দর্শন বা ফিলোসফিতে পড়া কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
দর্শন বা ফিলোসফিতে পড়া জায়েজ আছে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে ভর্তি হয়, তার জন্য সেখানে লেখাপড়া করা কী জায়েজ?
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। যদি দর্শন বিভাগের পাঠ্যক্রমে কুফর, শিরক, ইসলামবিরোধী মতবাদকে সমর্থন বা প্রচার করা না হয়, বরং দর্শনের বিভিন্ন মতবাদকে জানা, বিশ্লেষণ করা এবং ইসলামের দৃষ্টিতে তার খণ্ডন করা হয়—তাহলে তা জায়েজ। আর যদি সেখানে কুফরি-শিরকি মতবাদকে সত্য বলে বিশ্বাস করা বা প্রচার করা আবশ্যক হয়, তাহলে তা জায়েজ নয়; বরং কুফরির সমর্থন হওয়ার কারণে হারাম।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মূলনীতি
ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি হলো—যে ইলম মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের উপকার করে, তা শেখা জায়েজ; আর যে ইলম কুফর-শিরক-গুমরাহির দিকে নিয়ে যায় বা তাতে সহায়তা করে, তা শেখা নাজায়েজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।" (সূরা বাকারা: ৪২)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"আর তোমরা এমন বিষয়ের পিছনে লাগো না, যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এসবের প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩৬)
২. দর্শন শিক্ষার দুইটি দিক
ক. জায়েজ দিক: দর্শনের বিভিন্ন মতবাদ (প্লেটো, এরিস্টটল, কান্ট, হেগেল, মার্কস ইত্যাদি) সম্পর্কে জানা, সেগুলোর দুর্বলতা ও ভ্রান্তি চিহ্নিত করা, ইসলামের দৃষ্টিতে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা—এটি জায়েজ। বরং ইসলামের সত্যতা প্রমাণ ও ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডনের জন্য এটি প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। ইমাম গাজালি (রহ.)-এর "তাহাফুতুল ফালাসিফা" এ ধরনের জ্ঞানভিত্তিক খণ্ডনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
খ. নাজায়েজ দিক: যদি পাঠ্যক্রমে কুফরি-শিরকি মতবাদকে সত্য বলে গ্রহণ করা, ইসলামের মূল আকিদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, বা সেগুলো প্রচার করা আবশ্যক হয়—তাহলে তা জায়েজ নয়। কেননা এতে কুফরির সমর্থন ও ইসলামবিরোধী কার্যক্রমে সহায়তা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহায়তা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবন আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন—যে ইলম আল্লাহর পরিচয়, তাঁর হুকুম-আহকাম ও আখিরাতের জন্য উপকারী, তা শেখা ফরজ বা মুস্তাহাব; আর যে ইলম গুমরাহি ও কুফরের দিকে নিয়ে যায়, তা শেখা নাজায়েজ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, ইলমুল কালাম ও ফালসাফা অধ্যায়)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"الفلسفة والمنطق إذا كان لدفع الشبهة وإظهار الحق فجائز، وإن كان لترويج الباطل فحرام" "দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্র যদি সন্দেহ দূর করা ও সত্য প্রকাশের জন্য হয়, তবে জায়েজ; আর যদি বাতিল প্রচারের জন্য হয়, তবে হারাম।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন:
"ফালসাফা ও দর্শনশাস্ত্র নিজে হারাম নয়; বরং তা অধ্যয়নের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। যদি ইসলামের খিদমতে হয়, তবে জায়েজ; আর যদি ইসলামের বিরুদ্ধে হয়, তবে হারাম।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪)
ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়ার সময় শিক্ষার্থীর আকিদা-বিশ্বাস দৃঢ় থাকা এবং কুফরি মতবাদকে অন্তরে গ্রহণ না করা শর্ত। যদি পাঠ্যক্রমে কুফরি মতবাদকে সত্য বলে স্বীকার করা বাধ্যতামূলক হয়, তবে তা জায়েজ নয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, ইলম ও তা'লিম অধ্যায়)
৪. শর্তসমূহ
দর্শন বিভাগে পড়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক:
- আকিদা দৃঢ় থাকা: শিক্ষার্থীর ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাস দৃঢ় থাকতে হবে, যাতে ভ্রান্ত মতবাদ তাকে প্রভাবিত করতে না পারে।
- উদ্দেশ্য সঠিক হওয়া: উদ্দেশ্য হবে জ্ঞান অর্জন, ভ্রান্তির খণ্ডন ও ইসলামের সত্যতা প্রমাণ—কুফরি মতবাদ গ্রহণ নয়।
- পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা: বিভাগের পাঠ্যক্রমে কুফরি-শিরকি মতবাদকে সত্য বলে গ্রহণ বা প্রচার করা আবশ্যক কি না, তা আগে যাচাই করতে হবে।
- ইসলামি জ্ঞান অর্জন: পাশাপাশি কুরআন-হাদিস, ফিকহ ও আকিদার জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যাতে ভ্রান্তির মোকাবিলা করা যায়।
- নিয়ত পরিশুদ্ধ রাখা: পড়াশোনার নিয়ত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইসলামের খিদমত।
৫. উপসংহার
সারকথা হলো—দর্শন বিভাগে পড়া নিজে হারাম নয়; বরং তা নির্ভর করে উদ্দেশ্য, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার্থীর আকিদার উপর। যদি কুফরি মতবাদ গ্রহণ বা প্রচার করা আবশ্যক না হয় এবং শিক্ষার্থীর আকিদা দৃঢ় থাকে, তবে জায়েজ। আর যদি কুফরি-শিরকি মতবাদকে সত্য বলে স্বীকার করা বা প্রচার করা আবশ্যক হয়, তবে তা জায়েজ নয়।
পরামর্শ: ভর্তির আগে বিভাগের পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস ভালোভাবে পর্যালোচনা করুন এবং কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতি বা ইসলামি স্কলারের সাথে পরামর্শ করুন। পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞান অর্জন চালিয়ে যান, যাতে আকিদা দৃঢ় থাকে।
তথ্যসূত্র:
- রাদ্দুল মুহতার, ইবন আবিদিন (রহ.)
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)
- মা'আরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.)
- আল-হিদায়া, বুরহানুদ্দিন মারগিনানি (রহ.)
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।