সলাতের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে আর বাচ্চা কাঁদছে কী করব?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 5951
Questioner: Salma Akter
Question Asked: 25 Sep 2026, 09:22 PM
Reviewed & Published: 25 Sep 2026, 09:34 PM
Views: 14
Tokens: 3,624
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কখনো যদি এমন হয় যে সলাতের ওয়াক্ত শেষের দিকে থাকে এবং এদিকে দুধের শিশু ক্ষুধায় কান্নাকাটি করছে তখন কি করনীয়? সলাত আদায় নাকি শিশুকে দুগ্ধদান?

Answer

সলাতের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার উপক্রম হলে এবং দুধের শিশু কাঁদলে করণীয় কী?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: কখনো যদি এমন হয় যে সলাতের ওয়াক্ত শেষের দিকে থাকে এবং এদিকে দুধের শিশু ক্ষুধায় কান্নাকাটি করছে — তখন করণীয় কী? সলাত আদায় করবেন, নাকি শিশুকে দুগ্ধদান করবেন?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

মূল নীতি: সলাতের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রথমে সলাত আদায় করা কর্তব্য; শিশুকে দুগ্ধদান সলাতের পরে করা যাবে। তবে যদি শিশুর জীবননাশের বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে সংক্ষেপে শিশুকে দুধ খাইয়ে (বা সামলে রেখে) দ্রুত সলাত আদায় করা জায়েয — কারণ জীবন রক্ষা করা সলাতের ওয়াক্তের চেয়েও অগ্রাধিকারযোগ্য।


বিস্তারিত আলোচনা

১. সলাতের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সলাত অগ্রাধিকার

ইসলামে সলাত নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ। ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেলে সলাত কাযা হয়ে যায়, যা গুরুতর গুনাহ। তাই ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে শিশুকে দুধ খাওয়ানো পরেও সলাত আদায় করা যাবে, কিন্তু সলাত কাযা করা যাবে না।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا

"নিশ্চয়ই সলাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।" — (সূরা আন-নিসা: ১০৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ لِلصَّلَاةِ أَوَّلًا وَآخِرًا، وَإِنَّ أَوَّلَ وَقْتِ الظُّهْرِ حِينَ تَزُولُ الشَّمْسُ، وَآخِرَ وَقْتِهَا حِينَ يَدْخُلُ وَقْتُ الْعَصْرِ

"নিশ্চয়ই সলাতের প্রথম ও শেষ সময় আছে..." — (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৫১; সহীহ)

ফিকহী সিদ্ধান্ত: ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সলাত অবশ্যই আগে আদায় করতে হবে। শিশুকে দুধ খাওয়ানো সলাতের পরে করা যাবে, কারণ শিশু কিছুক্ষণ কাঁদলেও সাধারণত তার জীবননাশ হয় না, কিন্তু সলাত কাযা হলে তা আল্লাহর হক নষ্ট হয়।

২. যদি শিশুর জীবননাশের বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে

যদি শিশুর অবস্থা এমন হয় যে সে দুধ না পেলে মারাত্মক ক্ষতি হবে বা মৃত্যুর আশঙ্কা আছে (যেমন: অসুস্থ শিশু, অতিরিক্ত দুর্বল, বা চিকিৎসকের সতর্কতা), তাহলে ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো:

"দরূরাত (প্রয়োজনীয়তা) নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে।" — (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইমাম সুয়ূতী)

এবং "জীবন রক্ষা করা" শরীয়তের অন্যতম মাকাসিদ (উদ্দেশ্য)। তাই এমন অবস্থায়:

  1. সংক্ষেপে শিশুকে দুধ খাইয়ে বা কারো কোলে দিয়ে সামলে নিয়ে,
  2. দ্রুত সলাত আদায় করা — এটাই সমাধান।

এক্ষেত্রে সলাত আদায়ে বিলম্ব হবে না, বরং শিশুর জীবন রক্ষার পর সলাত আদায় করা হবে। যদি ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়, তাহলে কাযা পড়তে হবে — তবে এই অবস্থায় কাযা করার গুনাহ হবে না, কারণ এটি শরীয়ত অনুমোদিত ওজর (বৈধ কারণ)।

৩. হানাফী মাযহাবের দলিল

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এর নীতি হলো: সলাতের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে অন্য সব কাজ পিছিয়ে দিয়ে সলাত আদায় করা ওয়াজিব।

ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে বলেন:

"যদি ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে সলাত ছাড়া অন্য কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া জায়েয নয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫০-এর কাছাকাছি)

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:

"যদি সলাতের ওয়াক্ত সংকীর্ণ হয়ে যায়, তাহলে সলাত আদায় করা অগ্রাধিকারযোগ্য; অন্য কাজ পরে করা যাবে।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১)

৪. ব্যবহারিক সমাধান

| অবস্থা | করণীয় | |---|---| | শিশু কাঁদছে, কিন্তু জীবননাশের আশঙ্কা নেই | প্রথমে সলাত আদায় করুন, তারপর দুধ দিন | | শিশুর জীবননাশের বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা | সংক্ষেপে দুধ খাইয়ে বা সামলে রেখে দ্রুত সলাত আদায় করুন | | ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে এমন আশঙ্কা | সলাত কাযা পড়ুন, তবে ওজর থাকলে গুনাহ নেই | | শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় সলাতের ওয়াক্ত শুরু হয়েছে | সলাত আগে, তারপর দুধ |

৫. মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া

ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ আছে:

"যদি সলাতের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা হয় এবং শিশু কাঁদে, তাহলে সলাত আদায় করা অগ্রাধিকারযোগ্য। তবে শিশুর জীবননাশের আশঙ্কা থাকলে সংক্ষেপে দুধ খাইয়ে সলাত আদায় করা জায়েয।" — (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, সলাত অধ্যায়)

৬. মা'আরিফুল কুরআনে ইমাম মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ সূরা আন-নিসার ১০৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

"সলাতের ওয়াক্ত নির্দিষ্ট; ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আগে সলাত আদায় করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। তবে শরীয়তের ওজর থাকলে (যেমন: শিশুর জীবননাশের আশঙ্কা) বিলম্ব করা যায়।" — (মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ২, পৃ. ৪০০-এর কাছাকাছি)


উপসংহার

  1. সাধারণ অবস্থায়: সলাতের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রথমে সলাত আদায় করুন, তারপর শিশুকে দুধ দিন।
  2. বিশেষ অবস্থায়: শিশুর জীবননাশের বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সংক্ষেপে দুধ খাইয়ে বা সামলে রেখে দ্রুত সলাত আদায় করুন।
  3. ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেলে: কাযা পড়ুন; ওজর থাকলে গুনাহ নেই।
  4. মূলনীতি: আল্লাহর হক (সলাত) এবং বান্দার হক (শিশুর জীবন) — উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা; তবে জীবন রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

তথ্যসূত্র:

  • সূরা আন-নিসা: ১০৩
  • সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৫১
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ১
  • ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১
  • ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী), খণ্ড ২
  • আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর (ইমাম সুয়ূতী)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.