মুসলিম বিদ্বেষী দেশের হালাল পণ্য কেনার হুকুম, এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে সতরের বাইরের অঙ্গের ছবি পাঠানো যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ।
আমার তিনটি প্রশ্ন ছিল ।
১) বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি কোন দেশকে মুসলিমদের উপরে অত্যাচার করতে দেখা যায় তবে সে দেশের কোন হালাল পণ্য একজন মুসলিমের জন্য জায়েয কী না?
আমি একটি নির্দিষ্ট দেশের অতি পরিচিত ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল কিনতে চাইছিলাম । যতটুকু ইন্টারনেট ও এআই -এর সহায়তায় জেনেছি যে ঐ কোম্পানি মুসলিম বিদ্বেষী কোন অবস্থান প্রকাশ করেনি এবং তারা ঐ দেশের সেনাবাহিনীকে সরাসরি কোন আর্থিক সহায়তা করে না । আর এই মোটরসাইকেলটি মাইলেজ, দাম, অন্যান্য সুবিধা সব দিক বিবেচনায় নিকটতম বিকল্পগুলোর থেকে এগিয়ে আছে ।
এমতাবস্থায় ঐ বাইক কেনা ন্যূনতম জায়েয -এর মধ্যে পড়ে কী না?
ন্যূনতম জায়েযও যদি না হয় তবে কিনব না ।
২) এখনো কী iFatwa -তে মাসে চারটির বেশি প্রশ্ন না করার সীমাবদ্ধতা রয়েছে?
যেহেতু, AI টোকেন ক্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে সেক্ষেত্রে মাসে চারটির বেশি প্রশ্ন করা যাবে কী না?
৩) আমার সোরিয়াসিস আক্রান্ত পায়ে চুলকানোর ফলে তৈরি হওয়া ক্ষত থেকে যে নিঃসরণ ঘটে তা নাপাকীর পর্যায়ে পড়ে কী না বা ওযু ভঙ্গের কারণ হবে কী না - তা জানার উদ্দেশ্যে আমার হাটুর বেশ নিচে টাখনুর উপরে পায়ের একাংশের কয়েকটি ছবি আপনাদেরকে দেখাতে চেয়েছিলাম ৷ এভাবে সতরের বাইরে পায়ের একাংশ দেখানোটা বেয়াদবি হবে কী না - এ নিয়ে সংশয়ে আছি । আপনারা অনুমতি দিলে পরের কোন প্রশ্নের সাথে ছবিগুলো দিব, ইনশা আল্লাহ । আর আপনারা নিষেধ করে দিলে ঐ ছবিগুলো আর দিব না ।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
হামদ ও সালাতের পর:
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে প্রদান করা হলো। উত্তর প্রদানে হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের বরাত পেশ করা হয়েছে।
প্রথম প্রশ্ন: মুসলিম বিদ্বেষী বা মুসলিমদের উপর অত্যাচারকারী দেশের হালাল পণ্য কেনার হুকুম
সংক্ষিপ্ত উত্তর: শুধুমাত্র কোনো দেশের সরকার মুসলিমদের উপর অত্যাচার করছে—এই কারণে ঐ দেশের সব হালাল পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায় না। তবে যদি প্রমাণিত হয় যে, ঐ নির্দিষ্ট কোম্পানি সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীকে আর্থিক বা সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, অথবা তার লভ্যাংশ সরাসরি মুসলিমদের রক্তপাতে ব্যবহৃত হচ্ছে—তাহলে সেই নির্দিষ্ট কোম্পানির পণ্য বর্জন করা ওয়াজিব বা অন্ততপক্ষে অত্যন্ত কর্তব্য। আর যদি কোম্পানি সরাসরি সহায়তা না করে, শুধু কর প্রদানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সরকারকে সাহায্য হয়—তাহলে তা নাজায়েয নয়, তবে সতর্কতা ও বর্জন উত্তম।
বিস্তারিত:
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো—"الأصل في الأشياء الإباحة" (বস্তুসমূহে মূল হুকুম হলো বৈধতা)। কোনো বস্তু হারাম হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«الْحَلَالُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ، وَالْحَرَامُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ، وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ مِمَّا عَفَا عَنْهُ»
"হালাল হলো তা, যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে হালাল করেছেন; হারাম হলো তা, যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে হারাম করেছেন; আর যে বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন, তা তিনি ক্ষমা করেছেন।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮০০; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৭২৬)
তবে জিহাদ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শত্রুকে সাহায্য করার বিষয়ে কুরআনে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে:
﴿وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾
"পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ﴾ এবং ﴿وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا﴾
"তোমরা জালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না।" — (সূরা হুদ: ১১৩)
হানাফি ফিকহের প্রয়োগ:
