ঋণগ্রস্ত স্বামী কি যাকাত নিতে পারবে, যাকাতের টাকা পারিবারিক খরচে ব্যয় করা যাবে কি, দেনমোহর পরিশোধে যাকাতের টাকা ব্যবহার করা যাবে কি?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
আমার হাসব্যান্ডের বেতন ১৬০০০। ঘর ভাড়া বাবদ ৯০০০দেয়ার পর বাকিটা দিয়ে আমাদের মোটামুটি সারা মাস চলে যায়।
তবে ওনার বেশ কিছু ঋণ আছে।যেটা মাসিক ইনকাম থেকে পরিশোধ করা সম্ভব না।
আমার কিছু আত্মীয় রমাদানে যাকাত দেন।আমার হাসব্যান্ডকে দেয়া হয় ওনার যেহেতু ঋণ আছে সে জন্য। কিন্তু ঈদের সময় এতো খরচ থাকে যার জন্য দেখা যায় ঐ টাকাটা কিছুটা ঋণ শোধ করে বাকিটা পারিবারিক খরচে ব্যয় করা হয়।
এখন আমার প্রশ্ন -
১)আমার হাসব্যান্ড কি যাকাত নেয়ার খাতে পরেন?
২)যাকাতের টাকা কি পারিবারিক খরচে ব্যয় করা যায়?
৩) আমার দেনমোহর এখনো বকেয়া আছে। উনি কি এই টাকা থেকে আমাকে দেনমোহর পরিশোধ করতে পারবেন?
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
উত্তর
১ম প্রশ্নের উত্তর: আপনার স্বামী যাকাত গ্রহণের খাতে পড়েন কিনা
-
শরয়ী সিদ্ধান্ত:
হ্যাঁ, আপনার স্বামী শরীয়তের দৃষ্টিতে যাকাত গ্রহণের খাত (মাসারিফ)-এর অন্তর্ভুক্ত এবং উনার জন্য যাকাত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জায়েয [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭০, ১৭৭; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৩৯; দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৯, ১৮৭]। -
শরয়ী ব্যাখ্যা:
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি এমন ঋণগ্রস্ত হন যে—তার মৌলিক প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র (যেমন: থাকার ঘর, পরিধেয় বস্ত্র, দৈনন্দিন ব্যবহারের গৃহসামগ্রী ইত্যাদি) বাদ দিয়ে অতিরিক্ত সঞ্চয় বা সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধ করার মতো নিসাব পরিমাণ সম্পদ (৫৫.৫ তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ/সম্পদ) না থাকে, তবে তিনি শরীয়তের পরিভাষায় ‘মাদীউন’ (ঋণগ্রস্ত) বা ‘ফকীর’ বলে গণ্য হন [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৯, ১৮৭]।
আপনার স্বামীর মাসিক আয় ১৬,০০০ টাকা হলেও ৯,০০০ টাকা ঘর ভাড়ায় চলে যায় এবং বাকি টাকা দিয়ে আপনাদের সংসার কোনোমতে চলে, ফলে অর্জিত আয় থেকে ঋণ শোধ করার সুযোগ নেই। তাই অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকায় তিনি যাকাত গ্রহণ করার পূর্ণ হকদার [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৩৯]।
২য় প্রশ্নের উত্তর: যাকাতের টাকা পারিবারিক খরচে ব্যয় করা জায়েয কিনা
-
শরয়ী সিদ্ধান্ত:
হ্যাঁ, যাকাত হিসেবে প্রাপ্ত টাকা আপনার স্বামী পারিবারিক ও সংসারের অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারবেন; এতে কোনো গুনাহ হবে না এবং যাকাতও সঠিকভাবে আদায় হয়ে যাবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭০; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৯ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৪৯০; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৪১, ১৪৩]। -
শরয়ী ব্যাখ্যা:
যাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি যখন কোনো যাকাতের উপযুক্ত ফকীর বা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে যাকাতের টাকা বুঝিয়ে দেয়, তখন শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী ওই টাকার ওপর গ্রহীতার পূর্ণ মালিকানা (তামলীক) প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭০]। হস্তগত হওয়ার পর ওই টাকা গ্রহীতার নিজস্ব হালাল সম্পদে পরিণত হয়। প্রদানকারীরা ঋণ শোধের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকলেও, টাকাটি হাতে পাওয়ার পর আপনার স্বামী সেটি ঋণ শোধের পাশাপাশি পরিবারের খোরাকি, ঈদের খরচ বা অন্যান্য বৈধ প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারবেন [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৯ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৪৯০]। তবে ঋণের চাপ থেকে মুক্ত হতে যথাসম্ভব দ্রুত ঋণ শোধ করা উত্তম।
