"ওজিফা পাঠ ও বই ক্রয় সংক্রান্ত ইসলামী বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Halal and Haram · Hanafi
Question
মুহতারাম মুফতি সাহেব,
হালাল-হারাম, জায়েজ -নাজায়েজ বিষয়ক আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে ।
১) বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত হিসনে হাসিন এবং এরকম কিছু কিতাবে মহান আল্লাহর সিফাতী নামসমূহের উপর কিছু ওজিফা দেখা যায় ৷ যেমন- ইয়া আজিজু - এই নাম ৪১ বার করে ৪০ বা ৪১ দিন পাঠ করলে মানুষের থেকে অমুখাপেক্ষিতা অর্জিত হবে । এভাবে, রিজিকের সংকটে, সন্তান লাভের ক্ষেত্রে ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অনেক ওজিফা রয়েছে ।
আমি যতটুকু শুনেছিলাম যে, এসব সুন্নাহ থেকে বর্ণিত আমল নয় ৷
তবে সুন্নাহ মনে না করে, দ্বীনের আবশ্যিক অংশ মনে না করে শুধু সিফাতী নামের অর্থের দিকে লক্ষ রেখে পাঠ করা জায়েজ কী না?
বিশেষত সালাফদের অভিজ্ঞতা থেকে এরকম কোন আমলের প্রমাণ পাওয়া যায় কী না?
২) একজন লেখক বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ -এর উপরে খুবই বোধগম্য ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে বই লিখেন । কিন্তু, বই কিনতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট লিংকে গিয়ে দেখি তিনি একাধিক বই কিনলে ডিসকাউন্ট দিচ্ছেন জুয়া খেলার স্টাইলে । ওখানে, স্পিন করলে যেই পার্সেন্টেজ উঠবে ঐ পার্সেন্টেজ ডিসকাউন্ট দেওয়া হবে ক্রেতাকে ।
এখন, আমি যেহেতু একটাই বই কিনব অনলাইনে, আমি কী ঐ লেখকের বই কিনতে পারব?
আর একাধিক বই কিনে থাকলে যদি স্পিন না করি, ঐভাবে কোন ডিসকাউন্ট না নিই, তাহলে কী একাধিক বই কেনা জায়েজ হবে?
না কী তিনি একটা ক্ষেত্রে যেহেতু জুয়ার স্টাইল ফলো করছেন, তার কাছ থেকে কেনা একেবারেই নাজায়েজ হবে?
Answer
ওজিফা পাঠ ও বই ক্রয় সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:
প্রথম প্রশ্ন: সিফাতী নামের ওজিফা পাঠ
বিশ্লেষণ:
ইসলামী শরীয়তে ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো তাওকিফিয়্যাহ (توقيفية) — অর্থাৎ ইবাদত কেবল কুরআন ও সুন্নাহর প্রমাণিত দলিলের মাধ্যমেই সাব্যস্ত হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন কিছু সৃষ্টি করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮
আল্লাহ তাআলার সিফাতী নামসমূহ দ্বারা দুআ করা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا "আর আল্লাহর জন্য রয়েছে উত্তম নামসমূহ, সুতরাং তোমরা তা দিয়ে তাঁকে ডাকো।" — সূরা আল-আ'রাফ: ১৮০
তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা (৪১ বার, ৪০ দিন ইত্যাদি), নির্দিষ্ট সময়সীমা, নির্দিষ্ট ফলাফল (অমুখাপেক্ষিতা অর্জন, রিজিকের সংকট দূর হওয়া, সন্তান লাভ ইত্যাদি) — এসবের কোনো দলিল কুরআন-সুন্নাহ বা সালাফে সালেহীনের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত নয়। এগুলো পরবর্তী যুগের কিছু কিতাবে সংকলিত হয়েছে, যার ভিত্তি সুন্নাহ নয়।
হুকুম:
১. যদি কেউ এগুলোকে সুন্নাহ বা দ্বীনের আবশ্যিক অংশ মনে না করে, শুধু আল্লাহর নামের অর্থের প্রতি লক্ষ রেখে দুআ হিসেবে পাঠ করে এবং নির্দিষ্ট সংখ্যা-সময়কে অপরিবর্তনীয় বিধান মনে না করে — তবে তা জায়েজ। কারণ এটি দুআর অন্তর্ভুক্ত, আর দুআ ইবাদত।
২. তবে যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, এই নির্দিষ্ট সংখ্যা/সময়ে পাঠ করলেই কেবল ফলাফল পাওয়া যাবে, বা এটি সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত — তবে তা বিদআত হবে।
৩. সালাফে সালেহীনের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যা-সময়-ফলাফল সংক্রান্ত আমলের প্রমাণ পাওয়া যায় না। হাদীসে বর্ণিত দুআ ও যিকির নির্দিষ্ট সংখ্যায় রয়েছে (যেমন সকাল-সন্ধ্যার আযকার, তাসবীহে ফাতিমী ইত্যাদি), কিন্তু হিসনে হাসিনে উল্লেখিত পদ্ধতিগুলো সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
৪. বিশেষভাবে লক্ষণীয়: আল্লাহর সিফাতী নামসমূহের অর্থ বুঝে দুআ করা উত্তম, কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যা ও দিনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
ফতোয়া:
নির্দিষ্ট সংখ্যা ও দিনের বাধ্যবাধকতা ছাড়া, সুন্নাহ বা দ্বীনের অপরিহার্য অংশ মনে না করে, শুধু আল্লাহর নামের অর্থের প্রতি লক্ষ রেখে দুআ হিসেবে পাঠ করা জায়েজ। তবে এগুলোকে সুন্নাহ বা নির্দিষ্ট ফলাফলের নিশ্চিত মাধ্যম মনে করা বিদআত।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ১, পৃ. ৪৩০ — "العبادة توقيفية"
