দন্ডপ্রাপ্ত আসামীকে প্রেসিডেন্ট ক্ষমা করতে পারি কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে প্রেসিডেন্ট ক্ষমা করতে পারবেন কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রেসিডেন্টের জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে ক্ষমা করার বিধান কী? এটি শরীয়তসম্মত কিনা?
বিস্তারিত উত্তর
১. ক্ষমার প্রকারভেদ
ইসলামী শরীয়তে ক্ষমা বা মাফের বিষয়টি কয়েকটি স্তরে বিভক্ত:
ক. হক্কুল্লাহ (আল্লাহর হক) সংশ্লিষ্ট অপরাধ: যেমন—যিনা, চুরি, মদ্যপান ইত্যাদি হুদুদ (নির্ধারিত শাস্তি)। এগুলোতে ব্যক্তিগত ক্ষমার সুযোগ নেই; এগুলো আল্লাহর হক। তবে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন।
খ. হক্কুল ইবাদ (বান্দার হক) সংশ্লিষ্ট অপরাধ: যেমন—হত্যা, আঘাত, সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। এতে ভুক্তভোগী বা তার ওয়ারিশদের ক্ষমার অধিকার রয়েছে।
গ. তাযীর (শাসনতান্ত্রিক শাস্তি): এগুলো রাষ্ট্রপ্রধানের বিবেচনাধীন; তিনি প্রয়োজনে ক্ষমা করতে পারেন।
২. ফিকহী বিশ্লেষণ
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী:
- হুদুদ (নির্ধারিত শাস্তি) রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমা করতে পারেন না, যদি না তা প্রমাণিত না হয় বা সন্দেহ থাকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«ادْرَءُوا الْحُدُودَ عَنِ الْمُسْلِمِينَ مَا اسْتَطَعْتُمْ» "সন্দেহের কারণে মুসলিমদের থেকে হুদুদ (নির্ধারিত শাস্তি) রহিত কর।" — (সুনানে তিরমিযী, হাদীস ১৪২৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৫৪৫)
- কিসাস (হত্যার বদলে হত্যা)-এ ভুক্তভোগীর ওয়ারিশদের ক্ষমা বা দিয়াত (রক্তপণ) নেওয়ার অধিকার আছে। রাষ্ট্রপ্রধান তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা করতে পারেন না, তবে তাদের সম্মতি ছাড়া কিসাস কার্যকর করা যায় না।
«وَمَن قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَانًا» "আর যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, তার ওয়ারিশকে আমরা অধিকার দিয়েছি।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৩৩)
- তাযীর (শাসনতান্ত্রিক শাস্তি)-এ রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমা করার অধিকার রয়েছে, কারণ এটি জনস্বার্থ ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আরোপিত হয়।
৩. হানাফী কিতাবের বক্তব্য
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
- হুদুদ আল্লাহর হক, তাই কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধান তা ক্ষমা করতে পারেন না।
- তবে যদি অপরাধ প্রমাণিত না হয় বা সন্দেহ থাকে, তাহলে শাস্তি রহিত করা যায়।
- তাযীরের ক্ষেত্রে ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান (উলিল আমর) প্রয়োজনে ক্ষমা করতে পারেন, কারণ এটি বান্দার হক নয় বরং রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার স্বার্থ।
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে বলা হয়েছে:
"الحدود لا تسقط بالعفو، لأنها حق الله تعالى" "হুদুদ ক্ষমার দ্বারা রহিত হয় না, কারণ তা আল্লাহর হক।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া ও ফাতাওয়া উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:
"রাষ্ট্রপ্রধান হুদুদ ও কিসাসে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না; তবে তাযীরের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ বিবেচনায় ক্ষমা করতে পারেন।"
৪. প্রেসিডেন্টের ক্ষমার সীমা
| অপরাধের ধরন | ক্ষমার বিধান | |---|---| | হুদুদ (যিনা, চুরি, মদ্যপান) | ক্ষমা করা যাবে না (আল্লাহর হক) | | কিসাস (হত্যা, আঘাত) | ভুক্তভোগী/ওয়ারিশের সম্মতি ছাড়া ক্ষমা করা যাবে না | | দিয়াত (রক্তপণ) | ওয়ারিশদের সম্মতিতে গ্রহণযোগ্য | | তাযীর (শাসনতান্ত্রিক) | রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমা করতে পারেন | | তাওবা | আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা কর্তব্য |
৫. উপসংহার
- হুদুদ-এ প্রেসিডেন্টের ক্ষমার অধিকার নেই; এটি আল্লাহর হক।
- কিসাস-এ ভুক্তভোগী বা ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া ক্ষমা করা শরীয়তসম্মত নয়।
- তাযীর-এ রাষ্ট্রপ্রধান জনস্বার্থ বিবেচনায় ক্ষমা করতে পারেন।
- ইসলামী রাষ্ট্রে ক্ষমার ক্ষমতা শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকা আবশ্যক; ব্যক্তিগত ইচ্ছায় হুদুদ রহিত করা জায়েয নয়।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।