৩য় প্রশ্নের উত্তর: এই টাকা দিয়ে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করা যাবে কিনা
-
শরয়ী সিদ্ধান্ত:
হ্যাঁ, আপনার স্বামী যাকাত হিসেবে প্রাপ্ত টাকা থেকে আপনাকে দেনমোহর বাবদ প্রদান করতে পারবেন এবং এর দ্বারা উনার দেনমোহরের ঋণ আদায় হয়ে যাবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৬; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৮, ৪১; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২৩]। -
শরয়ী ব্যাখ্যা:
স্ত্রীর দেনমোহর স্বামীর ওপর একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক বান্দার হক/ঋণ [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৬]। যাকাতের টাকা যখন আপনার স্বামীর হস্তগত হয়েছে, তখন তা উনার নিজস্ব বৈধ মালে পরিণত হয়েছে। আর নিজের যেকোনো বৈধ ও হালাল মালিকানাধীন অর্থ থেকে স্বামী স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর পরিশোধ করতে পারেন। আপনি যখন দেনমোহর হিসেবে উক্ত অর্থ গ্রহণ করবেন, তখন আপনার পাওনা দেনমোহর আদায় হয়ে যাবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৪১]।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৭০: (অধ্যায়: সালাত/যাকাত, ২য় পরিচ্ছেদ: যাকাতের মাসারিফ — যাকাতের মালের মালিকানা (তামলীক) ও গ্রহীতার পূর্ণ স্বত্বাধিকারের বিধান) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭০]।
- পৃষ্ঠা: ১৭৭ & ১৮৭: (অধ্যায়: যাকাত, মাসারিফ পরিচ্ছেদ — ঋণগ্রস্ত (মাদীউন) ও অভাবী ব্যক্তির যাকাত গ্রহণের ফতোয়া) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৭, ১৮৭]।
২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খন্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৬ & ১২৬: (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, বাবুল মহর — দেনমোহর স্বামীর ওপর ওয়াজিব ঋণ হওয়া এবং তা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খন্ড), পৃষ্ঠা: ১১৬, ১২৬]।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৯ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৪৯০ & ৫০২: (অধ্যায়: কিতাবুয যাকাত, বাব তামলীকিজ যাকাত — যাকাত হস্তগত হওয়ার পর গ্রহীতা কর্তৃক যেকোনো বৈধ প্রয়োজনে ব্যয়ের শরয়ী অনুমতি) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৯ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৪৯০, ৫০২]।
৪. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৩৯: (অধ্যায়: বাব মাসারিফিজ যাকাত — ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি নিসাবমুক্ত থাকলে তার যাকাত গ্রহণের বৈধতা) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৩৯]।
৫. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৮, ৪১ & ৮২: (অধ্যায়: বাবুল মহর — স্বামীর যেকোনো হালাল অর্থ দ্বারা স্ত্রীর দেনমোহর আদায়ের শরয়ী ফায়সালা) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৮, ৪১, ৮২]।
৬. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১২৩: (অধ্যায়: বাবুল কাসব ওয়াল ঋণ — হস্তগত হালাল অর্থ দ্বারা নিজের জিম্মায় থাকা ঋণ শোধ করার বিধান) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১২৩]।
৭. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৭৯ & ১৮৭–১৮৯: (অধ্যায়: যাকাত — ঋণের বিধান, যাকাতের নিসাব এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যাকাত পাওয়ার ফিকহী রূপরেখা) [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৯, ১৮৭, ১৮৮, ১৮৯]।
৮. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৪১ & ১৪৩: (অধ্যায়: মাসারিফ ও সাদকা — অভাবী ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির সাদকা/যাকাতের মাল নিজ প্রয়োজনে ব্যবহারের অনুমতি) [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৪১, ১৪৩]।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।