ওয়েবসাইটে ক্লায়েন্টের দেওয়া নারীদের ছবি বা ছেলে-মেয়ের মিশ্র ছবি বসানো কি হারাম?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5819
Questioner: Md Maruf
Question Asked: 22 Sep 2026, 04:00 PM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 05:32 PM
Views: 12
Tokens: 5,690
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

”আসসালামু আলাইকুম,, আমি একজন ফ্রিল্যান্সার আমি ওয়েবসাইট তৈরি করি । তো সেক্ষেত্রে ওয়েবসাইটের ভিতরে আমাকে ক্লায়েন্টের দেয়া ইমেজ ইউজ করতে হয় । ইমেজ গুলো আমি তৈরি করিনা । ইমেজ গুলো ক্লাইন্ট আমাকে দেয় আমি শুধু ওয়েবসাইটে বসিয়ে দেই । তো দেখা যায় কখনো ছেলেদের ছবি কখনো মেয়েদের ছবি বা কখনো ছেলে মেয়ে উভয়ের ছবি বসানো লাগতেছে । তো সেক্ষেত্রে এটা কি হারাম হবে কিনা ।" আর যদি হারাম হয়েও থাকে সেক্ষেত্রে কি করতে পারি ????

Answer

ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টে ক্লায়েন্টের দেওয়া ছবি ব্যবহারের হুকুম

উত্তর (সংক্ষেপে):

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি: ১. ক্লায়েন্টের দেওয়া ছবি (বিশেষত নারীদের ছবি বা ছেলে-মেয়ের মিশ্র ছবি) ওয়েবসাইটে বসানো কি হারাম? ২. হারাম হলে বিকল্প কী?

সংক্ষিপ্ত ফতোয়া: ছবি যদি প্রাণীর (বিশেষত মানুষের) জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয় এবং তা প্রদর্শনযোগ্য (দৃশ্যমান) হয়, তবে তা ওয়েবসাইটে বসানো নাজায়েজ। বিশেষত নারীদের ছবি (যা পর্দার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক) এবং বেগানা নারী-পুরুষের মিশ্র ছবি সম্পূর্ণ হারাম। তবে কিছু ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ছাড় রয়েছে — নিচে বিস্তারিত।


১. ছবি সংক্রান্ত মূল বিধান (হানাফি ফিকহ)

ক. প্রাণীর ছবি তৈরি ও ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ» "কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে ছবি নির্মাতারা।" — সহিহ বুখারি: ৫৯৫০; সহিহ মুসলিম: ২১০৯

আরও ইরশাদ হয়েছে:

«كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ، يُجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا نَفَسًا فَيُعَذَّبُ بِهَا فِي جَهَنَّمَ» "প্রত্যেক ছবি নির্মাতা জাহান্নামে যাবে; তার তৈরি প্রতিটি ছবির বিনিময়ে একটি প্রাণ সৃষ্টি করা হবে, যা দ্বারা তাকে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হবে।" — সহিহ মুসলিম: ২১১০

তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: ছবি তৈরি করা (tasweer) এবং ব্যবহার করা (iste'mal) — দুটি আলাদা বিষয়। যে ব্যক্তি ছবি তৈরি করে না, শুধু ক্লায়েন্টের দেওয়া ছবি ওয়েবসাইটে বসায়, সে সরাসরি "মুসাওবির" (ছবি নির্মাতা) নয়; কিন্তু সে গুনাহের কাজে সহায়তা করছে কি না — এটাই মূল প্রশ্ন।

খ. ছবি ব্যবহারের বিধান — ইবনে আবিদিনের বক্তব্য

ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:

"وَالْحَاصِلُ أَنَّ التَّصْوِيرَ حَرَامٌ، وَاسْتِعْمَالَ الْمُصَوَّرِ حَرَامٌ إلَّا لِضَرُورَةٍ" "মোটকথা, ছবি তৈরি করা হারাম এবং তৈরি ছবি ব্যবহার করাও হারাম, তবে প্রয়োজনে ছাড় রয়েছে।" — রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৪ (দারুল মা'রিফা)

ইমাম তাহতাবি ও অন্যান্য হানাফি ফুকাহা বলেন, জীবন্ত প্রাণীর ছবি যা দৃশ্যমান ও সংরক্ষিত, তা ব্যবহার নাজায়েজ। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে (যেমন: পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র, নিরাপত্তা, শিক্ষা) ছাড় আছে।


২. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিশ্লেষণ

ক. ছেলেদের ছবি (পুরুষদের ছবি)

পুরুষদের ছবি যদি সাধারণ, শালীন ও পূর্ণ পোশাকসহ হয় এবং তাতে কোনো ফিতনা বা অশ্লীলতার দিক না থাকে, তবে ওয়েবসাইটে বসানো সম্পূর্ণ হারাম নয় — তবে সতর্কতা জরুরি। কারণ:

  • পুরুষের ছবি নিজে দেখা সাধারণত নাজায়েজ নয় (মহরম-নন-মহরম বিবেচনায়)।
  • কিন্তু ছবি তৈরি ও সংরক্ষণ করার মূল নিষেধাজ্ঞা এখানেও প্রযোজ্য।
  • যদি ছবিতে কোনো অশ্লীলতা, ফিতনা বা অসম্মানজনক দিক থাকে — তবে হারাম।

খ. নারীদের ছবি — এটাই সবচেয়ে গুরুতর

নারীর ছবি ওয়েবসাইটে বসানো সম্পূর্ণ হারাম। কারণ:

১. পর্দার বিধান লঙ্ঘন: আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا﴾ "মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখুক এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করুক; আর নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করুক..." — সূরা আন-নূর: ৩১

২. ফিতনার কারণ: নারীর ছবি পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা ফিতনা সৃষ্টি করে। রাসূল ﷺ বলেছেন:

«مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ» "আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।" — সহিহ বুখারি: ৫০৯৬; সহিহ মুসলিম: ২৭৪০

৩. ছবি + নারী = দ্বিগুণ নিষেধাজ্ঞা: ছবি তো হারামই, তার উপর নারীর ছবি তো আরও বেশি হারাম।

গ. ছেলে-মেয়ের মিশ্র ছবি

এটি সর্বাধিক হারাম। কারণ:

  • ছবির নিষেধাজ্ঞা
  • নারীর ছবির নিষেধাজ্ঞা
  • বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার দৃশ্য (খালওয়া ও ইখতিলাতের নিষেধাজ্ঞা)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

«لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ» "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না,除非 তার মহরম সাথে থাকে।" — সহিহ বুখারি: ৫২৩৩


৩. "গুনাহের কাজে সহায়তা" — মূল দলিল

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾ "তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ায় পরস্পর সহায়তা করো; আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহায়তা করো না।" — সূরা আল-মায়িদা: ২

যেহেতু নারীর ছবি বা মিশ্র ছবি ওয়েবসাইটে বসানো হারাম কাজ, তাই তা বসিয়ে দেওয়া হারাম কাজে সহায়তা। ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

"الْإِعَانَةُ عَلَى الْحَرَامِ حَرَامٌ" "হারাম কাজে সহায়তা করা হারাম।" — রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯১


৪. সমাধান ও বিকল্প পথ

ক. যদি ছবি নারীদের হয় বা মিশ্র হয়:

১. ক্লায়েন্টকে বিনয়ের সাথে বুঝান: বলুন, "আমি মুসলিম হিসেবে নারীদের ছবি বা মিশ্র ছবি ওয়েবসাইটে বসাতে পারি না। আপনি চাইলে ছবির পরিবর্তে আইকন, ইলাস্ট্রেশন, ভেক্টর আর্ট, বা প্রাকৃতিক দৃশ্য ব্যবহার করতে পারেন।"

২. বিকল্প ডিজাইন প্রস্তাব করুন:

