কুরআন হিফজের ব্যপারে ওজু নিয়ে

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 6143
Questioner: NURE JANNATI
Question Asked: 30 Sep 2026, 09:58 AM
Reviewed & Published: 30 Sep 2026, 11:33 AM
Views: 13
Tokens: 4,818
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আমি কুরআনের ৩০ তম পারার সুরাগুলা একা একা অর্থসহ হিফজ করার নিয়ত করেছি। আমার কাছে কালার কোডেড সহজ কুরআন ৪৭ সুরার এই কুরআনটা আছে। আমার সবসময় ওজু থাকে না। আবার বার বার অজুও করতে পারি না। আমি প্রেগন্যান্ট তো। আমি যদি আরবি স্পর্শ না করে বইটা খুলে হিফজ করি তাহলে কি গুনাহ হবে? নাকি যতবার এই বই ধরব,হিফজ করবো প্রতিবার ই অজু করতে হবে? আর কুরআন তিলাওয়াতের বা হিফজের সময় চুল ঢেকে রাখা লাগবে? গরম লাগে তো খুব আমার। তাই যদি মাথা থেকে উড়না নামায় রাখি এটা কি হবে?

Answer

কুরআন হিফজ, ওজু ও চুল ঢাকা প্রসঙ্গে ফতোয়া

উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد

প্রথম বিষয়: আরবি স্পর্শ না করে কুরআন দেখে হিফজ করা

প্রশ্নে আপনি বলেছেন—আপনি আরবি স্পর্শ না করে শুধু বই খুলে (অর্থাৎ অনুবাদ/উচ্চারণ দেখে) হিফজ করবেন। এ বিষয়ে হানাফি মাযহাবের স্পষ্ট মাসআলা হলো:

কুরআনে কারীম স্পর্শ করা (হাতে ধরা) বিনা ওজুতে হারাম। কিন্তু কুরআন না ছুঁয়ে শুধু দেখা বা পড়া—এ বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত: বিনা ওজুতে কুরআনের লেখা (মুসহাফের ভেতরের আরবি লেখা) দেখা বা পড়া জায়েয নয়।
  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মত: বিনা ওজুতে কুরআন দেখা/পড়া জায়েয, শুধু স্পর্শ করা নিষেধ।

তবে আপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:

আপনি বলেছেন আপনি আরবি স্পর্শ করবেন না—অর্থাৎ আপনি মূলত অনুবাদ, উচ্চারণ বা অর্থ দেখে হিফজ করবেন। এমতাবস্থায়:

  1. যদি আপনি মুসহাফের ভেতরের আরবি লেখার উপর হাত না রাখেন এবং শুধু চোখে দেখে উচ্চারণ/অর্থ পড়েন—তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের (রহ.) মত অনুযায়ী জায়েয। আর যেহেতু আপনি প্রেগন্যান্ট ও অসুস্থতার সমতুল্য অবস্থায় আছেন, তাই তাকলীদ (অনুসরণ) করে এই মতের উপর আমল করা আপনার জন্য বৈধ ও সহজ।

  2. তবে প্রতিবার বই ধরলেই নতুন ওজু করা আবশ্যক নয়—বরং শর্ত হলো: কুরআনের আরবি লেখা স্পর্শ না করা। আপনি যদি শুধু বইয়ের কভার ধরেন, পৃষ্ঠা উল্টান (যেখানে আরবি লেখা নেই), বা অনুবাদ/উচ্চারণ পড়েন—তাতে ওজু লাগবে না।

  3. যদি কুরআনের আরবি লেখা স্পর্শ করতে হয়—তাহলে ওজু থাকা আবশ্যক। একবার ওজু ভেঙে গেলে পুনরায় ওজু করে নিতে হবে।

সারকথা: আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ পদ্ধতি হলো—আরবি লেখা স্পর্শ না করে, শুধু অনুবাদ/উচ্চারণ/অর্থ দেখে হিফজ করা। এতে ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না, এবং প্রতিবার নতুন ওজু করার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না।

দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ»
(অর্থ: পবিত্রগণ ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করে না। —সূরা আল-ওয়াকিয়াহ: ৭৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«لَا تَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا وَأَنْتَ طَاهِرٌ»
(অর্থ: তুমি পবিত্র অবস্থা ছাড়া কুরআন স্পর্শ করো না। —সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২৮৫; মুসনাদে আহমাদ)

আল-হিদায়া-তে এসেছে:
«ولا يمس المصحف إلا بطهارة»
(মুসহাফ কেবল পবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করা যাবে।)

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে:
«المراد بالمس المباشر بالبشرة، فأما النظر فلا بأس به على قول أبي يوسف ومحمد»
(স্পর্শ দ্বারা উদ্দেশ্য সরাসরি চামড়ার সাথে স্পর্শ; আর দেখা সম্পর্কে ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মত হলো—তা জায়েয।)


দ্বিতীয় বিষয়: কুরআন তিলাওয়াত বা হিফজের সময় চুল ঢেকে রাখা

কুরআন তিলাওয়াত বা হিফজ করার সময় মাথায় উড়না/হিজাব রাখা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। এটি সুন্নত বা আদবের অন্তর্ভুক্ত, বিশেষত মহিলাদের জন্য সম্মান ও শালীনতার অংশ হিসেবে উত্তম। কিন্তু না রাখলে গুনাহ হবে না, তিলাওয়াতও সহীহ হবে।

তবে কিছু বিষয় লক্ষণীয়:

  1. যদি আপনি নামাজে কুরআন পড়েন—তাহলে নামাজের শর্ত হিসেবে চুল ঢাকা ফরজ। নামাজের বাইরে তিলাওয়াত/হিফজে তা ফরজ নয়।

  2. গরমের কারণে কষ্ট হলে—আপনি উড়না নামিয়ে রাখতে পারেন, এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে সম্ভব হলে হালকা কাপড় বা ফ্যান/এসির ব্যবস্থা করে শালীনতা রক্ষা করা উত্তম।

  3. মহিলাদের জন্য কুরআন তিলাওয়াতের সময় শালীন পোশাক ও পর্দার প্রতি যত্নশীল হওয়া মুস্তাহাব—কিন্তু এটি ফরজ নয়।

দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ»
(অর্থ: হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ করো। —সূরা আল-আরাফ: ৩১)

ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে আছে:
«وتغطية الرأس للمرأة في الصلاة واجب، وأما في القراءة خارج الصلاة فليس بواجب»
(নামাজে মহিলার মাথা ঢাকা ওয়াজিব; কিন্তু নামাজের বাইরে কুরআন পড়ার সময় তা ওয়াজিব নয়।)

বাহিশতী জেওর-এ হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
«কুরআন পড়ার সময় মাথা ঢাকা উত্তম, কিন্তু না ঢাকলে গুনাহ নেই।»


সারসংক্ষেপ ও আমলি পরামর্শ

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | বিনা ওজুতে কুরআনের আরবি লেখা স্পর্শ করা | হারাম | | বিনা ওজুতে শুধু দেখা/অর্থ পড়া (স্পর্শ না করে) | ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মত জায়েয; আপনার জন্য এটাই গ্রহণযোগ্য | | প্রতিবার বই ধরলেই নতুন ওজু | আবশ্যক নয়, যদি আরবি লেখা স্পর্শ না হয় | | কুরআন তিলাওয়াত/হিফজে চুল ঢাকা | ফরজ নয়, সুন্নত/আদব; না ঢাকলে গুনাহ নেই | | গরমের কারণে উড়না নামানো | জায়েয, গুনাহ নেই |

আপনার জন্য সহজ আমল:

  • আরবি লেখা স্পর্শ না করে, শুধু অনুবাদ/উচ্চারণ/অর্থ দেখে হিফজ করুন।
  • সম্ভব হলে ওজু করে নিন—এটি উত্তম ও সওয়াবের কাজ।
  • চুল ঢাকার সামর্থ্য না থাকলে উড়না নামিয়ে রাখুন—তিলাওয়াত সহীহ হবে, গুনাহ নেই।
  • প্রেগন্যান্সির কারণে কষ্ট হলে ইসলাম আপনার জন্য সহজতা চায়:
    «يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ»
    (আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না। —সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)

والله أعلم بالصواب والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.