মেয়েদের নামাজ পড়ার নিয়ম
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
মেয়েদের নামাজ পড়ার নিয়ম
ভূমিকা
ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই নামাজ ফরজ। তবে নারীর প্রকৃতি ও শালীনতার প্রতি লক্ষ্য রেখে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী মেয়েদের নামাজের কিছু আলাদা নিয়ম রয়েছে। নিম্নে কুরআন, হাদিস ও হানাফি কিতাবের আলোকে মেয়েদের নামাজের বিধান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. নামাজের শর্তাবলি (মেয়েদের জন্য বিশেষ)
ক. সতর ঢাকা
মেয়েদের সতর হলো মুখমণ্ডল, হাতের কব্জি ও পায়ের পাতা ছাড়া সমস্ত শরীর। অর্থাৎ মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর ঢাকা ফরজ।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নারী প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি ছাড়া সমস্ত শরীর ঢাকা আবশ্যক।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪১০৪; মুসনাদে আহমাদ
হানাফি কিতাবের বর্ণনা:
"المرأة كلها عورة إلا وجهها وكفيها" "নারী সম্পূর্ণই সতর, শুধু মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি ছাড়া।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৫; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৭৫
খ. পোশাক
- পোশাক ঢিলেঢালা ও শরীরের গঠন প্রকাশকারী নয় এমন হতে হবে।
- পাতলা বা স্বচ্ছ কাপড় পরিধান করা যাবে না।
- বেহেশতী জেওর-এ উল্লেখ আছে: "মেয়েদের নামাজে এমন কাপড় পরিধান করা আবশ্যক যা শরীরের আকার-আকৃতি প্রকাশ না করে।"
২. নামাজের ভেতরের বিশেষ নিয়ম (হানাফি মাজহাব)
ক. তাকবিরে তাহরিমা
- মেয়েরা হাত কান পর্যন্ত উঠাবে না, বরং কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাবে।
- হাত কাপড়ের ভেতরে রাখবে বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখবে।
- আঙুলগুলো মিলিয়ে রাখবে, ফাঁক করবে না।
ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: "المرأة ترفع يديها إلى صدرها ولا تخرجهما من الثوب" "নারী তার হাত বুক পর্যন্ত উঠাবে এবং কাপড় থেকে বের করবে না।" — ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, খণ্ড ১, পৃ. ২২৪; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৪
খ. কিয়াম (দাঁড়ানো)
- মেয়েরা দুই পা মিলিয়ে দাঁড়াবে, পায়ের মধ্যে ফাঁক রাখবে না।
- হাত বুকের উপর রাখবে।
- ডান হাত বাম হাতের পিঠের উপর রাখবে (পুরুষের মতো নাভির নিচে নয়)।
হাদিস: হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "মহিলাদের জন্য সুন্নত হলো বুকের উপর হাত রাখা।" — মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ২৭১৩
হানাফি কিতাব:
"والمرأة تضم يديها على صدرها" "নারী তার দুই হাত বুকের উপর রাখবে।" — আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৫০; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৭৩
গ. রুকু
- মেয়েরা রুকুতে খুব বেশি ঝুঁকবে না।
- আঙুলগুলো মিলিয়ে রাখবে, হাঁটু ধরবে না, শুধু হাত হাঁটুর উপর রাখবে।
- পিঠ সোজা করবে না, বরং সামান্য ঝুঁকে থাকবে।
- পা মিলিয়ে রাখবে।
ফাতাওয়া আলমগিরি: "المرأة تنحني في الركوع قليلاً ولا تفرج أصابعها" "নারী রুকুতে সামান্য ঝুঁকবে এবং আঙুল ফাঁক করবে না।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৭৪
ঘ. সিজদা
- মেয়েরা সিজদায় শরীর মিলিয়ে রাখবে।
- বাহু মাটিতে লাগিয়ে রাখবে (পুরুষের মতো বাহু উঁচু করবে না)।
- পেট রান ও রানের সাথে মিলিয়ে রাখবে।
- দুই পা ডান দিকে বের করে রাখবে।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "মহিলারা সিজদায় নিজেদের শরীর মিলিয়ে রাখবে, পুরুষদের মতো বাহু বিছিয়ে রাখবে না।" — সুনানে বায়হাকি, হাদিস: ৩৩২৬
হানাফি কিতাব:
"والمرأة تنخفض في السجود وتلصق بطنها بفخذيها" "নারী সিজদায় নিচু হবে এবং পেট রানের সাথে মিলিয়ে রাখবে।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৫; আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৫১