  • নারীদের ছবির জায়গায় নাম, পদবি, আইকন বা সিলুয়েট ব্যবহার
  • মিশ্র ছবির জায়গায় টিমওয়ার্ক আইকন, হ্যান্ডশেক আইকন, বা অফিসের সাধারণ দৃশ্য
  • প্রোডাক্ট/সার্ভিসের ছবি (প্রাণী নয়) — যেমন: লোগো, গ্রাফিক্স, টেক্সট

৩. শর্তসহ কাজ করুন: যদি ক্লায়েন্ট একান্তই ছবি চায়, তবে শর্ত দিন — "আমি শুধু ছবি বসানোর টেকনিক্যাল কাজ করব; ছবির বিষয়বস্তুর দায়িত্ব আপনার।" তবে এটি সম্পূর্ণ সমাধান নয়; কারণ আপনি জানেন যে এটি হারাম, তাই সহায়তা করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

৪. কাজ ছেড়ে দেওয়া: যদি ক্লায়েন্ট না মানে এবং আপনি বিকল্প না পান, তবে সে কাজটি ছেড়ে দেওয়া আপনার জন্য উত্তম। আল্লাহ বলেন:

﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا﴾ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" — সূরা আত-তালাক: ২

খ. যদি ছবি পুরুষদের হয় (শালীন):

  • সাধারণত ছাড় আছে, তবে সতর্কতা জরুরি।
  • যদি ছবিতে কোনো অশ্লীলতা, ফিতনা বা অসম্মানজনক দিক না থাকে — তবে কাজ করা যেতে পারে।
  • তবে ছবি তৈরি না করা এবং শুধু বসানো — এতে দায় কিছুটা হালকা, তবে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত নয়।

গ. সাধারণ নীতি (ফতোয়া উসমানি থেকে):

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেন:

"প্রাণীর ছবি তৈরি ও ব্যবহার সাধারণত নাজায়েজ। তবে প্রয়োজনে (যেমন: পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষা) ছাড় আছে। কিন্তু বিনোদন, বিজ্ঞাপন বা ফিতনার উদ্দেশ্যে ব্যবহার জায়েজ নয়।" — ফতোয়া উসমানি: ৩/৫৬৭ (আধুনিক সংস্করণ)


৫. চূড়ান্ত পরামর্শ

| পরিস্থিতি | হুকুম | করণীয় | |---|---|---| | নারীর ছবি | হারাম | বসাবেন না; বিকল্প দিন | | ছেলে-মেয়ের মিশ্র ছবি | হারাম | বসাবেন না; বিকল্প দিন | | পুরুষের শালীন ছবি | সাধারণত জায়েজ, তবে সতর্কতা | সতর্কতার সাথে করা যেতে পারে | | প্রাণী ছাড়া ছবি (লোগো, গ্রাফিক্স) | জায়েজ | নিশ্চিন্তে ব্যবহার করুন | | আইকন, ইলাস্ট্রেশন, ভেক্টর | জায়েজ | উৎসাহিত করুন |

সারকথা: নারীদের ছবি বা মিশ্র ছবি ওয়েবসাইটে বসানো হারাম। আপনি যেহেতু ছবি তৈরি করছেন না, শুধু বসাচ্ছেন — তবুও হারাম কাজে সহায়তা করার কারণে গুনাহ হবে। তাই ক্লায়েন্টকে বিকল্প ডিজাইন প্রস্তাব করুন; না মানলে সে কাজ ছেড়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۝ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করে না।" — সূরা আত-তালাক: ২-৩


৬. রেফারেন্স

  • সহিহ বুখারি: ৫০৯৬, ৫২৩৩, ৫৯৫০
  • সহিহ মুসলিম: ২১০৯, ২১১০, ২৭৪০
  • সূরা আন-নূর: ৩১
  • সূরা আল-মায়িদা: ২
  • সূরা আত-তালাক: ২-৩
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৬/৩৬৪, ৬/৩৯১
  • ফতোয়া উসমানি: ৩/৫৬৭
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভি): ৪/২৩০
  • ফতোয়া আলমগিরি: ৫/৩৫৬

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.