ব্যাংকের সুদের টাকা মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দান করা যাবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
প্রাইজবন্ড জিতে সে টাকা দিয়ে মসজিদে টিউবওয়েল নির্মানে ব্যবহার করা যাবে?
Answer
সুদের টাকা দান ও প্রাইজবন্ডের টাকা মসজিদে ব্যবহারের বিধান
উত্তর
১. ব্যাংকের সুদের টাকা মূলত হারাম সম্পদ; তা নিজের ভোগ-ব্যবহারে নেওয়া, সম্পদে মেশানো বা ব্যবসায় লাগানো জায়েয নয়। তবে তা মুসলিম গরিব-মিসকিন, ঋণগ্রস্ত, এতিম, মুসাফির ইত্যাদি হকদারদের মধ্যে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া (শুধু দায়মুক্তির নিয়তে) দান করা জায়েয। মাদ্রাসা-এতিমখানার গরিব ছাত্রদেরকে মালিক বানিয়ে ছওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করা যাবে।
২. তবে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানার ভবন নির্মাণ, শিক্ষকদের বেতন, টিউবওয়েল, পাকা দেয়াল, আসবাব, লাইব্রেরি, মাইক ইত্যাদি স্থায়ী স্থাপনা বা সম্পত্তির কাজে সুদের টাকা ব্যবহার করা জায়েয নয়। কারণ এসব কাজে টাকাটি স্থায়ী সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং তা মসজিদ-মাদ্রাসার সম্পত্তি হয়ে যায়—যা সুদের টাকার জন্য বৈধ নয়।
৩, প্রাইজবন্ড জিতে সে টাকা দিয়ে মসজিদে টিউবওয়েল নির্মানে ব্যবহার করা যাবেনা। কেননা এটি হারাম টাকা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, দাতা, লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লানত করেছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাব অনুযায়ী, ব্যাংকে জমা রাখা টাকার উপর যা বাড়তি আসে তা সুদে ফুযুল (অতিরিক্ত সুদ) হিসেবে হারাম। (রাদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৬৬; ফাতাওয়া উসমানী, খ. ৩, পৃ. ৩৩৩)
সুদের টাকা মুসলিম হকদারদের মধ্যে দান করা যাবে, তবে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া। কারণ এটা পবিত্র মাল নয়, তাই এর দ্বারা সওয়াবের আশা করা যায় না; বরং উদ্দেশ্য হবে হারাম মাল থেকে দায়মুক্ত হওয়া।
যেসব খাতে দেওয়া যাবে:
| খাত | বিধান | |---|---| | গরিব-মিসকিন মুসলিম | জায়েয | | ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি | জায়েয | | এতিম শিশু (তার অভিভাবকের মাধ্যমে) | জায়েয | | মুসাফির | জায়েয | | মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের ব্যক্তিগত খরচ | জায়েয | | এতিমখানার গরিব এতিমদের ভরণ-পোষণ | জায়েয | | মসজিদ-মাদ্রাসার ভবন নির্মাণ, সংস্কার | জায়েয নয় | | মসজিদে টিউবওয়েল, পাখা, মাইক, কার্পেট | জায়েয নয় | | মাদ্রাসার স্থায়ী সম্পত্তি ক্রয় | জায়েয নয় | | জানাযা, কবরস্থান, রাস্তা নির্মাণ | জায়েয নয় | | মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা | জায়েয নয় |
দলিল: ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—সুদ হারাম; তবে যে ব্যক্তি সুদ গ্রহণ করেছে, সে তা গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। (শরহু মাআনিল আছার, খ. ২, পৃ. ১৪১)
ইমাম আতা, ইমাম হাসান বসরী, ইবনে সীরিন (রহ.) প্রমুখ তাবেয়ী বলেন—সুদের মাল গরিবদের মধ্যে দান করে দিতে হবে, কিন্তু তার সওয়াব আশা করা যাবে না। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস ১৪৪৭৯)
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
وَيَتَصَدَّقُ بِهِ عَلَى الْفُقَرَاءِ وَلَا يُثَابُ عَلَيْهِ "সে তা ফকীরদের উপর সদকা করবে, কিন্তু এর উপর সওয়াব পাবে না।" (রাদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৬৬)
মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) বলেন—সুদের টাকা মসজিদ-মাদ্রাসার নির্মাণকাজে লাগানো যাবে না; বরং গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, খ. ৩, পৃ. ৩৩৩-৩৩৪)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন—সুদের মাল দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা বানানো জায়েয নয়; হ্যাঁ, গরিব ছাত্রদের খাওয়া-পরা ও পড়ার খরচে দেওয়া যাবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খ. ৩, পৃ. ৩৬২)
والله أعلم بالصواب