ঙ. বৈঠক (তাশাহহুদ)
- মেয়েরা তাশাহহুদে দুই পা ডান দিকে বের করে বসবে (পুরুষের মতো বাম পায়ের উপর বসবে না)।
- হাত রানের উপর রাখবে, আঙুল মিলিয়ে রাখবে।
ফাতাওয়া আলমগিরি: "المرأة تجلس على أليتها وتخرج رجليها من الجانب الأيمن" "নারী তার নিতম্বের উপর বসবে এবং দুই পা ডান দিক থেকে বের করবে।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৭৫
চ. সালাম ফেরানো
- মেয়েরা সালাম ফেরানোর সময় মুখ ডান-বাম দিকে খুব বেশি ঘুরাবে না।
- শুধু মুখ সামান্য ঘুরিয়ে ইশারা করবে।
৩. জামাতে নামাজ (মেয়েদের জন্য)
- মেয়েদের জন্য জামাতে নামাজ পড়া ফরজ বা ওয়াজিব নয়, বরং ঘরে একা নামাজ পড়াই উত্তম।
- যদি জামাত হয়, তবে মেয়েদের ইমাম মেয়েদের মধ্য থেকে হবে।
- মেয়েদের ইমাম পুরুষদের কাতারের সমান前方ে দাঁড়াবে না, বরং মাঝখানে দাঁড়াবে।
- মেয়েদের জামাতে আওয়াজ করে কিরাত পড়া যাবে না, বরং নিচু আওয়াজে পড়বে।
হাদিস: উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নারীদের জন্য তাদের ঘরের নামাজই সর্বোত্তম।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫৭০; মুসনাদে আহমাদ
হানাফি কিতাব:
"وصلاة المرأة في بيتها أفضل من صلاتها في المسجد" "নারীর ঘরের নামাজ মসজিদের নামাজের চেয়ে উত্তম।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬৬; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৭৬
৪. নামাজে মেয়েদের কিরাত (পাঠ)
- মেয়েরা নামাজে কিরাত নিচু আওয়াজে পড়বে।
- ফজর, মাগরিব, ইশার নামাজেও উচ্চ আওয়াজে পড়বে না।
- শুধু নিজে শুনতে পারবে এতটুকু আওয়াজে পড়বে।
ফাতাওয়া আলমগিরি: "المرأة تخفي قراءتها في جميع الصلوات" "নারী সমস্ত নামাজে তার কিরাত নিচু আওয়াজে পড়বে।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৭৪
৫. মেয়েদের নামাজের সারসংক্ষেপ (পার্থক্য)
| বিষয় | পুরুষ | নারী | |------|-------|------| | হাত উঠানো | কান পর্যন্ত | কাঁধ পর্যন্ত | | হাত রাখা | নাভির নিচে | বুকের উপর | | রুকু | সম্পূর্ণ ঝুঁকে | সামান্য ঝুঁকে | | সিজদা | বাহু উঁচু | বাহু মিলিয়ে | | বৈঠক | বাম পায়ের উপর | নিতম্বের উপর, পা ডানে | | কিরাত | উচ্চ আওয়াজে (কিছু নামাজে) | নিচু আওয়াজে | | জামাত | মসজিদে | ঘরে উত্তম |
৬. বিশেষ মাসআলা
ক. মাসিক ও নেফাস অবস্থায়
- হায়েজ ও নেফাস অবস্থায় নামাজ মাফ, পরে কাজাও করতে হবে না।
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হায়েজ অবস্থায় নারীর নামাজ মাফ করা হয়েছে, পরে কাজা করতে হবে না।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৩৫
খ. নামাজে চুল ঢাকা
- মেয়েদের চুল ঢাকা ফরজ। যদি চুলের এক চতুর্থাংশ পরিমাণ খোলা থাকে, তবে নামাজ হবে না।
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৫
গ. অলংকার
- নামাজে অলংকার পরিধান করা জায়েজ, তবে তা ঢাকা থাকতে হবে।
- যদি অলংকারের আওয়াজ হয় বা দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তবে না পরাই উত্তম।
৭. উপসংহার
মেয়েদের নামাজ পুরুষদের নামাজের মতোই ফরজ ও গুরুত্বপূর্ণ, তবে শালীনতা ও পর্দার বিধান রক্ষার জন্য কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী মেয়েদের নামাজে হাত বুকের উপর রাখা, রুকু-সিজদায় শরীর মিলিয়ে রাখা, নিচু আওয়াজে কিরাত পড়া এবং ঘরে নামাজ পড়া উত্তম। আল্লাহ তাআলা সমস্ত মুসলিম নারীদের নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র:
- আল-কুরআনুল কারিম
- সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম
- সুনানে আবু দাউদ, সুনানে বায়হাকি
- আল-হিদায়া (ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি)
- ফাতাওয়া আলমগিরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন শামি)
- ফাতাওয়া তাতারখানিয়া
- বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)