যিকির-তাসবীহের প্রতিযোগিতা কি জায়েজ?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
তাসবীহ-যিকিরের প্রতিযোগিতা (Competition) কি জায়েজ?
প্রশ্ন: তাসবীহ-যিকিরের প্রতিযোগিতা করা কি জায়েজ?
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
যিকির-তাসবীহের প্রতিযোগিতা করা মূলত জায়েজ, তবে শর্তসাপেক্ষে। যদি প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য হয় মানুষকে যিকিরের প্রতি উৎসাহিত করা, যিকিরের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা এবং দ্বীনি আমলে আগ্রহ বাড়ানো — তাহলে তা জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। কিন্তু যদি এতে রিয়া (লোক দেখানো), অহংকার, দুনিয়াবি পুরস্কারের লোভে যিকির করা, কিংবা যিকিরকে খেলা-তামাশার মতো করা হয় — তাহলে তা নাজায়েজ।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মূলনীতি: প্রতিযোগিতা নিজে জায়েজ
শরীয়তের দৃষ্টিতে দ্বীনি বিষয়ে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিষিদ্ধ নয়; বরং কুরআন-হাদীসে নেক কাজে প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ "তোমরা নেক কাজে প্রতিযোগিতা করো।" (সূরা আল-বাকারা: ১৪৮; সূরা আল-মায়িদা: ৪৮)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَفِي ذَٰلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ "এবং এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।" (সূরা আল-মুতাফফিফীন: ২৬)
২. যিকিরের ফযীলত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ "দুটি বাক্য জিহ্বার জন্য হালকা, আমলের পাল্লায় ভারী, দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রিয় — সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম।" (সহীহ বুখারী: ৬৬৮২; সহীহ মুসলিম: ২৬৯৪)
যেহেতু যিকির অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ ইবাদত, তাই মানুষকে যিকিরে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করা মূলত জায়েজ।
৩. শর্তসমূহ
যিকিরের প্রতিযোগিতা জায়েজ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক:
-
এখলাস (নিষ্ঠা): প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষকে যিকিরে উৎসাহিত করা — পুরস্কার বা প্রশংসা পাওয়া নয়।
-
রিয়া থেকে মুক্ত থাকা: প্রতিযোগিতায় যিকির করা যেন লোক দেখানোর জন্য না হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ، قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الرِّيَاءُ "তোমাদের উপর আমি যে বিষয়টির সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো শিরকে আসগার (ছোট শিরক)। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! শিরকে আসগার কী? তিনি বললেন: রিয়া (লোক দেখানো)।" (মুসনাদ আহমাদ: ২৩৬৩০; মুসনাদে বাযযার)
-
যিকিরের আদব রক্ষা: যিকির যেন খেলা-তামাশা বা গানের মতো না হয়; বরং ভয়-ভক্তি, ধীরস্থিরতা ও মনোযোগের সাথে হতে হবে।
-
সংখ্যা গণনায় বাড়াবাড়ি না করা: শুধু সংখ্যা বেশি করার প্রতিযোগিতা যেন যিকিরের গুণগত মান ও একাগ্রতা নষ্ট না করে।
-
পুরস্কার হালাল হওয়া: পুরস্কার হালাল সম্পদ থেকে হতে হবে; হারাম বা সুদি টাকা থেকে নয়।
-
নামাজ-ফরজ ইবাদতের ক্ষতি না হওয়া: প্রতিযোগিতার কারণে ফরজ ইবাদত, নামাজ, কুরআন শিক্ষা ইত্যাদি অবহেলিত না হয়।
৪. ফকীহগণের মত
হানাফী ফকীহগণ দ্বীনি বিষয়ে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন যে, দ্বীনি শিক্ষা ও ইবাদতে উৎসাহ প্রদানের জন্য পুরস্কার দেওয়া জায়েজ, যদি তা রিয়া ও অপচয় থেকে মুক্ত হয়।
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওয়ার"-এ যিকির-আযকারের আদব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, যিকির হবে একাগ্রতা ও বিনয়ের সাথে; প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে নয়।
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানী"-তে উল্লেখ করেছেন যে, দ্বীনি আমলে উৎসাহ সৃষ্টির জন্য প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার দেওয়া জায়েজ, তবে তা যেন ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য (আল্লাহর সন্তুষ্টি) নষ্ট না করে।
৫. সতর্কতা
- যদি প্রতিযোগিতার কারণে যিকির শুধু পুরস্কার পাওয়ার জন্য করা হয় এবং যিকিরের সময় রিয়া হয়, তাহলে তা নাজায়েজ।
- যদি প্রতিযোগিতা এমনভাবে হয় যে, যিকিরকে হালকাভাবে নেওয়া হয় বা সংখ্যা বাড়ানোর জন্য দ্রুত ও অস্পষ্টভাবে পড়া হয়, তাহলে তা মাকরূহ।
- মসজিদে বা দ্বীনি মাহফিলে যিকিরের প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে, তবে তা যেন ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট না করে।
উপসংহার
যিকির-তাসবীহের প্রতিযোগিতা মূলত জায়েজ, যদি তা এখলাসের সাথে, রিয়া থেকে মুক্ত হয়ে, যিকিরের আদব রক্ষা করে এবং মানুষকে যিকিরে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়। তবে রিয়া, অহংকার, খেলা-তামাশা বা শুধু পুরস্কারের লোভে হলে তা নাজায়েজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এখলাসের সাথে যিকির করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
তথ্যসূত্র:
- সূরা আল-বাকারা: ১৪৮
- সূরা আল-মুতাফফিফীন: ২৬
- সহীহ বুখারী: ৬৬৮২
- সহীহ মুসলিম: ২৬৯৪
- মুসনাদ আহমাদ: ২৩৬৩০
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)
- বেহেশতী জেওয়ার (আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
والله أعلم بالصواب