নেশা অবস্থায় দোয়া করা যাবে কি? গাজা খাওয়ার পর বিবেক লোপ না পেলে খাবারের দোয়া, সহবাসের দোয়া, টয়লেটের দোয়া করা জায়েজ কি না
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: গাজা খাওয়ার পর বিবেক পুরোপুরি লোপ পায় না। নেশা অবস্থায় যদি সঠিকভাবে খাবারের দোয়া, সহবাসের দোয়া, টয়লেটে যাওয়ার দোয়া সহ অন্যান্য দোয়া করতে পারি, তাহলে দোয়া করা যাবে কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, নেশার অবস্থায় যদি বিবেক-বুদ্ধি সম্পূর্ণ লোপ না পায় এবং আপনি সঠিকভাবে দোয়াগুলো পড়তে পারেন, তাহলে দোয়া করা যাবে। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:
১. নেশা অবস্থায় নামাজ-ইবাদতের হুকুম: নেশা এমন অবস্থা যেখানে বিবেক আংশিক বা সম্পূর্ণ লোপ পায়। যদি নেশার কারণে কথা-বার্তা ও কাজকর্মে অসংলগ্নতা দেখা দেয়, তাহলে সেই অবস্থায় নামাজ পড়া মাকরুহে তাহরিমি। হাদিসে এসেছে:
«لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ» — (সূরা নিসা: ৪৩)
অর্থাৎ, "তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা জানতে পারো যা বলছো।"
২. দোয়ার ক্ষেত্রে: দোয়া হলো আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন। যদি নেশার কারণে দোয়ার অর্থ ও মর্ম উপলব্ধি না হয়, তবে দোয়ার সওয়াব কমে যায়। কিন্তু যদি বিবেক ঠিক থাকে এবং সঠিকভাবে দোয়া পড়া যায়, তাহলে দোয়া করা জায়েজ। তবে উত্তম হলো নেশামুক্ত অবস্থায় দোয়া করা।
৩. খাবারের দোয়া, সহবাসের দোয়া, টয়লেটের দোয়া: এই দোয়াগুলো সুন্নত। নেশার অবস্থায় যদি এগুলো সঠিকভাবে পড়া যায়, তাহলে পড়া যাবে। কিন্তু নেশার কারণে যদি ভুল হয় বা মনোযোগ না থাকে, তাহলে সুন্নতের সওয়াব পাওয়া যাবে না।
৪. গাজা (ভাং/গাঁজা) খাওয়ার হুকুম: গাজা বা ভাং খাওয়া নিজেই ইসলামে নিষিদ্ধ (হারাম), কারণ এটি নেশা সৃষ্টি করে এবং বিবেককে আচ্ছন্ন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ» — (সূরা মায়িদা: ৯০)
অর্থাৎ, "হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ» — (সহিহ বুখারি: ৫৫৮৬)
অর্থাৎ, "প্রত্যেক নেশাদায়ক বস্তু হারাম।"
৫. উপসংহার:
- নেশা অবস্থায় দোয়া করা জায়েজ, যদি বিবেক ঠিক থাকে এবং সঠিকভাবে পড়া যায়।
- তবে নেশা নিজেই হারাম, তাই এটি থেকে বিরত থাকা ফরজ।
- নেশার অবস্থায় নামাজ পড়া মাকরুহে তাহরিমি, তাই নামাজের জন্য নেশা কেটে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।
- উত্তম হলো নেশা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা এবং সুস্থ অবস্থায় ইবাদত-বন্দেগি করা।
আরবি দোয়াগুলোর উদাহরণ:
খাবারের দোয়া:
«بِسْمِ اللَّهِ وَعَلَى بَرَكَةِ اللَّهِ» — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৭৬৭)
সহবাসের দোয়া:
«بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا» — (সহিহ বুখারি: ৬৩৮৮)
টয়লেটে যাওয়ার দোয়া:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ» — (সহিহ বুখারি: ১৪২)
তথ্যসূত্র:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪০৫ (নেশার হুকুম)
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৭৬
- বাহিশতী জেওর, পৃষ্ঠা ৪৫৬
- মাআরিফুল কুরআন, সূরা নিসা: ৪৩-এর তাফসির
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।