ইসলামে লিঙ্গ পরিবর্তন করা যাবে কি
Halal and Haram · Hanafi
Question
এক্ষেত্রে তার করনীয় কি?সে কি ছেলেদের মতো হওয়ার জন্যে চিকিৎসা নিবে?কিন্তু তার হরমোন পুরোপুরি মেয়েদের মতো।আর সে যদি মেয়ে হয়ে যেতে চায় সেটা কি ইসলামে জায়েয হবে?
Answer
হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
উত্তর (ফতোয়া)
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد
মূল বিষয়ের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা হলো—একজন ব্যক্তির শরীরে পুরুষ হরমোন প্রায় নেই বললেই চলে, বরং মহিলা হরমোন বেশি। শারীরিক গঠনও মেয়েদের মতো। এখন সে চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ মেয়ে হয়ে যেতে চায়। ইসলামে এ ধরনের লিঙ্গ পরিবর্তন (Sex Change Operation) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা
১. আল্লাহর সৃষ্টিতে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আমি অবশ্যই শয়তানকে অভিশাপ দিয়েছি... সে বলবে, আমি অবশ্যই আপনার বান্দাদের মধ্যে এক নির্দিষ্ট অংশকে পথভ্রষ্ট করব এবং তাদেরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেব। আর আমি তাদেরকে অবশ্যই আদেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করে ফেলবে।" (সূরা আন-নিসা: ১১৯)
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে বলেন—আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করার অর্থ হলো, আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা পরিবর্তন করা, যেমন পুরুষকে নারী বানানো বা নারীকে পুরুষ বানানো। (তাফসির ইবনে কাসির, ২/৩৬৫)
২. হাদিসে লানতের ঘোষণা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন পুরুষদের প্রতি লানত করেছেন যারা নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং এমন নারীদের প্রতি যারা পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৮৫)
ইমাম আবু দাউদ (রহ.) বর্ণনা করেন:
"রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'যে পুরুষ নিজেকে নারীর মতো বানায়, তাকে তোমরা বের করে দাও।'" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯২৭)
৩. হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত
ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:
"যদি কোনো পুরুষ নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে বা নারীর মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করে, তবে তা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন এবং শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩৫৭)
রাদ্দুল মুহতারে ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"পুরুষের জন্য নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করা, নারীর পোশাক পরিধান করা, নারীর মতো কথা বলা—সবই হারাম। আর যদি কেউ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করে, তবে তা কুফরি ও আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি চরম অবমাননা।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৪৯)
ফতোয়ায়ে উসমানিতে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"লিঙ্গ পরিবর্তনের অপারেশন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে লিঙ্গে সৃষ্টি করেছেন, তা পরিবর্তন করার কোনো অধিকার মানুষের নেই। এটি শুধু হারামই নয়, বরং আল্লাহর সৃষ্টির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ৩/৪২১)
৪. হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) সম্পর্কে ইসলামের বিধান
ইসলামে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ বলতে বোঝায়—যাদের জন্মগতভাবে পুরুষ বা নারীর কোনো একটি লিঙ্গ স্পষ্ট নয়, অথবা উভয় লিঙ্গের অঙ্গ থাকে। এদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো:
- যদি জন্মগতভাবে পুরুষের অঙ্গ প্রধান হয় → তাকে পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হবে।
- যদি জন্মগতভাবে নারীর অঙ্গ প্রধান হয় → তাকে নারী হিসেবে গণ্য করা হবে।
- যদি উভয়ই সমান হয় → তখন প্রস্রাবের স্থান বা অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে আছে:
"খুনসা (হিজড়া) যদি পুরুষের অঙ্গ বেশি থাকে, তবে সে পুরুষের বিধান পাবে। আর যদি নারীর অঙ্গ বেশি থাকে, তবে নারীর বিধান পাবে।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ১/৩৪৫)
কিন্তু প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে—তার পুরুষাঙ্গ আছে, শুধু হরমোনের তারতম্য। এটি জন্মগত হিজড়া নয়, বরং হরমোনাল ডিসঅর্ডার। তাই তার জন্য লিঙ্গ পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৫. চিকিৎসার বিধান
প্রশ্ন: সে কি ছেলেদের মতো হওয়ার জন্য চিকিৎসা নিতে পারবে?
উত্তর: হ্যাঁ, তার জন্য পুরুষ হরমোনের চিকিৎসা নেওয়া জায়েয, যদি তা স্বাভাবিক পুরুষালি বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন নয়, বরং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। তবে শর্ত হলো:
- চিকিৎসা অবশ্যই যোগ্য মুসলিম ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে হতে হবে।
- এটি শুধু স্বাভাবিক পুরুষালি বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে হবে, নারীর মতো করতে নয়।
- কোনো হারাম উপাদান (যেমন হারাম ওষুধ) ব্যবহার করা যাবে না।
ফতোয়ায়ে উসমানিতে আছে:
"যদি কোনো পুরুষের শরীরে পুরুষ হরমোনের অভাব থাকে এবং চিকিৎসার মাধ্যমে তা স্বাভাবিক করা হয়, তবে তা জায়েয। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন নয়, বরং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ৩/৪২৩)
৬. মেয়ে হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা সম্পর্কে
প্রশ্ন: সে যদি মেয়ে হয়ে যেতে চায়, সেটা কি ইসলামে জায়েয হবে?
উত্তর: সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। কারণ:
- এটি আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন।
- এটি শয়তানের অনুসরণ।
- এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর লানতের অন্তর্ভুক্ত।
- এটি কুফরির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মা'আরিফুল কুরআনে মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করা মানে আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করা। যে ব্যক্তি নিজেকে নারী বানাতে চায়, সে মূলত আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট। এটি ঈমানের জন্য চরম হুমকি।" (মা'আরিফুল কুরআন, ২/৪৫৬)
করণীয়
- তওবা করা: সে যেন আল্লাহর কাছে তওবা করে এবং নিজের লিঙ্গ নিয়ে অসন্তুষ্টির মনোভাব পরিত্যাগ করে।
- চিকিৎসা নেওয়া: স্বাভাবিক পুরুষালি বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা নেবে।
- মানসিক পরামর্শ: একজন যোগ্য ইসলামি মনোবিজ্ঞানী বা আলেমের পরামর্শ নেবে।
- ইবাদত-বন্দেগি: বেশি বেশি ইবাদত করবে, কুরআন তিলাওয়াত করবে, দোয়া করবে।
- পোশাক-আচরণ: পুরুষের মতো পোশাক ও আচরণ করবে, নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করবে না।
- বিবাহ: প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিবাহ করবে, যা তার মানসিক ও শারীরিক স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
সতর্কতা
- লিঙ্গ পরিবর্তন অপারেশন সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ।
- নারীর পোশাক, অলংকার, আচরণ পুরুষের জন্য হারাম।
- সমকামিতা সম্পূর্ণ হারাম। ছেলেদের প্রতি আকর্ষণ যদি সমকামিতার দিকে নিয়ে যায়, তবে তা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- আত্মহত্যা বা আত্মক্ষতি সম্পূর্ণ হারাম।
দোয়া
আল্লাহ তাআলা তাকে হেদায়েত দান করুন, তার মানসিক ও শারীরিক সমস্যা দূর করুন, এবং তাকে স্বাভাবিক পুরুষ হিসেবে জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب