যিনা থেকে মুক্তির উপায়
Halal and Haram · Hanafi
Question
জিনা করছি ।অনেক বড় পাপ করে ফেলছি।এখন আমি চাচ্ছি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বিয়ে করে দ্বীনের পথে ফিরে আসতে। ছেলে বেদ্বীন এবং এ বিয়েতে আমার আম্মু আর আন্টি রা কেউ রাজি না এখন আমার কি করা উচিত??
Answer
জিনা থেকে মুক্তির উপায়: তাওবা, বিয়ে ও পারিবারিক সম্মতি
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী আত্মীয়ের সাথে জিনায় লিপ্ত হয়েছেন। তিনি এখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে বিয়ের মাধ্যমে দ্বীনের পথে ফিরতে চান। কিন্তু যে ছেলের সাথে বিয়ের ইচ্ছা, সে বেদ্বীন, এবং মা-খালারা কেউ রাজি নন। এখন তাঁর কী করা উচিত?
১. জিনা মহাপাপ — সাথে সাথে তাওবা করা ফরজ
জিনা কাবিরা গুনাহসমূহের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা জিনার নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا — (সূরা ফুরকান: ৬৮)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ "ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় থাকে না।" — (সহীহ বুখারী: ২৪৭৫, সহীহ মুসলিম: ৫৭)
অতএব প্রথম কর্তব্য: সাথে সাথে জিনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, আত্মীয়ের সাথে সব ধরনের অবৈধ সম্পর্ক ছিন্ন করা, এবং খাঁটি তাওবা করা।
তাওবার শর্ত (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
- গুনাহ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা
- গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা
- কারও হক নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ — (সূরা বাকারা: ২২২)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, তাওবা কবুল হওয়ার জন্য উপরোক্ত শর্তগুলো জরুরি। — (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৫০)
২. বিয়ে কি জিনা থেকে বাঁচার বৈধ উপায়? — হ্যাঁ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে; কারণ তা দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।" — (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫, সহীহ মুসলিম: ১৪০০)
তাই বিয়ের ইচ্ছা প্রশংসনীয়। কিন্তু বিয়ের আগে অবশ্যই জিনা বন্ধ করতে হবে — বিয়ে জিনার অনুমতি নয়।
৩. বেদ্বীন ছেলের সাথে বিয়ের বিধান
হানাফি মাজহাবের মূলনীতি:
একজন মুসলিম নারীর জন্য দ্বীনদার মুসলিম পুরুষ ছাড়া অন্য কারও সাথে বিয়ে জায়েজ নয়। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّىٰ يُؤْمِنُوا ۚ وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ — (সূরা বাকারা: ২২১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে, যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তার সাথে বিয়ে দাও।" — (তিরমিজি: ১০৮৪)
বেদ্বীন বা ফাসিক ছেলের সাথে বিয়ে: যদি সে নামাজ-রোজা পরিত্যাগকারী, দ্বীন পালন করে না — তবে এমন ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া জায়েজ নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন, ফাসিক ব্যক্তির সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে দেওয়া জায়েজ নেই। — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন, দ্বীনদারিতা ছাড়া বিয়ে করা নারীর জন্য বড় ক্ষতির কারণ। — (ফাতাওয়া উসমানি: ২/২৭০)
৪. এখন আপনার করণীয় — ধাপে ধাপে
ধাপ ১: জিনা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন
আত্মীয়ের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করুন। ফোন, মেসেজ, দেখা — সব বন্ধ। এটাই তাওবার প্রথম শর্ত।
ধাপ ২: খাঁটি তাওবা ও ইস্তেগফার
- দুই রাকাত সালাতুল তাওবা পড়ুন
- বেশি বেশি ইস্তেগফার করুন
- সদকা করুন
- আল্লাহর কাছে কাঁদুন
وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا — (সূরা নিসা: ১১০)
ধাপ ৩: বেদ্বীন ছেলের সাথে বিয়ের ইচ্ছা পরিত্যাগ করুন
এটি আপনার মা-খালাদের আপত্তির মূল কারণ। ইসলামও এতে সম্মত নয়। বেদ্বীন ছেলের সাথে বিয়ে আপনার দ্বীন ও আখিরাত নষ্ট করবে।
ধাপ ৪: দ্বীনদার ছেলের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করুন
- পরিবারের মাধ্যমে দ্বীনদার পাত্র খুঁজুন
- মসজিদের ইমাম, দ্বীনদার আত্মীয়, বিশ্বস্ত লোকদের সহায়তা নিন
- পাত্রের দ্বীন, চরিত্র, নামাজ-রোজা যাচাই করুন
ধাপ ৫: মা-খালাদের সাথে সদাচরণ করুন
তারা বেদ্বীন ছেলের ব্যাপারে আপত্তি করছেন — এতে তারা সঠিক। তাদের কথা মানুন। তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না।
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
ধাপ ৬: অভিভাবক ছাড়া বিয়ে করবেন না
হানাফি মাজহাবে প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজে বিয়ের চুক্তি করতে পারেন, তবে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করা সামাজিক ও পারিবারিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং অনেক সময় ফিতনার কারণ হয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে শুদ্ধ হলেও তা মাকরূহ ও পরিত্যাজ্য। — (আল-হিদায়া: ১/১৮৫; রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৫)
৫. বিশেষ সতর্কতা
- আত্মীয়ের সাথে জিনা: এটি দ্বিগুণ গুনাহ — জিনা + আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট। এ থেকে অবশ্যই তাওবা করতে হবে।
- গোপনীয়তা রক্ষা করুন: আপনার গুনাহ প্রকাশ করবেন না। রাসূল ﷺ বলেন:
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ — (সহীহ মুসলিম: ২৫৯০)
- বেদ্বীন ছেলের সাথে জেদ করবেন না: এটি আপনার দ্বীন ও দুনিয়া দুটোই নষ্ট করবে।
- ধৈর্য ধরুন: আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, তিনি উত্তম ব্যবস্থা করে দেবেন।
৬. দোয়া
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي "হে আমার রব! আমি নিজের উপর জুলুম করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।"
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، وَطَهِّرْ قَلْبِي، وَحَصِّنْ فَرْجِي
উপসংহার
- জিনা এখনই বন্ধ করুন — এটাই প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।
- খাঁটি তাওবা করুন — আল্লাহ ক্ষমাশীল।
- বেদ্বীন ছেলের সাথে বিয়ের ইচ্ছা বাদ দিন — ইসলাম এ অনুমতি দেয় না।
- দ্বীনদার পাত্রের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করুন — পরিবারের সহায়তায়।
- মা-খালাদের কথা মানুন — তারা আপনার কল্যাণই চান।
- অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করবেন না — এটি ফিতনার কারণ।
আল্লাহ তাআলা আপনার তাওবা কবুল করুন, আপনাকে জিনা থেকে হেফাজত করুন এবং দ্বীনদার জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।