বন্ধুদের সাথে ঘোরা ও আড্ডা দেওয়ার ইসলামি বিধান — ফেতনা না থাকলে কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি একজন ছেলে। মাঝেমাঝে আমার ছেলে বন্ধুদের সাথে মন উৎফুল্ল করার উদ্দেশ্যে ঘুরতে বের হওয়া,আড্ডা দেওয়া কি জায়েয (যদি ফেতনার আশংকা না থাকে)?(বেশিরভাগ বন্ধুরা ইসলাম পালনে তেমন কঠোর নয় তবে তারা অশ্লীল আড্ডা ইত্যাদি করেনা)
Answer
জায়েয-নাজায়েয: বন্ধুদের সাথে ঘোরা ও আড্ডা দেওয়ার বিধান
উত্তর (ফতোয়া):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থা অনুযায়ী — অর্থাৎ যদি আড্ডায় কোনো হারাম বিষয় (গীবত, মিথ্যা, অশ্লীল কথা, নামাজ তরক, ফেতনায় লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি) না থাকে এবং ফেতনার আশঙ্কা না থাকে — তবে বন্ধুদের সাথে ঘোরাফেরা ও আড্ডা দেওয়া মূলত জায়েয। ইসলাম বন্ধু-বান্ধবের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ, হাসি-আনন্দ ও সময় কাটানো নিষিদ্ধ করেনি; বরং উত্তম বন্ধুত্ব ও সৎ সঙ্গকে উৎসাহিত করেছে।
তবে কয়েকটি শর্ত ও সতর্কতা অবশ্যই পালনীয়:
১. শরীয়তের সীমা রক্ষা করা
আড্ডা যেন নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি দায়িত্ব ও পারিবারিক হক আদায়ে বাধা না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।" (সূরা আত-তাহরীম: ৬)
২. সময়ের অপচয় থেকে বেঁচে থাকা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"দুই নিয়ামত এমন আছে, যে ব্যাপারে অনেক মানুষ ধোঁকায় পড়ে — সুস্থতা ও অবসর সময়।" (সহীহ বুখারী: ৬৪১২)
অতএব আড্ডা যেন নিছক সময় নষ্টের মাধ্যম না হয়; বরং প্রয়োজনীয় বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
৩. সঙ্গীর প্রভাব বিবেচনা করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
"মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে; অতএব তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩, তিরমিজি: ২৩৭৮ — হাসান)
যদিও আপনার ছেলের বন্ধুরা অশ্লীল আড্ডা করে না, তবুও যেহেতু তারা দ্বীন পালনে কঠোর নয়, তাই দীর্ঘদিনের সংসর্গে ধীরে ধীরে দ্বীনি অনুভূতি শিথিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সৎ ও দ্বীনদার সঙ্গী বেছে নেওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া কর্তব্য।
৪. পর্দা ও মিশ্র পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকা
আড্ডার স্থান ও পরিবেশ যেন পর্দার বিধান লঙ্ঘন না করে, বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা না হয়। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
৫. অপ্রয়োজনীয় বাইরে ঘোরাফেরা কমিয়ে আনা
বিনা প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা, বিশেষত রাত জেগে আড্ডা দেওয়া — এসব থেকে বিরত থাকা উত্তম। ফকীহগণ বলেছেন, মুমিনের জন্য বাইরে অবস্থান কেবল প্রয়োজনীয় কাজে সীমাবদ্ধ রাখা কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | ফেতনামুক্ত পরিবেশে বন্ধুদের সাথে আড্ডা | জায়েয (মুবাহ) | | নামাজ/দ্বীনি দায়িত্বে অবহেলা করলে | নাজায়েয | | গীবত, মিথ্যা, অশ্লীলতা থাকলে | হারাম | | পর্দা লঙ্ঘন হলে | হারাম | | সৎ সঙ্গীর সাথে সময় কাটানো | মুস্তাহাব |
পরামর্শ: আপনার ছেলেকে বোঝান — বন্ধুত্ব ও আড্ডা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে তা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির সীমার ভেতরে থাকে এবং দ্বীনি চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। সম্ভব হলে তাকে দ্বীনদার বন্ধুদের সংস্পর্শে উৎসাহিত করুন এবং পারিবারিক বিনোদনের ব্যবস্থা করুন, যাতে সে সঠিক পথে থাকে।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯০ — বন্ধুত্ব ও সঙ্গীর প্রভাব প্রসঙ্গে
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৫০ — সময় ও বিনোদনের সীমা
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৫, পৃ. ১২৩ — সৎ সঙ্গীর গুরুত্ব
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আত-তাহরীম: ৬-এর তাফসীর
- বেহেশতী জেওর, দ্বিতীয় খণ্ড — সঙ্গী নির্বাচন প্রসঙ্গে
والله أعلم بالصواب