পরিবারের সবার পক্ষ থেকে দান করার নিয়ত জায়েজ আছে কিনা?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
নিয়ত- আমার, আমার পরিবার, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যকার জীবিত এবং মৃত সবার পক্ষ থেকে এই দান করলাম।
Answer
রাস্তায় সাহায্য চাওয়া ব্যক্তি ও মসজিদে দানের সময় পরিবার, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে নিয়ত করার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চান—রাস্তায় সাহায্য প্রার্থী কাউকে বা মসজিদে টাকা দান করার সময় যদি মনে মনে এই নিয়ত করেন যে, "আমার, আমার পরিবার, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যকার জীবিত ও মৃত সবার পক্ষ থেকে এই দান করলাম"—তাহলে এই নিয়ত শুদ্ধ হবে কি না?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, এই নিয়ত শুদ্ধ হবে এবং তা বৈধ।
১. জীবিতদের পক্ষ থেকে দান: জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার অজান্তে বা অনুমতি ছাড়া দান করলে—যদি তা নফল সদকা হয়, তবে তা বৈধ। তবে উত্তম হলো তাদের অনুমতি নেওয়া বা জানিয়ে দেওয়া।
২. মৃতদের পক্ষ থেকে দান: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং তা মৃতের কাছে পৌঁছায়। এটি সর্বসম্মতভাবে বৈধ।
৩. নিয়ত মনে মনে করা: নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা শর্ত নয়; মনে মনে সংকল্প করাই যথেষ্ট। তবে নিয়ত একক হওয়া উচিত—অর্থাৎ একটি দানকে একাধিক উদ্দেশ্যে ভাগ করা যাবে না, বরং পুরো দানটি সবার পক্ষ থেকে করা যাবে।
কুরআন ও হাদীসের দলিল
১. মৃতদের পক্ষ থেকে দান করার দলিল
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، وَعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ»
অর্থ: "মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া: (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) এমন ইলম যা থেকে উপকৃত হওয়া যায়, (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।"
— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৩১
এই হাদীস প্রমাণ করে যে, মৃত ব্যক্তির কাছে সদকার সওয়াব পৌঁছায়।
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল:
«إِنَّ أُمِّي مَاتَتْ وَلَمْ تُوصِ، وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ لَتَصَدَّقَتْ، فَهَلْ لَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا؟ قَالَ: نَعَمْ»
অর্থ: "আমার মা মারা গেছেন এবং কোনো অসিয়ত করেননি। আমার ধারণা, তিনি যদি কথা বলতে পারতেন তবে সদকা করতেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তার সওয়াব হবে?" রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: "হ্যাঁ।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০০৪
২. জীবিতদের পক্ষ থেকে দান
জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার অজান্তে নফল সদকা করা জায়েয। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"সদকা এমন একটি ইবাদত যা দাতা নিজের পক্ষ থেকেও করতে পারে এবং অন্যের পক্ষ থেকেও করতে পারে।"
— ইবনুল কাইয়্যিম, "আর-রূহ", পৃ. ১৪২
তবে শাইখ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার অনুমতি ছাড়া দান করা জায়েয, তবে উত্তম হলো তার অনুমতি নেওয়া বা তাকে জানিয়ে দেওয়া।"
— ইবন উসাইমীন, "ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব", ক্যাসেট নং ২৩০
৩. নিয়ত মনে মনে করার বিধান
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى»
অর্থ: "নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৭
নিয়ত মনে মনে করাই যথেষ্ট; মুখে বলা শর্ত নয়। ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"নিয়ত হলো হৃদয়ের কাজ। মুখে উচ্চারণ করা সুন্নাহ নয়, বরং তা বিদআত।"
— ইবন তাইমিয়্যাহ, "মাজমুউল ফাতাওয়া", ১০/৪৬৭
গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিষয়
১. একটি দান একাধিক উদ্দেশ্যে ভাগ করা যাবে কি?
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যদি কেউ একটি দান করে এবং নিয়ত করে যে এটি তার নিজের, তার পরিবার, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে—তবে এই নিয়ত শুদ্ধ। কারণ সদকা একটি ইবাদত যা একাধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে আদায় করা যায়। তবে সওয়াব ভাগ হবে কি না, তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন।"
— ইবন উসাইমীন, "লিকাউল বাবিল মাফতূহ", ১৪/১৪
২. মৃতদের পক্ষ থেকে দান করার সময় বিশেষ লক্ষণীয়
শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা করা জায়েয এবং তা তার কাছে পৌঁছায়। এটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত মত।"
— ইবন বায, "মাজমুউল ফাতাওয়া", ৪/৩৪৮
৩. মসজিদে দান করার সময়
মসজিদে দান করার সময় যদি নিয়ত হয় যে এটি মসজিদের জন্য, তবে তা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। আর যদি নিয়ত হয় যে এটি পরিবার-পরিজন ও মৃতদের পক্ষ থেকে, তবে তা-ও বৈধ এবং সওয়াব পৌঁছাবে।
শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"মসজিদে দান করা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকেও করা যায়।"
— আল-আলবানী, "সিলসিলাতুল আহাদীস আস-সহীহা", হাদীস নং ১৬৩১-এর তাহকীক
সতর্কতা
১. নিয়ত একক হওয়া: একটি দানকে যদি একাধিক উদ্দেশ্যে ভাগ করা হয়, তবে সওয়াবও ভাগ হতে পারে। তাই উত্তম হলো—প্রতিটি দান আলাদা আলাদা নিয়তে করা, অথবা পুরো দানটি সবার পক্ষ থেকে করা।
২. জীবিতদের অনুমতি: জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান করার সময় যদি সম্ভব হয়, তবে তার অনুমতি নেওয়া উত্তম। বিশেষ করে যদি তা ওয়াজিব (যেমন যাকাত) হয়, তবে অনুমতি ছাড়া দেওয়া যাবে না।
৩. মৃতদের জন্য দুআ: মৃতদের জন্য দুআ করাও সদকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ...»
— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৩১
উপসংহার
প্রশ্নে উল্লিখিত নিয়ত শুদ্ধ এবং বৈধ। রাস্তায় সাহায্য প্রার্থীকে বা মসজিদে দান করার সময় যদি মনে মনে নিয়ত করা হয় যে—"আমার, আমার পরিবার, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যকার জীবিত ও মৃত সবার পক্ষ থেকে এই দান করলাম"—তবে তা জায়েয। মৃতদের পক্ষ থেকে সদকা করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং তা তাদের কাছে পৌঁছায়। জীবিতদের পক্ষ থেকে দান করাও বৈধ, তবে উত্তম হলো তাদের অনুমতি নেওয়া বা জানিয়ে দেওয়া।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
রেফারেন্স
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১, ১৩৮৮
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০০৪, ১৬৩১, ১৯০৭
- ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১০/৪৬৭
- ইবনুল কাইয়্যিম, আর-রূহ, পৃ. ১৪২
- ইবন বায, মাজমুউল ফাতাওয়া, ৪/৩৪৮
- ইবন উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব, ক্যাসেট নং ২৩০
- ইবন উসাইমীন, লিকাউল বাবিল মাফতূহ, ১৪/১৪
- আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীস আস-সহীহা, হাদীস নং ১৬৩১