কুরআন হিফজের ব্যপারে ওজু নিয়ে
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
কুরআন হিফজ, ওজু ও চুল ঢাকা প্রসঙ্গে ফতোয়া
উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد
প্রথম বিষয়: আরবি স্পর্শ না করে কুরআন দেখে হিফজ করা
প্রশ্নে আপনি বলেছেন—আপনি আরবি স্পর্শ না করে শুধু বই খুলে (অর্থাৎ অনুবাদ/উচ্চারণ দেখে) হিফজ করবেন। এ বিষয়ে হানাফি মাযহাবের স্পষ্ট মাসআলা হলো:
কুরআনে কারীম স্পর্শ করা (হাতে ধরা) বিনা ওজুতে হারাম। কিন্তু কুরআন না ছুঁয়ে শুধু দেখা বা পড়া—এ বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত: বিনা ওজুতে কুরআনের লেখা (মুসহাফের ভেতরের আরবি লেখা) দেখা বা পড়া জায়েয নয়।
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মত: বিনা ওজুতে কুরআন দেখা/পড়া জায়েয, শুধু স্পর্শ করা নিষেধ।
তবে আপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
আপনি বলেছেন আপনি আরবি স্পর্শ করবেন না—অর্থাৎ আপনি মূলত অনুবাদ, উচ্চারণ বা অর্থ দেখে হিফজ করবেন। এমতাবস্থায়:
-
যদি আপনি মুসহাফের ভেতরের আরবি লেখার উপর হাত না রাখেন এবং শুধু চোখে দেখে উচ্চারণ/অর্থ পড়েন—তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের (রহ.) মত অনুযায়ী জায়েয। আর যেহেতু আপনি প্রেগন্যান্ট ও অসুস্থতার সমতুল্য অবস্থায় আছেন, তাই তাকলীদ (অনুসরণ) করে এই মতের উপর আমল করা আপনার জন্য বৈধ ও সহজ।
-
তবে প্রতিবার বই ধরলেই নতুন ওজু করা আবশ্যক নয়—বরং শর্ত হলো: কুরআনের আরবি লেখা স্পর্শ না করা। আপনি যদি শুধু বইয়ের কভার ধরেন, পৃষ্ঠা উল্টান (যেখানে আরবি লেখা নেই), বা অনুবাদ/উচ্চারণ পড়েন—তাতে ওজু লাগবে না।
-
যদি কুরআনের আরবি লেখা স্পর্শ করতে হয়—তাহলে ওজু থাকা আবশ্যক। একবার ওজু ভেঙে গেলে পুনরায় ওজু করে নিতে হবে।
সারকথা: আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ পদ্ধতি হলো—আরবি লেখা স্পর্শ না করে, শুধু অনুবাদ/উচ্চারণ/অর্থ দেখে হিফজ করা। এতে ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না, এবং প্রতিবার নতুন ওজু করার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ»
(অর্থ: পবিত্রগণ ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করে না। —সূরা আল-ওয়াকিয়াহ: ৭৯)রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«لَا تَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا وَأَنْتَ طَاهِرٌ»
(অর্থ: তুমি পবিত্র অবস্থা ছাড়া কুরআন স্পর্শ করো না। —সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২৮৫; মুসনাদে আহমাদ)আল-হিদায়া-তে এসেছে:
«ولا يمس المصحف إلا بطهارة»
(মুসহাফ কেবল পবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করা যাবে।)রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে:
«المراد بالمس المباشر بالبشرة، فأما النظر فلا بأس به على قول أبي يوسف ومحمد»
(স্পর্শ দ্বারা উদ্দেশ্য সরাসরি চামড়ার সাথে স্পর্শ; আর দেখা সম্পর্কে ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মত হলো—তা জায়েয।)
দ্বিতীয় বিষয়: কুরআন তিলাওয়াত বা হিফজের সময় চুল ঢেকে রাখা
কুরআন তিলাওয়াত বা হিফজ করার সময় মাথায় উড়না/হিজাব রাখা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। এটি সুন্নত বা আদবের অন্তর্ভুক্ত, বিশেষত মহিলাদের জন্য সম্মান ও শালীনতার অংশ হিসেবে উত্তম। কিন্তু না রাখলে গুনাহ হবে না, তিলাওয়াতও সহীহ হবে।
তবে কিছু বিষয় লক্ষণীয়:
-
যদি আপনি নামাজে কুরআন পড়েন—তাহলে নামাজের শর্ত হিসেবে চুল ঢাকা ফরজ। নামাজের বাইরে তিলাওয়াত/হিফজে তা ফরজ নয়।
-
গরমের কারণে কষ্ট হলে—আপনি উড়না নামিয়ে রাখতে পারেন, এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে সম্ভব হলে হালকা কাপড় বা ফ্যান/এসির ব্যবস্থা করে শালীনতা রক্ষা করা উত্তম।
-
মহিলাদের জন্য কুরআন তিলাওয়াতের সময় শালীন পোশাক ও পর্দার প্রতি যত্নশীল হওয়া মুস্তাহাব—কিন্তু এটি ফরজ নয়।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ»
(অর্থ: হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ করো। —সূরা আল-আরাফ: ৩১)ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে আছে:
«وتغطية الرأس للمرأة في الصلاة واجب، وأما في القراءة خارج الصلاة فليس بواجب»
(নামাজে মহিলার মাথা ঢাকা ওয়াজিব; কিন্তু নামাজের বাইরে কুরআন পড়ার সময় তা ওয়াজিব নয়।)বাহিশতী জেওর-এ হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
«কুরআন পড়ার সময় মাথা ঢাকা উত্তম, কিন্তু না ঢাকলে গুনাহ নেই।»
সারসংক্ষেপ ও আমলি পরামর্শ
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | বিনা ওজুতে কুরআনের আরবি লেখা স্পর্শ করা | হারাম | | বিনা ওজুতে শুধু দেখা/অর্থ পড়া (স্পর্শ না করে) | ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মত জায়েয; আপনার জন্য এটাই গ্রহণযোগ্য | | প্রতিবার বই ধরলেই নতুন ওজু | আবশ্যক নয়, যদি আরবি লেখা স্পর্শ না হয় | | কুরআন তিলাওয়াত/হিফজে চুল ঢাকা | ফরজ নয়, সুন্নত/আদব; না ঢাকলে গুনাহ নেই | | গরমের কারণে উড়না নামানো | জায়েয, গুনাহ নেই |
আপনার জন্য সহজ আমল:
- আরবি লেখা স্পর্শ না করে, শুধু অনুবাদ/উচ্চারণ/অর্থ দেখে হিফজ করুন।
- সম্ভব হলে ওজু করে নিন—এটি উত্তম ও সওয়াবের কাজ।
- চুল ঢাকার সামর্থ্য না থাকলে উড়না নামিয়ে রাখুন—তিলাওয়াত সহীহ হবে, গুনাহ নেই।
- প্রেগন্যান্সির কারণে কষ্ট হলে ইসলাম আপনার জন্য সহজতা চায়:
«يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ»
(আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না। —সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)
والله أعلم بالصواب والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته