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ قَتَلَ عُصْفُورًا عَبَثًا... "যে ব্যক্তি অকারণে একটি চড়ুই পাখি হত্যা করবে..." (সুনানে নাসাঈ: ৪৪৪৪)
-
অন্যের মালিকানাধীন জমি বা সংরক্ষিত এলাকায় শিকার করা বা অন্যের পশু শিকার করা — অনুমতি ছাড়া জায়েজ নয়।
-
বিলুপ্তপ্রায় বা সংরক্ষিত প্রাণী শিকার করা — যদি কোনো প্রাণী সংরক্ষিত বা বিলুপ্তপ্রায় হয়, তাহলে তা শিকার করা নাজায়েজ।
-
বিসমিল্লাহ না বলা — ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ না বললে শিকার হারাম।
৪. হানাফি ফিকহের দলিল
আল-হিদায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে:
وَيَحِلُّ صَيْدُ الْكَلْبِ الْمُعَلَّمِ وَالْفَهْدِ وَالْبَازِي وَالصَّقْرِ إِذَا كَانَ مُعَلَّمًا وَذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَى إِرْسَالِهِ "প্রশিক্ষিত কুকুর, চিতাবাঘ, বাজপাখি ও শিকারের পাখির শিকার হালাল, যখন তা প্রশিক্ষিত হয় এবং ছাড়ার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয়।" (আল-হিদায়া, কিতাবুস সায়দ)
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
وَشَرْطُ حِلِّ الصَّيْدِ أَنْ يَكُونَ الصَّائِدُ مُسْلِمًا أَوْ كِتَابِيًّا وَأَنْ يَذْكُرَ اسْمَ اللهِ تَعَالَى عِنْدَ الْإِرْسَالِ أَوْ الرَّمْيِ "শিকার হালাল হওয়ার শর্ত হলো: শিকারী মুসলিম বা আহলে কিতাব হবে এবং ছাড়ার বা নিক্ষেপের সময় আল্লাহর নাম নেবে।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪৬০)
ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"শিকার করা মূলত জায়েজ, তবে শর্ত হলো খাওয়ার নিয়ত থাকা, আল্লাহর নাম নেওয়া এবং হালাল পদ্ধতিতে শিকার করা। শুধু শখ বা বিনোদনের জন্য প্রাণী হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২১)
৫. উপসংহার
- খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা জায়েজ, যদি শর্তগুলো পূর্ণ হয়।
- শুধু শখ বা বিনোদনের জন্য শিকার করা নাজায়েজ।
- ইহরাম অবস্থায়, অন্যের জমিতে অনুমতি ছাড়া, বা বিসমিল্লাহ না বলে শিকার করা হারাম।
- শিকারি পশুর শিকার তখনই হালাল, যখন তা প্রশিক্ষিত হয় এবং আল্লাহর নাম নেওয়া হয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার | জায়েজ (শর্তসাপেক্ষে) | | শুধু শখ/বিনোদনের জন্য শিকার | নাজায়েজ | | ইহরাম অবস্থায় শিকার | হারাম | | বিসমিল্লাহ না বলে শিকার | হারাম | | অন্যের জমিতে বা অন্যের পশু অনুমতি ছাড়া শিকার | নাজায়েজ | | প্রশিক্ষিত পশুর শিকার (বিসমিল্লাহসহ) | হালাল |