নেশা অবস্থায় খাবারের দোয়া, সহবাসের দোয়া, টয়লেটের দোয়া ও অন্যান্য দোয়া পড়া যাবে কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5917
Questioner: Saiful Islam
Question Asked: 24 Sep 2026, 07:19 PM
Reviewed & Published: 24 Sep 2026, 07:26 PM
Views: 17
Tokens: 3,353
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।নেশা অবস্থায় খাবারের দোয়া সহবাসের দোয়া, টয়লেটে যাবার দোয়া সহ অন্যন্য দোয়া করা যাবে কি?

Answer

নেশা অবস্থায় দোয়া পড়ার বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—নেশার অবস্থায় খাবারের দোয়া, সহবাসের দোয়া, টয়লেটে প্রবেশের দোয়া এবং অন্যান্য দোয়া পড়া যাবে কি না?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, নেশার অবস্থায় কোনো দোয়া পড়া জায়েয নয়। কারণ নেশা অবস্থায় ব্যক্তির আকেল (বিবেকবান) থাকা থাকে না, আর দোয়া হলো ইবাদত—যা পূর্ণ চেতনা ও পবিত্রতা দাবি করে। তবে এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিস্তারিত বিধান নিচে দেওয়া হলো।


বিস্তারিত আলোচনা

১. নেশা (মাদকতা) কী এবং এর হুকুম

ইসলামে মাদকতা সৃষ্টিকারী সব কিছু (মদ, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল ইত্যাদি) হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।"

সূরা আল-মায়িদা: ৯০

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ

"প্রত্যেক নেশাদায়ক বস্তু হারাম।"

সহীহ বুখারী: ৫৫৮৬; সহীহ মুসলিম: ২০০৩

২. নেশা অবস্থায় দোয়া পড়ার হুকুম

ফকীহগণের সর্বসম্মত মত হলো—নেশার অবস্থায় দোয়া-যিকির করা জায়েয নয়, বিশেষত যখন নেশার কারণে বিবেক লোপ পায় বা কথা-বার্তা এলোমেলো হয়ে যায়। কারণসমূহ:

(ক) কুরআন পড়ার নিষেধাজ্ঞা: আল্লাহ তা'আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা জানতে পারো যা তোমরা বলছো।"

সূরা আন-নিসা: ৪৩

এই আয়াত প্রমাণ করে—নেশার অবস্থায় যা বলা হয়, তার জ্ঞান থাকে না; আর দোয়া-যিকিরের জন্য জ্ঞান ও উপস্থিত হৃদয় শর্ত।

(খ) দোয়া হলো ইবাদত: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ

"দোয়া হলো ইবাদত।"

সুনানে তিরমিযী: ৩৩৭২; সুনানে আবু দাউদ: ১৪৭৯

আর ইবাদতের জন্য পবিত্রতা ও পূর্ণ চেতনা আবশ্যক। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি এ শর্ত পূরণ করে না।

(গ) হাদাস (অপবিত্রতা) ও নেশার সমন্বয়: নেশার কারণে মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয়, যা ফেরেশতাদের কষ্ট দেয়। হাদীসে এসেছে:

مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الْبَقْلَةِ فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا

"যে ব্যক্তি এই গাছ (রসুন/পিয়াজ) খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকট না আসে।"

সহীহ বুখারী: ৮৫৫

তাহলে মাদকের মতো ঘৃণিত বস্তুর অবস্থায় দোয়া পড়া তো আরও নিষিদ্ধ।

৩. নির্দিষ্ট দোয়াগুলোর বিধান

| দোয়া | নেশা অবস্থায় হুকুম | |---|---| | খাবারের দোয়া (বিসমিল্লাহ, শেষে আলহামদুলিল্লাহ) | জায়েয নয়; খাবারও হারাম নয়, তবে দোয়া পড়া যাবে না | | সহবাসের দোয়া | জায়েয নয়; সহবাসও নেশা অবস্থায় মাকরূহ তাহরীমী | | টয়লেটে প্রবেশ/বাহিরের দোয়া | জায়েয নয় | | ঘুমের দোয়া, জাগরণের দোয়া | জায়েয নয় | | যেকোনো যিকির-তাসবীহ | জায়েয নয় |

তবে হ্যাঁ, যদি নেশা এতটা হালকা হয় যে বিবেক-বুদ্ধি সম্পূর্ণ অটুট থাকে এবং কথা-বার্তা স্বাভাবিক থাকে—তবুও মাদক হারাম হওয়ার কারণে তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। আর এমন অবস্থায় দোয়া পড়লে তা কবুল হওয়ার আশা কম; বরং তাওবা করা কর্তব্য।

৪. হানাফী ফিকহের দলিল

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:

وَالْمُرَادُ بِالسُّكْرِ زَوَالُ الْعَقْلِ

"নেশা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—আকেল (বিবেক) লোপ পাওয়া।"

রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৯৩

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে এসেছে:

لَا تَجُوزُ قِرَاءَةُ الْقُرْآنِ وَالذِّكْرُ لِلسَّكْرَانِ

"নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য কুরআন পাঠ ও যিকির করা জায়েয নয়।"

ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫০

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"নেশার অবস্থায় ইবাদত-বন্দেগী কবুল হয় না; বরং তা আরও গুনাহ। কারণ নেশা নিজেই হারাম, আর হারাম অবস্থায় ইবাদত করা আল্লাহর আদেশের পরিপন্থী।"

ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৪৫৬

৫. করণীয়

১. অবিলম্বে তাওবা করুন—মাদক ছাড়ুন, কারণ তা সব ইবাদতের মূল প্রতিবন্ধক। ২. নেশা ছাড়া অবস্থায় সব দোয়া যথাযথভাবে পড়ুন। ৩. নেশার অবস্থায় দোয়া পড়া থেকে বিরত থাকুন; বরং চুপ থাকুন ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। ৪. সহবাস নেশা অবস্থায় করলে সন্তান জন্মালে তার চরিত্রে কুপ্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে—তাই এ থেকে বেঁচে থাকুন। ৫. চিকিৎসা নিন—মাদক ছাড়ার জন্য ডাক্তারি ও দ্বীনি সহায়তা নিন।


সারসংক্ষেপ

  • নেশা হারাম; নেশার অবস্থায় দোয়া পড়া জায়েয নয়।
  • খাবার, সহবাস, টয়লেটসহ সব দোয়া নেশা অবস্থায় পড়া যাবে না।
  • কারণ: আকেল লোপ পাওয়া, পবিত্রতার অভাব, এবং দোয়া ইবাদত হওয়া।
  • করণীয়: তাওবা, মাদক ত্যাগ, এবং সুস্থ অবস্থায় দোয়া পড়া।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.