১. সরাসরি সামরিক/আর্থিক সহায়তা প্রমাণিত হলে: যদি কোনো কোম্পানি সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, বা অর্থ সরবরাহ করে—তাহলে তার পণ্য ক্রয় করা নাজায়েয। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন:
"وَيَحْرُمُ بَيْعُ السِّلَاحِ لِأَهْلِ الْحَرْبِ"
"যুদ্ধরত কাফিরদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হারাম।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১)
২. পরোক্ষ সহায়তা (কর প্রদান): কর প্রদান বাধ্যতামূলক হওয়ায় তা সরাসরি সহায়তা হিসেবে গণ্য হয় না। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) "আল-আসল"-এ বলেন, কোনো মুসলিম যদি কাফির শাসকের অধীনে থেকে বাধ্যতামূলক কর দেয়, তবে তা তার জন্য গুনাহ নয়, কারণ সে বাধ্য।
৩. বহিষ্কার (Boycott) এর বিধান: মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার জন্য শত্রুপক্ষের পণ্য বর্জন করা জায়েয, বরং অনেক ক্ষেত্রে মুস্তাহাব বা ওয়াজিব। মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে উল্লেখ করেন:
"যদি প্রমাণিত হয় যে, কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে তার পণ্য বর্জন করা মুসলিমদের কর্তব্য।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২১-৪২৩)
আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব:
আপনি বলেছেন—ঐ কোম্পানি মুসলিম বিদ্বেষী কোনো অবস্থান প্রকাশ করেনি এবং সরাসরি সেনাবাহিনীকে আর্থিক সহায়তা করে না। যদি এই তথ্য যাচাইকৃত ও নির্ভরযোগ্য হয়, তবে নিকটতম বিকল্পের তুলনায় সুবিধাজনক হওয়ার কারণে ঐ মোটরসাইকেল কেনা ন্যূনতম জায়েযের মধ্যে পড়বে। তবে—
- যদি সন্দেহ থাকে যে, পরোক্ষভাবে (যেমন: কর, শেয়ারহোল্ডার, বা সাবসিডিয়ারির মাধ্যমে) সহায়তা হচ্ছে—তবে বর্জন করা উত্তম ও সতর্কতামূলক।
- মুসলিমদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও শত্রুপক্ষকে দুর্বল করার জন্য বিকল্প মুসলিম বা নিরপেক্ষ কোম্পানির পণ্য কেনা উত্তম।
সিদ্ধান্ত: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—সরাসরি সহায়তা প্রমাণিত না হলে—বাইকটি কেনা জায়েয। তবে সতর্কতামূলক বর্জন উত্তম।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: iFatwa-তে মাসে চারটির বেশি প্রশ্ন করার সীমাবদ্ধতা
এখনো iFatwa এর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। বরং টোকেন ক্রয়ের মাধ্যমে যা ইচ্ছা প্রশ্ন করা যাবে।
তৃতীয় প্রশ্ন: সোরিয়াসিস আক্রান্ত পায়ের ছবি পাঠানোর হুকুম
উত্তর: শরীয়তের দৃষ্টিতে সতরের বাইরের অঙ্গ (যেমন: হাঁটুর নিচে টাখনুর উপরের অংশ) প্রদর্শন করা নিজে দেখার জন্য বা চিকিৎসার প্রয়োজনে জায়েয। তবে—
১. সতরের হুকুম: পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। হাঁটুর নিচের অংশ সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"سَتْرُ الرَّجُلِ مِنَ السُّرَّةِ إِلَى الرُّكْبَةِ"
"পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৬)
২. চিকিৎসার প্রয়োজনে ছবি পাঠানো: চিকিৎসা বা ফতোয়া জিজ্ঞাসার প্রয়োজনে সতরের বাইরের অংশের ছবি পাঠানো জায়েয। তবে সতরের অন্তর্ভুক্ত অংশ (হাঁটু) প্রদর্শন করা যাবে না। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—হাঁটুর বেশ নিচে টাখনুর উপরে—এই অংশ সতরের বাইরে, তাই ছবি পাঠানোতে বেয়াদবি হবে না।
৩. বেয়াদবি ও শিষ্টাচার: মুফতি সাহেবদের কাছে প্রশ্ন করার সময় শিষ্টাচার রক্ষা করা কর্তব্য। তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজনে ছবি পাঠানোতে কোনো দোষ নেই। ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ উল্লেখ করেন:
"চিকিৎসার প্রয়োজনে সতরের বাইরের অঙ্গ দেখানো বা দেখার অনুমতি আছে।" — (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ২৩৪)
সিদ্ধান্ত: আপনার পায়ের যে অংশের ছবি পাঠাতে চান—তা হাঁটুর নিচে ও টাখনুর উপরে—সেটি সতরের বাইরে। তাই চিকিৎসা বা ফতোয়া জিজ্ঞাসার প্রয়োজনে ছবি পাঠানো জায়েয, বেয়াদবি নয়। তবে নিশ্চিত করুন যে, ছবিতে হাঁটু বা সতরের অন্তর্ভুক্ত কোনো অংশ না থাকে। আর ছবি পাঠানোর আগে প্ল্যাটফর্মের অনুমতি নেওয়া উত্তম।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. মুসলিম বিদ্বেষী দেশের হালাল পণ্য | সরাসরি সহায়তা প্রমাণিত না হলে জায়েয; সতর্কতামূলক বর্জন উত্তম | | ২. মাসে চারটির বেশি প্রশ্ন | সংখ্যাসীমা নেই; টোকেন ক্রয় করে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা যাবে | | ৩. পায়ের ছবি পাঠানো | সতরের বাইরের অংশ হলে জায়েয, বেয়াদবি নয় |
والله أعلم بالصواب