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৯৫
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আল-আ'রাফ: ১৮০-এর তাফসীর
দ্বিতীয় প্রশ্ন: জুয়া-স্টাইলে ডিসকাউন্ট ও বই ক্রয়
বিশ্লেষণ:
জুয়া (قمار) ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর — এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — সূরা আল-মায়িদা: ৯০
জুয়ার সংজ্ঞা: উভয় পক্ষের মধ্যে এমন চুক্তি যেখানে লাভ-ক্ষতি সম্পূর্ণ ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল এবং উভয় পক্ষ থেকে সম্পদের বিনিময় শর্তযুক্ত।
এখন প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়টি বিশ্লেষণ করি:
স্পিন করে ডিসকাউন্ট পাওয়ার বিষয়টি:
- এখানে ক্রেতা বই কেনার সময় একটি নির্দিষ্ট মূল্য দিচ্ছেন।
- স্পিনের মাধ্যমে তিনি অতিরিক্ত ডিসকাউন্ট পাচ্ছেন — এটি বিক্রেতার পক্ষ থেকে একটি উপহার/ছাড়।
- ক্রেতা স্পিন না করলেও বইটি কিনতে পারছেন নির্দিষ্ট মূল্যে।
- এখানে ক্রেতার কোনো সম্পদ জুয়ার বিনিময়ে হারানোর ঝুঁকি নেই; বরং তিনি অতিরিক্ত ছাড় পেতে পারেন বা না-ও পেতে পারেন।
তবে সতর্কতার দিক:
- যদি স্পিনে অংশ নিতে ক্রেতাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় বা কোনো সম্পদ বাজি রাখতে হয় — তবে তা জুয়া হবে।
- যদি স্পিনের ফলাফল সম্পূর্ণ ভাগ্যের উপর নির্ভর করে এবং তার বিনিময়ে ক্রেতা কোনো সম্পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন — তবে তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্নে উল্লিখিত ক্ষেত্রে:
- ক্রেতা স্পিন না করলেও বই কিনতে পারছেন — অর্থাৎ স্পিন বাধ্যতামূলক নয়।
- স্পিনে ক্রেতার কোনো সম্পদ বাজি রাখা হচ্ছে না; বরং বিক্রেতা তার নিজের পক্ষ থেকে ছাড় দিচ্ছেন।
- এটি মূলত বিক্রেতার পক্ষ থেকে একটি প্রমোশনাল অফার, যা জুয়ার প্রকৃত সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়।
হুকুম:
১. একক বই কেনা: যেহেতু আপনি একটি বই কিনছেন এবং স্পিনে অংশ নিচ্ছেন না, তাই একটি বই কেনা জায়েজ। কারণ এখানে জুয়ার কোনো উপাদান নেই — আপনি নির্দিষ্ট মূল্যে নির্দিষ্ট পণ্য কিনছেন।
২. একাধিক বই কেনা (স্পিন না করে): যদি একাধিক বই কেনেন কিন্তু স্পিন না করেন এবং ডিসকাউন্ট না নেন — তবে তা জায়েজ। কারণ এটি সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়, যেখানে জুয়ার কোনো উপাদান নেই।
৩. স্পিন করে ডিসকাউন্ট নেওয়া: যদি স্পিনে অংশ নিতে হয় এবং স্পিনের ফলাফল সম্পূর্ণ ভাগ্যের উপর নির্ভর করে, তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম। তবে যেহেতু ক্রেতার কোনো সম্পদ বাজি রাখা হচ্ছে না এবং স্পিন বাধ্যতামূলক নয় — এটি জুয়া নয়, বরং বিক্রেতার পক্ষ থেকে একটি শর্তসাপেক্ষ ছাড়। তবে ইহতিয়াত (সতর্কতা) হিসেবে স্পিন না করাই উত্তম।
৪. লেখকের কাছ থেকে কেনা: লেখক যেহেতু জুয়ার স্টাইল ফলো করছেন, কিন্তু তার বই কেনা নিজে জুয়া নয় — তাই তার কাছ থেকে বই কেনা জায়েজ। তবে যদি তিনি জুয়ার মাধ্যমে আয় করেন বা জুয়ার প্রচার করেন, তবে তার থেকে কেনা মাকরূহ হতে পারে।
ফতোয়া:
প্রশ্নে উল্লিখিত ক্ষেত্রে — যেখানে স্পিন বাধ্যতামূলক নয়, ক্রেতার কোনো সম্পদ বাজি রাখা হচ্ছে না, এবং স্পিন না করলেও বই কেনা যায় — সেখানে একটি বা একাধিক বই কেনা জায়েজ। তবে জুয়ার সাদৃশ্য থাকায় স্পিন না করাই উত্তম ও ইহতিয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯৩ — কিতাবুল বাইউ'
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ১৪৫ — "القمار وأحكامه"
- ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮
- আল-হিদায়া, কিতাবুল বাইউ', বাবুল বাতিল
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ১২৭
সারসংক্ষেপ:
| প্রশ্ন | হুকুম | |--------|-------| | সিফাতী নামের ওজিফা (সুন্নাহ না মনে করে, অর্থের প্রতি লক্ষ রেখে) | জায়েজ, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা-সময়কে অপরিবর্তনীয় মনে করা বিদআত | | সালাফদের অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণ | প্রমাণিত নয় | | একক বই কেনা (স্পিন ছাড়া) | জায়েজ | | একাধিক বই কেনা (স্পিন না করে) | জায়েজ | | স্পিন করে ডিসকাউন্ট নেওয়া | জুয়া নয়, তবে ইহতিয়াত হিসেবে পরিহার উত্তম | | লেখকের কাছ থেকে কেনা | জায়েজ |
والله أعلم بالصواب